মহাকাশ ভ্রমণে যমজ ভাইয়ের বয়স কি সত্যিই কমে যায়

টাইম ডাইলেশন বলতে কী বোঝায়?ছবি: শাটারস্টক ডটকম

আপনি যদি হঠাৎ আলোর বেগে বা তার কাছাকাছি বেগে মহাকাশে পাড়ি দেন, তবে আপনার সময় কাটবে পৃথিবীর চেয়ে আলাদাভাবে! শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হলেও, এটাই আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণা। একে টাইম ডাইলেশন বা কাল দীর্ঘায়ন বলে।

কল্পবিজ্ঞান লেখকেরা এই টাইম ডাইলেশন নিয়ে প্রচুর গল্প-সিনেমা বানিয়েছেন। কখনো যদি হাইপারড্রাইভ বা আলোর চেয়ে দ্রুত বেগে ভ্রমণের প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব না-ও হয়, তবে এই টাইম ডাইলেশনই হতে পারে আমাদের অন্য কোনো নক্ষত্রমণ্ডলে যাওয়ার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়। যেমন ধরুন, আলোর গতিতে চললে পৃথিবী থেকে ৪০ আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্রহে যেতে পৃথিবীর হিসাব অনুযায়ী ৪০ বছর লাগবে। আবার একই গতিতে ফিরে আসতে লাগবে আরও ৪০ বছর। অর্থাৎ, একজন মহাকাশচারী যখন ৮০ বছর পর পৃথিবীতে ফিরবেন, তখন তাঁর পরিচিত প্রায় সবাই হয়তো আর বেঁচে থাকবেন না।

কিন্তু টাইম ডাইলেশনের কারণে মহাকাশচারীর কাছে এই ৮০ বছর মাত্র কয়েক মাস বা কয়েক ঘণ্টা মনে হতে পারে। কত সময় মনে হবে তা নির্ভর করবে তাঁর গতির ওপর! এই অদ্ভুত ধারণার ওপর ভিত্তি করেই জন্ম নিয়েছে আপেক্ষিকতার সবচেয়ে মজার এবং বিতর্কিত প্যারাডক্স—টুইন প্যারাডক্স বা যমজ ভাইদের ধাঁধা।

আরও পড়ুন
কখনো যদি হাইপারড্রাইভ বা আলোর চেয়ে দ্রুত বেগে ভ্রমণের প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব না-ও হয়, তবে টাইম ডাইলেশনই হতে পারে আমাদের অন্য কোনো নক্ষত্রমণ্ডলে যাওয়ার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়।

কোথায় লুকিয়ে আছে ধাঁধাটি

টাইম ডাইলেশনের ধারণাটা আমাদের কাছে অদ্ভুত মনে হয়, কারণ আমরা কেউই দৈনন্দিন জীবনে এত বেশি বেগে ঘুরি না, যা খালি চোখে ধরা পড়ে। তবে ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য প্রায়ই যমজ ভাইদের উদাহরণ দেওয়া হয়। ধরুন, দুই যমজ ভাই আকিব এবং রাকিব। আকিব পৃথিবীতেই রয়ে গেল, আর রাকিব একটি রকেটে করে আলোর কাছাকাছি বেগে মহাকাশ ভ্রমণে বেরিয়ে গেল।

আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, যে বেশি বেগে ভ্রমণ করবে, তার কাছে সময় ধীরে চলবে। সেই হিসেবে, রাকিব যখন পৃথিবীতে ফিরে আসবে, তখন সে দেখবে আকিব অনেক বুড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু রাকিব নিজে এখনো তরুণ!

আপাতদৃষ্টে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও, আসল ধাঁধাটা শুরু হয় অন্য জায়গায়। মহাকাশচারী ভাই রাকিবের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখুন তো! রাকিব যদি মনে করে যে তার মহাকাশযানটা এক জায়গায় স্থির আছে, আর পৃথিবীটা আলোর বেগে তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তাহলে কী হবে?

টাইম ডাইলেশন ঘটনার উদাহরণ
ছবি: আইনস্টাইন রিলেটিভলি ইজি

আপেক্ষিকতার নিয়ম অনুযায়ী তো সবার দৃষ্টিকোণই সমান। তাহলে রাকিবের কাছে মনে হওয়া উচিত যে পৃথিবীতে থাকা আকিবের বয়স ধীরে বাড়ছে, আর সে নিজে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে! তাহলে দুজন যখন আবার দেখা করবে, তখন কার বয়স কম হবে?

কার দৃষ্টিভঙ্গিটা আসলে সঠিক? আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল এই বলে যে, দুজন পর্যবেক্ষক পরস্পরবিরোধী জিনিস দেখতে পারে এবং দুজনই সঠিক হতে পারে! কিন্তু এই টুইন প্যারাডক্সের ক্ষেত্রে বিষয়টা তা নয়। যখন তারা দেখা করবে, তখন আসলেই আকিবের বয়স রাকিবের বয়সের চেয়ে অনেক বেশি হবে। কিন্তু কেন? কেন রাকিবের গতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যখন দুজনের কাছেই মনে হচ্ছিল অন্যজন দূরে সরে যাচ্ছে?

আরও পড়ুন
আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল এই বলে যে, দুজন পর্যবেক্ষক পরস্পরবিরোধী জিনিস দেখতে পারে এবং দুজনই সঠিক হতে পারে!

ধাঁধার সমাধান

আইনস্টাইন তাঁর তত্ত্বের নাম দিয়েছিলেন বিশেষ আপেক্ষিকতা। কারণ, তিনি এখানে এমন একটা বিশেষ অবস্থা নিয়ে কাজ করেছিলেন যেখানে কোনো ত্বরণ বা মহাকর্ষ বল ছিল না। অর্থাৎ, বস্তু শুধু সমবেগে চলবে। কিন্তু বাস্তব জীবনে তো আর তা সম্ভব নয়। রাকিবকে যখন পৃথিবী থেকে রওনা হতে হবে, তখন তার রকেটের গতি শূন্য থেকে বাড়িয়ে আলোর কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে হলে রকেটের গতি কমিয়ে শূন্যে নামাতে হবে। দিক পরিবর্তন করার সময়ও বেগের পরিবর্তন বা ত্বরণ ঘটবে।

এই ত্বরণই হলো টুইন প্যারাডক্স সমাধানের মূল চাবিকাঠি। রাকিব যেহেতু ত্বরণ বা মন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে, তাই সে আর জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে থাকে না। অর্থাৎ, তার এবং পৃথিবীর আকিবের অবস্থা আর সমান থাকে না। আর এই ত্বরণের কারণেই রাকিবের ঘড়ি আকিবের ঘড়ির চেয়ে ধীরে চলে।

যদিও অনেক পদার্থবিদ এই ত্বরণের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট, তবে কেউ কেউ আরও জটিল থট এক্সপেরিমেন্ট দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরা এমন একটি অবস্থার কথা ভাবেন যেখানে কোনো ত্বরণ ছাড়াই দুই মহাকাশচারী সমবেগে একে অপরকে অতিক্রম করে। তবে এই ধরনের পরিস্থিতিতেও প্যারাডক্সের সমাধান নির্ভর করে দিক পরিবর্তনের ওপর। অর্থাৎ, যমজ ভাইদের পুনরায় দেখা করতে হলে একজনকে অবশ্যই দিক পরিবর্তন করে ফিরে আসতে হবে। সেই দিক পরিবর্তনের সময়ই টাইম ডাইলেশন ঘটে।

আরও পড়ুন
স্কট কেলি আসলেই টাইম ডাইলেশনের কারণে তাঁর ভাই মার্কের চেয়ে কম বুড়ো হয়েছিলেন! তবে এই পার্থক্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮.৬ মিলিসেকেন্ড!

নাসার কেলি যমজদের গল্প

টুইন প্যারাডক্স নিয়ে কথা উঠলেই মার্ক এবং স্কট কেলির কথা চলে আসে। তাঁরা দুজনই নাসার নভোচারী এবং একেবারে হুবহু যমজ। মার্ক নাসা থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন, আর নাসা এই সুযোগে স্কট কেলিকে দীর্ঘদিনের জন্য মহাকাশ স্টেশনে পাঠিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, মহাকাশে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে মানুষের শরীরে কী কী পরিবর্তন হয়, তা পৃথিবীর মাটিতে থাকা তাঁর যমজ ভাই মার্কের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

অনেকেই এই পরীক্ষাটিকে টুইন প্যারাডক্সের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কারণ, স্কট কেলি আসলেই টাইম ডাইলেশনের কারণে তাঁর ভাই মার্কের চেয়ে কম বুড়ো হয়েছিলেন! তবে এই পার্থক্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮.৬ মিলিসেকেন্ড! এটা এতই সামান্য যে সাধারণ চোখে বোঝার কোনো উপায় নেই।

স্কট কেলি এবং মার্ক কেলি
ছবি: সংগৃহীত

তবে স্কটের এই সামান্য বয়স কমার পেছনে শুধু বিশেষ আপেক্ষিকতাই কাজ করেনি, সাধারণ আপেক্ষিকতাও কাজ করেছে। বিশেষ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী, স্কট যেহেতু ঘণ্টায় ২৭ হাজার কিলোমিটার বেগে মহাকাশে ঘুরেছেন, তাই তাঁর সময় পৃথিবীর চেয়ে ধীরে চলেছে। কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতা বলছে, মহাকর্ষ বল যেখানে বেশি, সেখানে সময় ধীরে চলে। যেহেতু পৃথিবীতে মহাকর্ষ বল মহাকাশ স্টেশনের চেয়ে বেশি, তাই এই হিসেবে মার্কের সময়ও কিছুটা ধীরে চলেছে। এই দুটি প্রভাব কাটাকাটি হয়েই স্কটের বয়স মাত্র ৮.৬ মিলিসেকেন্ড কম হয়েছে।

অবশ্য নাসার মূল উদ্দেশ্য টাইম ডাইলেশন পরীক্ষা করা ছিল না। তারা দেখতে চেয়েছিল মহাকাশের ক্ষতিকর রেডিয়েশন এবং দীর্ঘদিন কম মাধ্যাকর্ষণে থাকার ফলে স্কটের ডিএনএ এবং শরীরে কী প্রভাব পড়ে। সেই পরীক্ষার ফলাফল হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের মঙ্গল গ্রহে বা সৌরজগতের অন্য কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করবে।

সূত্র: আইএফএক সায়েন্স

আরও পড়ুন