বৃহস্পতির চৌম্বকীয় বলয়ে নতুন রহস্যের সন্ধান পেল জুনো
রাতের আকাশে বৃহস্পতি গ্রহটিকে খালি চোখে দেখলে কেবল একটি উজ্জ্বল বিন্দুর মতোই মনে হয়। কিন্তু সৌরজগতের সবচেয়ে বড় এই গ্রহটির সবকিছু মানুষের কল্পনার চেয়েও বিশাল। সৌরজগতের অন্যান্য সব গ্রহকে একসঙ্গে মেলালেও তা বৃহস্পতির সমান হবে না। এই অবাক করা বিশালত্বের সঙ্গে পাল্লা দিতেই গ্রহটির চারপাশ ঘিরে রয়েছে এক অতিকায় ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চৌম্বকীয় বলয়। ম্যাগনেটোস্ফিয়ার হলো কোনো গ্রহের চারপাশের অদৃশ্য চৌম্বকীয় ঢাল, যা গ্রহটিকে মহাকাশের ক্ষতিকর সৌরঝড় ও রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করে।
কিন্তু বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশের অদৃশ্য চৌম্বকীয় বলয়ে এমন কী ঘটছে, যা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের স্থির ধারণাকে এক নিমিষে চুরমার করে দিল? মহাকাশযান জুনোর পাঠানো নতুন তথ্যে বেরিয়ে এসেছে, বৃহস্পতির ম্যাগনেটোডিস্ক কোনো মসৃণ থালার মতো নয়, বরং তা দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ঢেউখেলানো তরঙ্গের মতো। এর পেছনে বৃহস্পতির চাঁদ আইওর ভূমিকা থাকতে পারে।
ম্যাগনেটোস্ফিয়ার হলো কোনো গ্রহের চারপাশের অদৃশ্য চৌম্বকীয় ঢাল, যা গ্রহটিকে মহাকাশের ক্ষতিকর সৌরঝড় ও রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করে।
২০১৬ সাল থেকে নাসার পাঠানো জুনো স্পেসক্রাফট এই গ্রহটিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এর মূল বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য বৃহস্পতির বিশাল চৌম্বকীয় বলয় এবং এর সবচেয়ে ভেতরের দিকের চাঁদ আইওর মধ্যকার জটিল সম্পর্কটি ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা। আইও আমাদের চাঁদের মতো শান্তশিষ্ট কোনো উপগ্রহ নয়। সৌরজগতের সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়গিরি আছে এই উপগ্রহে। ভূতাত্ত্বিকভাবে মারাত্মক সক্রিয় একটি উপগ্রহ আইও। সেখানে প্রতিনিয়তই বিশাল আকারের লাভার বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে এবং সেই ফুটন্ত লাভা মহাকাশে ছিটকে পড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বৃহস্পতির আংটির মতো দেখতে একটি নির্দিষ্ট অংশ, যাকে বলা হয় ম্যাগনেটোডিস্ক। গ্রহটির প্রচণ্ড দ্রুত ঘূর্ণন এবং আইওর রাক্ষুসে আগ্নেয়গিরি থেকে ছিটকে আসা পদার্থগুলো একসঙ্গে মিলে এই বিশেষ চাকতিটি তৈরি করে। বৃহস্পতি গ্রহটি এতই বিশাল হওয়া সত্ত্বেও এটি নিজের অক্ষে একটি লাটিমের মতো ভয়ানক জোরে ঘোরে। নিজের অক্ষে একবার সম্পূর্ণ ঘুরে আসতে এর সময় লাগে মাত্র ৯.৯ ঘণ্টা! কিছুদিন আগপর্যন্তও বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, এই ম্যাগনেটোডিস্কটি বুঝি একটি নিখুঁত ও মসৃণ থালার মতো, যা বৃহস্পতির ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে কেবল একবার ওপরে ওঠে আর একবার নিচে নামে। কিন্তু মহাকাশের সত্যিটা যে এত রোমাঞ্চকর হবে, তা কে জানত!
বৃহস্পতি গ্রহটি এতই বিশাল হওয়া সত্ত্বেও এটি নিজের অক্ষে একটি লাটিমের মতো ভয়ানক জোরে ঘোরে। নিজের অক্ষে একবার সম্পূর্ণ ঘুরে আসতে এর সময় লাগে মাত্র ৯.৯ ঘণ্টা!
মসৃণ থালার বদলে এ কেমন মহাজাগতিক ঢেউ
চীনের শানডং ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক দল জুনো স্পেসক্রাফটের পাঠানো নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের পুরোনো সেই ধারণা পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছেন। সায়েন্স চায়না আর্থ সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত তাদের এই যুগান্তকারী গবেষণায় বৃহস্পতির ম্যাগনেটোডিস্কের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র এবং সেখানে থাকা উচ্চশক্তিসম্পন্ন কণাগুলোর গতিবিধি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, যখন বৃহস্পতির চৌম্বকীয় বলয়টি খুব বেশি সক্রিয় অবস্থায় থাকে, তখন এর ম্যাগনেটোডিস্কটি মোটেই কোনো মসৃণ থালার মতো থাকে না; বরং এটি দুমড়ে-মুচড়ে গিয়ে বিশাল এক ঢেউখেলানো তরঙ্গের আকার ধারণ করে।
স্বাভাবিক অবস্থায় জুনো স্পেসক্রাফটের বৃহস্পতির প্রতি ঘূর্ণনে, মানে প্রতি ৯.৯ ঘণ্টায় মাত্র দুবার এই ম্যাগনেটোডিস্কের বিদ্যুৎবাহী স্তরটি পার হওয়ার কথা। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ম্যাগনেটোডিস্কের রিকানেকশন বা পুনরায় জোড়া লাগার ঘটনাগুলোর সময় জুনো এই বিদ্যুৎবাহী স্তরটি বারবার পার হতে থাকে।
রিকানেকশন হলো মহাকাশের এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে চৌম্বকীয় বলরেখাগুলো প্রচণ্ড চাপে ভেঙে গিয়ে আবার নতুন করে জোড়া লাগে এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। প্রতিবার এই স্তর পার হওয়ার সময়ই জুনো একই রকম স্পষ্ট কিছু চৌম্বকীয় সংকেত ধরতে পেরেছে। সেই সঙ্গে পেয়েছে চার্জিত ইলেকট্রন ও আয়নের বিশাল এক স্রোত।
গবেষক দলের বিশ্লেষণে ধরা পড়ে, এই বিদ্যুৎবাহী স্তরটি কেবল ওপরে ওঠে আর নিচে নামে না, বরং পুকুরের জলে ঢিল ছুড়লে যেমন ঢেউ তৈরি হয়, ঠিক সেভাবেই এটি ঢেউ খেলতে থাকে। মহাজাগতিক এই প্রতিটি ঢেউয়ের স্থায়িত্ব হয় কয়েক মিনিট থেকে শুরু করে একটানা এক ঘণ্টারও বেশি সময়!
রিকানেকশন হলো মহাকাশের এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে চৌম্বকীয় বলরেখাগুলো প্রচণ্ড চাপে ভেঙে গিয়ে আবার নতুন করে জোড়া লাগে এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।
পৃথিবীর সঙ্গে বৃহস্পতির এই পার্থক্যে লুকিয়ে আছে কোন রহস্য
গবেষক দলটি তাদের গবেষণাপত্রে নিশ্চিত করেছেন, বৃহস্পতির এই ম্যাগনেটোডিস্কে ছোট ছোট অসংখ্য রিকানেকশন সাইট বা চৌম্বকীয় সংযোগস্থল রয়েছে, যা প্রায় ১০০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ জুড়ে বিশাল এলাকা নিয়ে ছড়িয়ে আছে। তারা আরও দেখেছেন, এই সংযোগস্থলগুলো প্রতিনিয়ত ডিস্কের চৌম্বকীয় বলরেখাগুলোকে ভেঙে দেয় এবং কারেন্ট শিটটিকে তার স্বাভাবিক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থেকে অনেক দূরে ঠেলে সরিয়ে দেয়।
যেহেতু বৃহস্পতির ম্যাগনেটোডিস্কটি প্রচণ্ড বেগে ঘোরে, তাই পুরো কারেন্ট শিটটি গ্রহের সঙ্গেই পাক খেতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে এর কোনো মিলই নেই! পৃথিবীতে চৌম্বকীয় তরঙ্গের ঢেউগুলো তৈরি হওয়ার পর তা রিকানেকশন সাইট থেকে অনেক দূরে সরে যায়। কিন্তু বৃহস্পতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র দেখা যায়। এখানকার চৌম্বকীয় সংকেতগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, কারেন্ট শিটটি নিজেই একটি ঢেউখেলানো অবস্থায় গ্রহের সঙ্গে তীব্র বেগে ঘুরছে।
যেহেতু বৃহস্পতির ম্যাগনেটোডিস্কটি প্রচণ্ড বেগে ঘোরে, তাই পুরো কারেন্ট শিটটি গ্রহের সঙ্গেই পাক খেতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সঙ্গে এর কোনো মিলই নেই!
এই নতুন আবিষ্কার গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই ঢেউখেলানো চৌম্বকীয় স্তরটি আইও থেকে আসা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির কণাগুলোর গতি বাড়াতে এবং সেগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই কণাগুলো বৃহস্পতির আয়নোস্ফিয়ার এবং ম্যাগনেটোডিস্কের মধ্যকার সম্পর্ককে ভবিষ্যতে আরও জটিল করে তুলতে পারে। মূলত এই বিশ্লেষণ এটাই প্রমাণ করে, বৃহস্পতির ম্যাগনেটোডিস্ক মোটেই কোনো সাধারণ বা মসৃণ ঘূর্ণায়মান থালা নয়; এটি অত্যন্ত জটিল ও চরম পরিবর্তনশীল একটি মহাজাগতিক পরিবেশ।
জুনো স্পেসক্রাফট বর্তমানে তার মূল মিশন শেষে বর্ধিত মিশনে কাজ করে যাচ্ছে, যা আগামী ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পুরোদমে চলার কথা রয়েছে। এর আগে নাসার পাঠানো গ্যালিলিও প্রোবই ছিল একমাত্র মহাকাশযান, যা শুধু বৃহস্পতি গ্রহকে নিয়েই গবেষণা করেছিল। গ্যালিলিওর দশকের পর দশক আগের ফেলে আসা সেই অসমাপ্ত কাজগুলোকেই এখন আরও সূক্ষ্মভাবে পূর্ণতা দিচ্ছে জুনো।