মানুষের জন্য মহাকাশ ভ্রমণ শুধু জটিল নয়, অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণও বটে। তা সত্ত্বেও কৌতুহলী মানুষ দমে যায়নি। ১৯৬১ সালে প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে যান সোভিয়েত ইউনিয়নের নভোচারী ইউরি গ্যাগরিন। এরপর পেরিয়ে গেছে ৬ দশকেরও বেশি সময়। চলতি বছর পর্যন্ত বছরে মহাকাশে গেছেন প্রায় ছয় শতাধিক মানুষ।
প্রায় সবাই সুস্থ শরীরে পৃথিবীতে ফিরে এলেও ২০ জন মানুষ জীবিত ফেরেননি। মহাশূন্যেই ঘটেছে তাঁদের জীবনের সমাপ্তি। এর মধ্যে ১৯৮৬ ও ২০০৩ সালে নাসার স্পেস শাটল ট্র্যাজেডিতে মারা গেছেন ১৪ জন। ১৯৭১ সালে সয়ুজ-২ মিশনে মারা গেছেন ৩ জন। বাকি ৩ জন নভোচারী মারা গেছেন অ্যাপোলো ১ উৎক্ষেপণের সময়। ১৯৬৭ সালের ঘটনা সেটা।
খুব রুঢ় শোনালেও সত্যি যে, মানুষের মহাকাশ ভ্রমণ যে পরিমাণ জটিল একটি প্রক্রিয়া তাতে সময়ের হিসেবে এ প্রাণহানি খুব অপ্রত্যাশিত নয়। মানুষের প্রাণের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু হতে পারে না। একজন মানুষের প্রাণও মহাবিশ্বের সমস্ত সম্পদের চেয়ে মূল্যবান। তাই, যে কোনো মানব মহাকাশ মিশনে মানুষের নিরাপত্তার দিকটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়।
কেউ যদি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে মারা যান (যেমন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে), তাহলে সেখানকার ক্রুরা মরদেহকে কয়েক ঘন্টার মাঝে বিশেষ ক্যাপসুলে করে পৃথিবীতে ফেরত পাঠাতে পারেন
আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ নাসা আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দশকে মানুষ পৌঁছে যাবে মঙ্গলের মাটিতে। তাছাড়া বাণিজ্যিকভাবে মহাকাশ ভ্রমণও খুব শিগগিরই ব্যাপক পরিসরে চালুর সম্ভাবনা আছে। সবমিলিয়ে মহাকাশযাত্রা হয়ে উঠছে আরও সহজলভ্য। ফলে যাত্রাপথে বা মহাকাশে মৃত্যুর আশঙ্কাও বাড়বে আগামী দিনে। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, মহাকাশে কেউ মারা গেলে মরদেহের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটবে?
মহাকাশ নভোচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে কাজ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের স্পেস মেডিসিন অ্যান্ড ইমার্জেন্সি বিভাগের অধ্যাপক ইমানুয়েল ইউরকুয়েতা। তিনিসহ একদল গবেষক দেশটির ট্রান্সলেশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর হেলথ গবেষণাগারে এ বিষয়ে গবেষণা করেন। নিজেদের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, নভোচারী যেন মহাকাশ মিশনে সুস্থ থাকেন এবং সুস্থ শরীরে ফিরে আসতে পারেন, তা নিয়েই আমাদের গবেষণা। অর্থাৎ মহাকাশে মানুষে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে গবেষণা প্রতিনিয়তই চলছে।
তারপরও দুর্ঘটনা ঘটে। মানুষ মারা যান মহাকাশে। মহাকাশে মৃত্যুর পর মরদেহের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটে সে সম্পর্কে অধ্যাপক ইউরকুয়েতা একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মহাকাশে কোথায় ও কীভাবে একজন মানুষ মারা যাচ্ছেন, সেটার ওপর নির্ভর করে তাঁর মরদেহ কীভাবে সৎকার করা হবে।
কেউ যদি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে মারা যান (যেমন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে), তাহলে সেখানকার ক্রুরা মরদেহকে কয়েক ঘন্টার মাঝে বিশেষ ক্যাপসুলে করে পৃথিবীতে ফেরত পাঠাতে পারেন।
ঘটনাটি চাঁদে ঘটলেও একই কাজ করা হয়। এক্ষেত্রে সময় লাগে কিছুটা বেশি। কয়েক ঘন্টার জায়গায় কয়েক দিন। এ নিয়ে নাসার বিস্তারিত নিয়মকানুন রয়েছে। আগ্রহীরা চাইলে পড়ে দেখতে পারেন ।
নিম্নকক্ষপথ বা চাঁদ থেকে যেহেতু মরদেহ ফিরিয়ে বেশি সময় লাগে না, তাই এসব ক্ষেত্রে মরদেহ সংরক্ষণ প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। বরং এসব ক্ষেত্রে বাকি সব ক্রু যেন নিরাপদে পৃথিবীতে আসতে পারে, সেদিকটা সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
তবে, ৩০০ মিলিয়ন মাইল দূরের মঙ্গল যাত্রায় কেউ মারা গেলে ঘটনা ভিন্ন হবে। সেক্ষেত্রে হয়ত ক্রুদের পৃথিবীতে ফেরত আসা সম্ভব হবে হবে না। এর চেয়ে, মিশন শেষে ক্রুদের সঙ্গে ফিরিয়ে আনা হবে মরদেহ। সময় লাগবে কয়েক বছর।
এই সময়টুকুতে মরদেহ যেন নষ্ট না হয় না, তা নিশ্চিত করতে আলাদা কক্ষে অথবা বিশেষ ধরের বডি ব্যাগে সংরক্ষণ করা হবে। নভোযানের নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা মরদেহ সংরক্ষণের কাজে সাহায্য করবে। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে সেটাই করার কথা। পরে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পর সৎকার করা হবে।
এসব গেল মহাকাশযান বা মহাকাশ স্টেশনের মতো নিয়ন্ত্রিত চাপের বদ্ধ পরিবেশের ঘটনা। কিন্তু কোনোরকম সুরক্ষা ছাড়া মহাশূন্যে কেউ যদি পা রাখেন, তার ভাগ্যে ঠিক ঘটবে?
সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়বেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ বায়ুমণ্ডল নেই সেখানে। নেই কোনো বায়ুমণ্ডলীয় চাপ৷ আমাদের টিকে থাকার জন্য শুধু অক্সিজেন হলেই চলে না, বায়ুমণ্ডলীয় চাপও সমান দরকারি। শরীরের অভ্যন্তরীণ চাপ ও বায়ুমণ্ডলীয় চাপ পরস্পরকে শূন্য করে দেয়। ফলে আমরা পৃথিবীর বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারি। মহাশূন্যে কোনোরকম সুরক্ষা ছাড়া গেলে শ্বাস বন্ধ তো হবেই, শরীরের অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে মুহূর্তের মাঝে শরীরের রক্ত মাংস চামড়া ভেদ করে বাইরে আসবে। পরিণতি যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।
প্রায় একই ঘটনা ঘটবে চাঁদের বা মঙ্গলে যদি সুরক্ষা ছাড়া পা রাখা যায়। কারণ সেখানেও বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।
ধরা যাক, কোনো নভোচারী মঙ্গলে অবতরণের পর মারা গেলেন। সেখানে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু তাতে প্রচুর শক্তি ব্যয় করতে হবে। দূর গ্রহে সামান্য শক্তির পরিমাণ আপাতত সীমাবদ্ধ। জীবিত মানুষের বাঁচার জন্যও শক্তির প্রয়োজন। স্বাভাবিক ভাবেই মরদেহের চেয়ে জীবিতদের গুরুত্ব বেশি পাবে সেক্ষেত্রে।
মরদেহ মঙ্গলের মাটিতে সমাহিত করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে গ্রহটিতে। এর বদলে ক্রুরা মরদেহকে বিশেষ ব্যাগে সংরক্ষণ করবেন। যাতে করে পৃথিবীতে ফেরার সময় সঙ্গে নিয়ে আসা যায়।
এসব ছাড়াও আরও নানা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে সীমাহীন মহাশূন্যে। নভোচারীরা মৃত্যুর ব্যাপারে ঠিক কী করবেন তার অনেক কিছুই এখনও অজানা। শুধু মরদেহের বিষয় নয়। মৃত্যুতে ক্রুসহকারীদের মনোবল ধরে রাখা এবং পৃথিবীতে মৃত নভোচারীর পরিবারকে সাহায্য করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মহাকাশে যেহেতু নানা অজানা বিপদের হাতছানি থাকে, তাই সেসব নিয়ে আগে থেকে পুরোপুরি প্রস্তুত হবার সুযোগ নেই। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ তাই খুলে রেখেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিজ্ঞানী অক্লান্তভাবে মহাকাশ যাত্রার খুঁটিনাটি নিয়ে ভাবছেন। চাঁদে বা মঙ্গলে বসতি তৈরির অভিযানে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রয়োজন। এ কথা বলা বাহুল্য।
লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা
সূত্র: দ্য কনভারসেশন, নাসা, উইকিপিডিয়া