আসলেই কি গ্রহাণু খুঁড়ে মূল্যবান সম্পদ পাওয়া সম্ভব

মহাকাশের ভাসমান পাথরগুলো কি সত্যিই আমাদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে? গ্রহাণুর বুকে খনন করা কি আদৌ সম্ভব, নাকি পুরোটাই বিজ্ঞানীদের কল্পনা? পৃথিবীর খনিজ ফুরিয়ে আসার আগেই কি আমরা মহাকাশে নতুন ঠিকানা খুঁজে পাব?

শিল্পীর কল্পনায় গ্রহাণুর ছবিছবি: নাসা/জেপিএল-ক্যালটেক

কয়েক বছর আগেও গ্রহাণু থেকে খনিজ আহরণ নিয়ে তুমুল উত্তেজনা ছিল। মনে হচ্ছিল, কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো মহাকাশের বড় বড় পাথরগুলো থেকে দামি ধাতু তুলে আনা যাবে। পৃথিবী হয়ে যাবে অভাবমুক্ত। বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর পাশাপাশি মহাকাশে খনি তৈরির স্বপ্নও দেখাচ্ছিল। কিন্তু হুট করেই যেন সব চুপচাপ। সেই উত্তেজনা কি হারিয়ে গেল? প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও একের পর এক মিশন পিছিয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনাগুলো আপাতত অপেক্ষার তালিকায় চলে গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বপ্নটা এখনো বেঁচে আছে!

সম্প্রতি স্পেনের ইনস্টিটিউট অব স্পেস সায়েন্সেসের একদল গবেষক নতুন করে আশার আলো দেখালেন। তাঁদের গবেষণার মূল বিষয় ছিল সি-টাইপ বা কার্বন-সমৃদ্ধ গ্রহাণু। মহাকাশে যত গ্রহাণু আছে, তার প্রায় ৭৫ ভাগই এই দলের।

সি-টাইপ গ্রহাণু
ছবি: উইকিপিডিয়া

কিন্তু সমস্যা হলো, চাইলেই তো আর হাতের কাছে গ্রহাণু পাওয়া যায় না! তাই গবেষকরা পৃথিবীতে আছড়ে পড়া কিছু বিশেষ উল্কাপিণ্ড বিশ্লেষণ করেছেন। সাহারা মরুভূমি বা অ্যান্টার্কটিকার মতো জায়গায় এদের কালেভদ্রে পাওয়া যায়। এদের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছেন, মহাকাশের গ্রহাণুগুলোতে কী সম্পদ লুকিয়ে আছে।

আরও পড়ুন
সম্প্রতি স্পেনের ইনস্টিটিউট অব স্পেস সায়েন্সেসের একদল গবেষক সি-টাইপ বা কার্বন-সমৃদ্ধ গ্রহাণু নিয়ে গবেষণা করেন। মহাকাশে যত গ্রহাণু আছে, তার প্রায় ৭৫ ভাগই এই দলের।

গবেষক জোসেপ এম. ট্রিগো-রদ্রিগেজ এবং তাঁর দল বলছেন, সব গ্রহাণুই খনন করার উপযুক্ত নয়। ঢালাওভাবে সব গ্রহাণু খুঁড়লে লাভ হবে না। তাঁদের মতে, যেসব গ্রহাণুতে অলিভিন ও স্পিনেলের মতো খনিজ আছে এবং যেগুলোতে প্রচুর পানি বা জলীয় খনিজ আছে, সেগুলোই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য। মহাকাশে পানি মানেই শুধু খাওয়ার পানি নয়; পানি মানে জ্বালানি! এই পানি ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করে রকেটের ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তখন হয়তো পৃথিবী থেকে আর জ্বালানি বয়ে নিয়ে যেতে হবে না, মহাকাশেই থাকবে পাম্প স্টেশন!

যেসব গ্রহাণুতে প্রচুর পানি বা জলীয় খনিজ আছে, সেগুলো খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা
ছবি: গেটি ইমেজ

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ব্যাপারটা অসম্ভব নয়। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন। কারণ, পৃথিবী ও মহাকাশের পরিবেশ এক নয়। প্রায় শূন্য অভিকর্ষে বড় বড় পাথর ভাঙা, সেখান থেকে খনিজ আলাদা করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জন্য যে প্রযুক্তি দরকার, তা এখনো আমাদের হাতে পুরোপুরি নেই। এ জন্য দরকার বড় স্যাম্পল-রিটার্ন মিশন। এই গবেষক দলের সদস্য পাউ গ্রেবোল-টোমাস বলেছেন, ‘আজ এগুলোকে সায়েন্স ফিকশন মনে হতে পারে, কিন্তু ৩০ বছর আগে যখন মহাকাশ থেকে মাটির নমুনা আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, তখন সেটাও মানুষের কাছে সায়েন্স ফিকশনই মনে হতো।’

আরও পড়ুন
মহাকাশে পানি মানেই শুধু খাওয়ার পানি নয়; পানি মানে জ্বালানি! এই পানি ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করে রকেটের ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

ভবিষ্যৎ কী বলছে? গ্রহাণু খনন কি পৃথিবীকে শুধু ধনী বানাবে, নাকি পৃথিবীকেও বাঁচাবে। মহাকাশ থেকে সম্পদ আনা সম্ভব হলে পৃথিবীর পরিবেশের ওপর চাপ কমবে। নাসা, জাপানের জাক্সা এবং চীনের মতো মহাকাশ সংস্থাগুলো বসে নেই। চীন অদূর ভবিষ্যতেই তিয়ানওয়েন-২ মিশনে গ্রহাণুর খুব কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

শিল্পীর কল্পনায় সাইকি ১৬ গ্রহাণু
ছবি: ম্যাক্সার/এএসইউ/পি. রুবিন/নাসা/জেপিএল-ক্যালটেক

গ্রহাণু থেকে খনিজ আহরণের ক্ষেত্রে সাইকি ১৬ গ্রহাণুটি বিজ্ঞানীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। নাসা ধারণা করছে, এই গ্রহাণুতে যে পরিমাণ লোহা, নিকেল ও স্বর্ণ আছে, তার বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোয়াড্রিলিয়ন ডলার! নাসা ইতিমধ্যেই ২০২৩ সালে এই গ্রহাণুর উদ্দেশ্যে একটি মহাকাশযান পাঠিয়েছে।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট  ও নাসা

আরও পড়ুন