গ্রহদের আয়ু কত দিন, পৃথিবী আর কতদিন টিকবে

মানুষের যেমন জন্ম, মৃত্যু ও জীবনচক্র আছে, মহাকাশের গ্রহগুলোরও ঠিক তা-ই আছে! তারা জন্মায়, ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয় এবং একদিন তাদেরও মৃত্যু ঘটে। কিন্তু একটি গ্রহ ঠিক কত দিন বাঁচবে, তা নির্ভর করে সে কোন ধরনের নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে তার ওপর।

কখনো কি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছেন, আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী আর কত দিন টিকবে? কিংবা মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহের আয়ুই বা কত দিন? চলুন, আজ এই মহাজাগতিক জীবনচক্রের দারুণ কিছু বৈজ্ঞানিক রহস্য জেনে নিই।

গ্রহদের জন্মবৃত্তান্ত

ফ্রান্সের বোরদো ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী শন রেমন্ডের মতে, গ্রহদের জীবনের শুরুটা হয় খুব সামান্য অবস্থা থেকে। নতুন জন্ম নেওয়া নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরতে থাকা আণুবীক্ষণিক ধূলিকণাগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।

বৃহস্পতি গ্রহের কেন্দ্র প্রথমে বরফ ও পাথর দিয়ে তৈরি হয়
ছবি: রয়টার্স

বৃহস্পতি বা শনির মতো গ্যাসীয় দানবাকার গ্রহগুলোর কেন্দ্র প্রথমে বরফ ও পাথর দিয়ে তৈরি হয়। এরপর তারা মহাকাশ থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস টেনে নিয়ে দানবীয় আকার ধারণ করে। অন্যদিকে পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহগুলো তৈরি হতে একটু বেশি সময় নেয়। নক্ষত্রের চারপাশের গ্যাসীয় বলয় সরে যাওয়ার পর অন্যান্য ছোট-বড় গ্রহাণুর সঙ্গে বিশাল সব সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এরা পূর্ণতা পায়।

আরও পড়ুন
বৃহস্পতি বা শনির মতো গ্যাসীয় দানবাকার গ্রহগুলোর কেন্দ্র প্রথমে বরফ ও পাথর দিয়ে তৈরি হয়। এরপর তারা মহাকাশ থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস টেনে নিয়ে দানবীয় আকার ধারণ করে।

গ্রহের মৃত্যু বলতে আসলে কী বোঝায়

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী ম্যাথিউ রেইনহোল্ড বলেন, গ্রহের মৃত্যু বলতে আসলে দুটি জিনিস বোঝাতে পারে। এক. গ্রহটি কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আক্ষরিক অর্থেই টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া। দুই. গ্রহটি তার আগের বাসযোগ্য পরিবেশ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা। ধরা যাক, একটি গ্রহে একসময় সুন্দর পরিবেশ ছিল, কিন্তু আজ সেখানে শুধুই উত্তপ্ত লাভা বা বরফের রাজত্ব। এই পরিবেশগত মৃত্যুও কিন্তু একধরনের মৃত্যুই!

পৃথিবীর শেষ পরিণতি

পৃথিবীর আয়ু সূর্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সূর্যের কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম তৈরি করছে এবং আমাদের আলো ও তাপ দিচ্ছে। আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের ভেতরের এই হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে।

শিল্পীর কল্পনায় সূর্যের ভবিষ্যৎ রূপ—লাল দানব নক্ষত্র
ছবি: প্রিটেন্ডার / গেটি ইমেজ

তখন সূর্য ফুলেফেঁপে এক বিশাল রেড জায়ান্ট বা লাল দৈত্যে পরিণত হবে। শন রেমন্ডের মতে, পৃথিবীর মৃত্যু ঘটবে কয়েকটি ধাপে। প্রথমত, সূর্যের তাপ এত বেড়ে যাবে যে পৃথিবীর সব মহাসাগরের পানি ফুটে বাষ্প হয়ে যাবে। পৃথিবী হয়ে উঠবে আক্ষরিক অর্থেই এক জ্বলন্ত নরক।

দ্বিতীয়ত, লাল দৈত্যে পরিণত হওয়া সূর্য ফুলে গিয়ে হয়তো পৃথিবীকে একেবারেই গিলে খাবে!

আরও পড়ুন
পৃথিবীর আয়ু সূর্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সূর্যের কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম তৈরি করছে এবং আমাদের আলো ও তাপ দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, পৃথিবী যদি কোনোভাবে বেঁচেও যায়, তবে সূর্যের মহাকর্ষীয় ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় এটি হয়তো ছিটকে আন্তনক্ষত্রিক মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে চিরতরে।

হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট আয়ু হবে প্রায় ৯৫০ কোটি বছর! তবে মহাবিশ্বের অনেক গ্রহ এর চেয়ে অনেক বেশি দিন বাঁচবে। কারণ, আমাদের সূর্য হলো একটি মাঝারি আকারের হলুদ বামন নক্ষত্র। কিন্তু মহাবিশ্বের বেশির ভাগ নক্ষত্রই লাল বামন বা রেড ডোয়ার্ফ। এরা আকারে ছোট, ঠান্ডা এবং খুব ধীরে ধীরে জ্বালানি পোড়ায়। ফলে এরা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর বেঁচে থাকতে পারে!

শিল্পীর কল্পনায়, লাল বামন নক্ষত্র বা রেড ডোয়ার্ফ
ছবি: মার্ক গার্লিক / সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি / গেটি ইমেজ

তাহলে এসব নক্ষত্রের চারপাশের গ্রহগুলোও কি ট্রিলিয়ন বছর বাঁচবে? বিজ্ঞানী রেইনহোল্ড বলছেন—না! নক্ষত্র বেঁচে থাকলেও এসব গ্রহের মৃত্যু হবে তাদের নিজেদের ভেতরের কারণে।

পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহগুলোর বাসযোগ্য থাকার জন্য টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া এবং কার্বন-সিলিকেট চক্রের মতো ভেতরের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা ভীষণ জরুরি। এটি গ্রহের প্রাকৃতিক থার্মোস্ট্যাট হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ১৬ থেকে ৯০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে এই গ্রহগুলোর ভেতরের ম্যান্টল বা গলিত পাথরের স্রোত পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে জমে যাবে। ফলে নক্ষত্র বেঁচে থাকলেও গ্রহটি ভেতর থেকে মরে গিয়ে একটি শীতল, প্রাণহীন পাথরের পিণ্ডে পরিণত হবে।

আরও পড়ুন
হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট আয়ু হবে প্রায় ৯৫০ কোটি বছর! তবে মহাবিশ্বের অনেক গ্রহ এর চেয়ে অনেক বেশি দিন বাঁচবে। কারণ, আমাদের সূর্য হলো একটি মাঝারি আকারের হলুদ বামন নক্ষত্র।

বড় নক্ষত্র ও গ্যাসীয় দৈত্যদের পরিণতি

এ-টাইপ নক্ষত্রগুলোর মতো বিশাল নক্ষত্রের আয়ু আবার খুব কম হয়—মাত্র ১০ কোটি থেকে ১০০ কোটি বছর। কারণ এরা খুব দ্রুত নিজেদের জ্বালানি শেষ করে ফেলে। ফলে এদের চারপাশের গ্রহগুলোর আয়ুও খুব কম হয়।

এ-টাইপ নক্ষত্রের আয়ু খুব কম হয়
ছবি: উইকিপিডিয়া

অন্যদিকে, তীব্র বিকিরণের কারণে অনেক সময় গ্যাসীয় দৈত্য গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল পুরোপুরি উড়ে যায়! গ্রহটি তার নক্ষত্রের কতটা কাছে আছে এবং তার মহাকর্ষ বল কতটা শক্তিশালী, তার ওপর নির্ভর করে কোটি কোটি বছর ধরে গ্যাসীয় গ্রহটি হয়তো তার গ্যাস হারিয়ে একটি শুকনো পাথুরে গ্রহে পরিণত হতে পারে।

মহাবিশ্বের শেষ দিনগুলোতে কী হবে

কোয়াড্রিলিয়ন (১-এর পর ১৫টি শূন্য) বছর পর মহাবিশ্বে এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। গ্রহগুলোর সঙ্গে একে অপরের ধাক্কা লাগবে, অথবা তারা তাদের নক্ষত্রের মায়া কাটিয়ে ছিটকে বেরিয়ে যাবে। কোটি কোটি গ্রহ কোনো নক্ষত্র ছাড়াই ঘুটঘুটে অন্ধকার মহাশূন্যে অনন্তকাল ধরে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াবে। শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহের কপালে কী জুটবে, তা নির্ভর করবে আমাদের এই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি বা ধ্বংসের ধরনটি কেমন হবে তার ওপর!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন