রোমান টেলিস্কোপে মহাকাশের যে ১০ রহস্যের উন্মোচন হবে

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উন্নয়নের পর, নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপটি উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত। সবকিছু ঠিক থাকলে ৩০ আগস্ট এই টেলিস্কোপের উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে! এর দৃষ্টিক্ষেত্র হাবল স্পেস টেলিস্কোপের চেয়ে ১০০ গুণ বড়। অভাবনীয় এই দৃষ্টিক্ষেত্রের কারণে রোমান টেলিস্কোপ আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে অনেক নতুন ও চমকপ্রদ তথ্য দেবে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত।

নাসার এই নতুন টেলিস্কোপটি থেকে আমরা মহাকাশ নিয়ে কী কী শিখতে পারব? চলুন জেনে নিই এমন ১০টি সম্ভাব্য মহাজাগতিক আবিষ্কারের কথা।

সবকিছু ঠিক থাকলে ৩০ আগস্ট রোমান টেলিস্কোপের উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে!ছবি: নাসা

১. মহাজাগতিক টানাপোড়েন কমানো

বিগ ব্যাংয়ের পর থেকে মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা গ্যালাক্সিগুলোর দূরে সরে যাওয়ার বেগ পরিমাপ করে এই প্রসারণের হার—হাবল ধ্রুবক—বের করতে পারেন। পাশাপাশি মহাবিশ্বের প্রাচীনতম আলোর ওপর ভিত্তি করেও এর পরিমাপ করা যায়। কিন্তু কয়েক দশক ধরে এই দুই পরিমাপ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে ‘হাবল টেনশন’ নামে পরিচিত। রোমান টেলিস্কোপ অসংখ্য গ্যালাক্সির গতি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে এই রহস্যের জট খুলতে বা এর পেছনের কারণ বুঝতে সাহায্য করবে।

২. ডার্ক এনার্জি কি পরিবর্তিত হচ্ছে

১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি সময়ের সঙ্গে বাড়ছে। এর পেছনে ডার্ক এনার্জি নামে এক অজানা শক্তি কাজ করছে বলে ধরা হয়। এই ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থের মহাকর্ষীয় প্রভাবের চেয়েও প্রায় তিনগুণ ভারী। কিন্তু সাম্প্রতিক ডেটা বলছে, এই রহস্যময় শক্তির প্রভাব হয়তো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। রোমান টেলিস্কোপের বিশাল তথ্যভাণ্ডার এই যুগান্তকারী ধারণাকে প্রমাণ বা বাতিল করতে সাহায্য করবে।

৩. মহাবিশ্বের গঠন কতটা পিণ্ডাকার

মহাজাগতিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয় হলো সিগমা-এইট। ডার্ক ম্যাটারের প্রভাবে গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলোর যতটা জমাট হওয়া উচিত ছিল, বাস্তবে সেগুলো তার চেয়ে কিছুটা বেশি ছড়ানো। রোমান টেলিস্কোপের বিশাল প্যানোরামিক ভিউ মহাজাগতিক কাঠামোর এই অসামঞ্জস্যতার রহস্য সমাধানে সাহায্য করবে।

আরও পড়ুন
১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি সময়ের সঙ্গে বাড়ছে। এর পেছনে ডার্ক এনার্জি নামে এক অজানা শক্তি কাজ করছে বলে ধরা হয়।

৪. এক্সোপ্ল্যানেটের তালিকায় জোয়ার

বিজ্ঞানীরা সাধারণত ট্রানজিট পদ্ধতিতে দূরবর্তী গ্রহগুলো আবিষ্কার করেন। ট্রানজিট পদ্ধতি মানে যখন কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায় এবং নক্ষত্রের আলো কমে যায়। এখন পর্যন্ত এমন ৬ হাজার ৩০০টির বেশি গ্রহের খোঁজ মিলেছে। রোমান টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির নক্ষত্রবহুল কেন্দ্রে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে আরও প্রায় ১ লাখ নতুন এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

৫. অচেনা নতুন জগতের সন্ধান

ট্রানজিট পদ্ধতি মূলত নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকা বড় গ্রহগুলো খুঁজে পায়। কিন্তু রোমান টেলিস্কোপ মাইক্রোলেন্সিং নামে একটি ভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে নক্ষত্র থেকে দূরে থাকা ছোট গ্রহগুলোরও সন্ধান করবে। পেছনের নক্ষত্রের আলোকে সামনের নক্ষত্র ও তার গ্রহের মহাকর্ষ কীভাবে বাঁকিয়ে দেয়, তা পর্যবেক্ষণ করে এটি প্রায় এক হাজারটি এমন এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে বের করবে, যা অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া সম্ভব হতো না।

৬. মিল্কিওয়েতে ভবঘুরে কারা

মাইক্রোলেন্সিংয়ের মাধ্যমে রোমান টেলিস্কোপ শুধু গ্রহই নয়, বরং মিল্কিওয়েতে ঘুরে বেড়ানো ছোট ব্ল্যাকহোল, নিউট্রন স্টার বা নির্দিষ্ট নক্ষত্রহীন ভবঘুরে গ্রহদেরও খুঁজে বের করবে। এর মাধ্যমে গ্যালাক্সিতে এমন ভবঘুরে মহাজাগতিক বস্তুর মোট সংখ্যা অনুমান করা বিজ্ঞানীদের জন্য সহজ হবে।

আরও পড়ুন
ট্রানজিট পদ্ধতি নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকা বড় গ্রহগুলো খুঁজে পায়। কিন্তু রোমান টেলিস্কোপ মাইক্রোলেন্সিং নামে ভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে নক্ষত্র থেকে দূরে থাকা ছোট গ্রহগুলোরও সন্ধান করবে।

৭. সমন্বিত জ্যোতির্বিজ্ঞান

২০১৭ সালে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং আলো—উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। রোমান টেলিস্কোপের বিশাল চোখ এ ধরনের মহাজাগতিক ঘটনাগুলো আরও বেশি খুঁজে পাওয়ার সুযোগ করে দেবে। এটি মহাজাগতিক বিস্ফোরণের আফটারগ্লো দ্রুত শনাক্ত করতে পারবে, যা অন্যান্য মানমন্দিরগুলোকে পরবর্তী পর্যবেক্ষণে দারুণ সহায়তা করবে।

৮. ডার্ক ম্যাটার কি পিণ্ডাকারে থাকে

মিল্কিওয়ের নক্ষত্রগুলো অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় প্রভাবে খুব দ্রুত ঘোরে। কিন্তু এই ডার্ক ম্যাটারের মেঘে কোনো পিণ্ড বা দলা আছে কি না, তা আমরা নিশ্চিত নই। রোমান টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ের প্রান্তের নক্ষত্রের স্রোত পর্যবেক্ষণ করে ডার্ক ম্যাটারের সবচেয়ে নিখুঁত একটি ম্যাপ তৈরি করবে।

৯. স্টারকোয়েক অনুসন্ধান

পৃথিবীর মতো সূর্যে বা অন্যান্য নক্ষত্রেও কম্পন সৃষ্টি হয়। কিন্তু নক্ষত্রের ভেতরের এই কম্পন কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে আমাদের জ্ঞান খুব সীমিত। অ্যাস্টেরোসিসমোলজি বা নক্ষত্র-কম্পন বিদ্যায় রোমান টেলিস্কোপ দারুণ ভূমিকা রাখবে। অসংখ্য নক্ষত্রের স্পষ্ট ছবি সংগ্রহের মাধ্যমে এটি মিল্কিওয়ে জুড়ে স্টারকোয়েক কীভাবে ঘটে, তার একটি বিস্তৃত ধারণা দেবে।

আরও পড়ুন
মিল্কিওয়ের নক্ষত্রগুলো অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় প্রভাবে খুব দ্রুত ঘোরে। কিন্তু এই ডার্ক ম্যাটারের মেঘে কোনো পিণ্ড বা দলা আছে কি না, তা আমরা নিশ্চিত নই।

১০. অজানা চমকের অপেক্ষা

রোমান টেলিস্কোপের সিনিয়র প্রজেক্ট সায়েন্টিস্ট জুলি ম্যাকএনারির মতে, এই টেলিস্কোপের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হয়তো এমন কিছু হবে যা নিয়ে কেউ এখনো ভাবেনি। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের বলে, কোনো নতুন টেলিস্কোপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ জিনিসগুলো হলো চমক—এমন কিছু যা আমরা আগে থেকে খুঁজছিলাম না। রোমানের ক্ষেত্রেও তা-ই হবে।’ এর বিশাল ডেটার প্রবাহ আগামী বছরগুলোতে এমন সব আবিষ্কারের জন্ম দেবে, যা আজ আমাদের কল্পনারও অতীত!

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন