মহাকর্ষ কতটা শক্তিশালী, তা আমরা বুঝতে পারি না কেন

এত বছর পরও কেন মহাকর্ষের সঠিক জোর মাপা যাচ্ছে না?ছবি: গেটি ইমেজ

প্রকৃতির যে চারটি মৌলিক বল রয়েছে, তার মধ্যে মহাকর্ষের সঙ্গেই আমাদের সবচেয়ে বেশি খাতির। এই বলটাই আমাদের পা মাটিতে আটকে রেখেছে, বিশাল সূর্যকে তার জায়গায় ধরে রেখেছে। কিন্তু একটি অদ্ভুত ব্যাপার শুনলে আপনি হয়তো চমকে যাবেন। এই মহাকর্ষীয় ধ্রুবক ঠিক কতটা শক্তিশালী, বিজ্ঞানীরা আজ পর্যন্ত তার নিখুঁত কোনো মান বের করতে পারেননি! ১৯৮০-এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা ডজনখানেকের বেশিবার মহাকর্ষের সঠিক মান মাপার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মুশকিল হলো, এক পরীক্ষার ফলের সঙ্গে আরেক পরীক্ষার ফলের কোনো মিলই পাওয়া যাচ্ছে না।

এত বছর পরও কেন মহাকর্ষের সঠিক জোর মাপা যাচ্ছে না?

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মহাকর্ষ বল আসলে প্রচণ্ড দুর্বল। আমরা সারাক্ষণ পৃথিবীর টান অনুভব করি বলে আমাদের কাছে এটিকে অনেক শক্তিশালী মনে হয়। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যে কিংবা পরীক্ষাগারে রাখা যায় এমন যেকোনো দুটি জিনিসের মধ্যে মহাকর্ষ বল এতই ক্ষীণ যে তা মাপা প্রায় অসাধ্য।

মহাকর্ষ বল আসলে প্রচণ্ড দুর্বল
ছবি: গেটি ইমেজ

বিষয়টা একটু সহজ করে বলি। ধরুন, আপনি একটি ছোট চুম্বক দিয়ে টেবিল থেকে একটি লোহার আলপিন টেনে তুললেন। ভেবে দেখুন তো, পুরো পৃথিবীর বিশাল ভরের মহাকর্ষ বল আলপিনটিকে নিচের দিকে টানছে, অথচ আপনার হাতের ছোট্ট চুম্বকটি সেই বিশাল পৃথিবীর টানকে হারিয়ে আলপিনটিকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে! বুঝতে পারছেন, অন্যান্য বলের তুলনায় মহাকর্ষ কতটা দুর্বল?

আরও পড়ুন
শ্লেমিঙ্গার ও তাঁর দল মহাকর্ষের মান নিখুঁতভাবে মাপার জন্য যে পরীক্ষা করেছিলেন, সেই পরীক্ষায় তারা মহাকর্ষের যে মানটি পেয়েছেন তা হলো ৬.৬৭৩৮৭ × ১০-১১ মিটার.কেজি-১.সেকেন্ড-২

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির পদার্থবিদ স্টেফান শ্লেমিঙ্গার ঠিক এই কথাটাই বলেছেন। তার মতে, পরীক্ষাগারে মহাকর্ষ মাপতে গেলে বিশাল পৃথিবীর মহাকর্ষের পটভূমিতে দাঁড়িয়েই একটি অতি ক্ষুদ্র বল মাপতে হয়। এর জন্য দুটি নির্দিষ্ট ভরের বস্তুকে খুব কাছাকাছি এনে তাদের মধ্যকার আকর্ষণ বল মাপার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা।

সম্প্রতি শ্লেমিঙ্গার ও তাঁর দল মহাকর্ষের মান নিখুঁতভাবে মাপার জন্য একটি বিশাল পরীক্ষা চালান। সেখানে তারা ১৩ টন পারদ ব্যবহার করেন। বোঝার সুবিধার্থে বলি, ১৩ টন মানে প্রায় দুটি পূর্ণবয়স্ক হাতির ওজনের সমান! কিন্তু এত বিপুল ভর ব্যবহারের পরও দেখা গেল, পারদগুলোর মধ্যকার মহাকর্ষ বলের পরিবর্তন পৃথিবীর নিজস্ব মহাকর্ষের তুলনায় মাত্র দশ লাখ ভাগের এক ভাগ!

এই পরীক্ষায় তারা মহাকর্ষের যে মানটি পেয়েছেন তা হলো ৬.৬৭৩৮৭ × ১০-১১ মিটার.কেজি-১.সেকেন্ড-২। এই মান আগের পাওয়া মানের চেয়ে ০.০২৩৫% কম। আপনার কাছে হয়তো মনে হতে পারে, এত সামান্য পার্থক্যে কী-ই বা আসে যায়! কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে এটি পাহাড়সমান পার্থক্য।

জার্মান ন্যাশনাল মেট্রোলজি ইনস্টিটিউটের পদার্থবিদ ক্রিস্টিয়ান রথলেইটনার বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, মহাকর্ষের এই অতি ক্ষুদ্র বলটিকে দশমিকের পর অন্তত ছয় ঘর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপতে হয়। এই কাজটি কতটা কঠিন জানেন? এটি অনেকটা মানুষের শরীরের মাত্র ৭টি কোষের ওজন মাপার চেষ্টা করার মতো!

আরও পড়ুন
ভুলের মাত্রা যত কম দেখাতে পারবেন, তারা তত বেশি বিখ্যাত হবেন। এই চাপের কারণেই হয়তো বিজ্ঞানীরা অবচেতনভাবে তাদের ভুলের মাত্রাগুলোকে বাস্তবের চেয়ে একটু বেশিই ছোট করে দেখান।

পার্থক্যটা কোথায়: পদার্থবিজ্ঞান, প্রযুক্তি নাকি মনস্তত্ত্ব

বিজ্ঞানীরা যখনই মহাকর্ষ মাপেন, তারা দাবি করেন যে তাদের হিসাব প্রায় নিখুঁত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে যে সামান্য ভুলের মাত্রা থাকে, সেগুলোও একটার সঙ্গে আরেকটা মেলে না। শ্লেমিঙ্গারের মতে, এর পেছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে। তিনি একে মজার ছলে ডাকেন পিইপি। মানে ফিজিকস, ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইকোলজি। একেক করে সবগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

পদার্থবিজ্ঞান: শ্লেমিঙ্গারের মতে, এর সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। তবে এমনও তো হতে পারে যে, মহাকর্ষের এমন কোনো নিয়ম আছে যা আমরা এখনো আবিষ্কারই করতে পারিনি! ঠিক যেমনভাবে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রকে নতুন রূপ দিয়েছিল আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, স্থান ও কাল মিলে যে অদৃশ্য বুনন তৈরি হয়েছে, মহাকর্ষের প্রভাবে সেটি বেঁকে যায় বা বিকৃত হয়
ছবি: শাটারস্টক

প্রযুক্তি বা ইঞ্জিনিয়ারিং: একেকটি পরীক্ষায় একেক ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। কেউ ব্যবহার করেন টর্শন ব্যালেন্স, কেউ ব্যবহার করেন দোলক, আবার কেউ ওপর থেকে বস্তু ফেলে দিয়ে মাপার চেষ্টা করেন। একেক যন্ত্রের ভুলের ধরন একেক রকম। সেগুলোকে মহাকর্ষের মূল সংকেত থেকে আলাদা করা ভীষণ কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের ভুল। ক্রিস্টিয়ান রথলেইটনার মনে করেন, আসল সমস্যাটা পদার্থবিজ্ঞানে নয়, বরং আমাদের পরিমাপ প্রযুক্তিতেই লুকিয়ে আছে।

মনস্তত্ত্ব: শ্লেমিঙ্গারের মতে, এটিই সবচেয়ে জোরালো কারণ। বিজ্ঞানীদের ওপর সবসময় নিখুঁত ফলাফল দেওয়ার একটা মানসিক চাপ থাকে। কারণ, ভুলের মাত্রা যত কম দেখাতে পারবেন, তারা তত বেশি বিখ্যাত হবেন। এই চাপের কারণেই হয়তো বিজ্ঞানীরা অবচেতনভাবে তাদের ভুলের মাত্রাগুলোকে বাস্তবের চেয়ে একটু বেশিই ছোট করে দেখান। এ কারণেই এক পরীক্ষার সঙ্গে অন্য পরীক্ষার ফলাফল মেলে না।

আরও পড়ুন
শ্লেমিঙ্গারের মতে, পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। তবে এমনও তো হতে পারে যে, মহাকর্ষের এমন কোনো নিয়ম আছে যা আমরা এখনো আবিষ্কারই করতে পারিনি!

নিখুঁত হিসাব না জানলে ক্ষতি কী

সত্যি বলতে, দৈনন্দিন বা মহাকাশ গবেষণার কাজে মহাকর্ষের এই অতি-নিখুঁত মানটি না জানলেও আমাদের কাজ খুব একটা আটকে নেই। পৃথিবীর ভর ও মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের গুণফল আমাদের জানা আছে। রকেট মহাকাশে পাঠানোর জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট। রথলেইটনারের ভাষায়, ‘মহাকর্ষের এই নিখুঁত মানটা আসলে কেবল তাত্ত্বিক আগ্রহের বিষয়। এটি খুব বেশি জরুরি হলে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো আরও অনেক আগেই এটি নিখুঁতভাবে মাপার জন্য উঠেপড়ে লাগত।’

তবুও শ্লেমিঙ্গারের কাছে এটি দারুণ রোমাঞ্চকর বিষয়। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে আমাদের মনে হয় সবকিছুই তো আবিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বুঝবেন, বিজ্ঞানে এখনো অনেক অজানা সীমানা রয়ে গেছে। সমস্যাগুলো হয়তো ছোট, কিন্তু সেগুলো সমাধান করার আনন্দই আলাদা।’

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন