ঘরে ফিরলেন আর্টেমিস ২ মিশনের ৪ নভোচারী

১০ দিনের মিশন শেষে পৃথিবীতে ফিরেছেন আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারীছবি: নাসা

মহাকাশের অনন্ত শূন্যতা ও চাঁদের বুক থেকে এক মহাকাব্যিক যাত্রা শেষে চিরচেনা নীল গ্রহে ফিরে এসেছেন মানবজাতির চার বীর সন্তান। স্থানীয় সময় ১০ এপ্রিল, শুক্রবার ৫টা ৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১১ এপ্রিল, শনিবার সকাল ৬টা ৭ মিনিটে) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে সফলভাবে অবতরণ করেছে নাসার ওরিয়ন ক্যাপসুল। এর মধ্য দিয়েই সফল সমাপ্তি ঘটল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর মহাকাশ অভিযান আর্টেমিস ২ মিশনের।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তীব্র গতিতে প্রবেশের পর যখন ওরিয়ন ক্যাপসুলটি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে আছড়ে পড়ে, তখন সবার মনেই ছিল চরম উৎকণ্ঠা। একটু পর রেডিওতে ভেসে আসে মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের স্বস্তির বাণী—‘ফোর গ্রিন ক্রু মেম্বারস!’ অর্থাৎ, তিনি এবং তাঁর তিন সঙ্গী নাসার ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন পুরোপুরি সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ওয়াইজম্যান শুধু যোগ করেন, ‘কী অসাধারণ এক যাত্রা!’

বাংলাদেশ সময় গত ২ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে এই চার নভোচারী যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন তাঁদের কাঁধে ছিল এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭-এর পর এই প্রথম কোনো মানুষ চাঁদের এত কাছাকাছি গেল। শুধু তা-ই নয়, পৃথিবী থেকে ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩ মিশনের গড়া মানুষের সবচেয়ে দূরবর্তী মহাকাশযাত্রার রেকর্ডটিও তাঁরা ভেঙে দিয়েছেন।

পৃথিবীতে ফেরার পর ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ
ছবি: নাসা

আর্টেমিস ২ মিশনটি মূলত ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানগুলোর জন্য একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ছিল। সেই পরীক্ষায় ওরিয়ন ক্যাপসুল লেটার মার্কস নিয়ে পাস করেছে। তবে এর বাইরেও মিশনের বেশ কিছু দারুণ বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য ছিল। আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদকে কেবল ধুসর রঙেরই দেখি। কিন্তু নভোচারীরা চাঁদের খুব কাছে গিয়ে দেখেছেন এর আসল রূপ। ধুসর রঙের বাইরেও চাঁদের বুকে তাঁরা সবুজ, বাদামি এবং কমলা রঙের চমৎকার সব আভা দেঘেছেন! বিশেষ করে চাঁদের উল্টো পিঠে, যা এর আগে কোনো মানুষের চোখ সরাসরি দেখার সুযোগ পায়নি।

আরও পড়ুন
নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থাগুলোর এখন মূল লক্ষ্য চাঁদের বুকে মানুষের একটি স্থায়ী বেস তৈরি করা। চীনও ঠিক একই স্বপ্ন দেখছে।

তবে যখনই একই ফ্রেমে চাঁদ এবং পৃথিবী ধরা দিচ্ছিল, তখন তৈরি হচ্ছিল এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলো চাঁদের ওপর পড়ে এক জাদুকরী দৃশ্যের জন্ম দিচ্ছিল। নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ বলেন, ‘চাঁদটা তখন যেন আলোর একটা স্পঞ্জ হয়ে গিয়েছিল! পৃথিবী যখন আমার জানালার ফ্রেমের কাছাকাছি এল, তখন এর আলোয় চাঁদটা যেন অনুজ্জ্বল হয়ে গেল।’

ওরিয়ন ক্যাপসুলের জানালা দিয়ে আসা পৃথিবীর এই আলো এতই তীব্র ছিল যে, নভোচারীদের একটি বাড়তি শার্ট দিয়ে জানালা ঢেকে রাখতে হয়েছিল! ভবিষ্যতে নভোযানের জানালায় যেন আলাদা পর্দা থাকে, সেই দাবিও তুলেছেন তাঁরা।

পৃথিবীতে ফেরার পর জেরেমি হ্যানসেন ও রিড ওয়াইজম্যান
ছবি: নাসা

চাঁদের পেছনে থাকার সময় নভোচারীরা এমন এক সূর্যগ্রহণ দেখেছেন, যা পৃথিবী থেকে দেখা অসম্ভব। বিশাল চাঁদের দিগন্তের পেছনে সূর্যটাকে তখন ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো মনে হচ্ছিল। ওয়াইজম্যান বলেন, ‘গ্রহণটা হলো, আর আমরা পাঁচ মিনিট ধরে মহাকাশের বিশালতায় ভাসতে থাকা ওই গোলকটার দিকে তাকিয়ে আবেগে ভাসলাম। ঠিক তার পরপরই কেউ একজন বলে উঠল, ‘চলো উল্কাপাতের ঝলকানি খোঁজার চেষ্টা করি!’ জাদুকরীভাবে আমরা এক, দুই, তিন করে বেশ কয়েকটি ঝলকানি দেখতে পেলাম!’

আরও পড়ুন
আর্টেমিস ২ মিশনের এই দুর্দান্ত সাফল্যের পর সবার চোখ এখন ভবিষ্যতের দিকে। আর্টেমিস প্রোগ্রামের পরবর্তী ধাপ, অর্থাৎ আর্টেমিস ৩ মিশনটি ২০২৭ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

চাঁদের বুকে উল্কাপিণ্ড আছড়ে পড়ার এই সাময়িক আলোর ঝলকানিগুলো দেখা এই মিশনের অন্যতম বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য ছিল। ভবিষ্যতের মিশনগুলোতে চাঁদের বুকে নভোচারীদের জন্য উল্কাপাত কতটা ঝুঁকির কারণ হতে পারে, তা বুঝতে এই পর্যবেক্ষণ দারুণ কাজে লাগবে।

আর্টেমিস ২ মিশনের এই দুর্দান্ত সাফল্যের পর সবার চোখ এখন ভবিষ্যতের দিকে। আর্টেমিস প্রোগ্রামের পরবর্তী ধাপ, অর্থাৎ আর্টেমিস ৩ মিশনটি ২০২৭ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সম্প্রতি এর পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। এই মিশনে নভোচারীরা চাঁদে নামবেন না, বরং পৃথিবীর কক্ষপথে লুনার ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং করার কৌশল পরীক্ষা করবেন। এরপর ২০২৮ সালে আর্টেমিস ৪ মিশনে মানুষ আবারও চাঁদের বুকে পা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থাগুলোর এখন মূল লক্ষ্য চাঁদের বুকে মানুষের একটি স্থায়ী বেস তৈরি করা। চীনও ঠিক একই স্বপ্ন দেখছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, কয়েক দশকের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাওয়ার মতোই চাঁদে যাওয়াটা মানুষের জন্য একটি রুটিন যাত্রায় পরিণত হবে।

তবে চাঁদের মাটিতে কখন ঘাঁটি তৈরি হবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা চাঁদের উল্টো পিঠ থেকে যে ছবি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে পৃথিবীর বুকে ফিরে এলেন, তা সন্দেহাতীতভাবেই আমাদের মহাকাশ ভাবনায় নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এই স্প্ল্যাশডাউন শুধু চারজন মানুষের ঘরে ফেরাই নয়, বরং এটি অসীম মহাকাশ জয়ের পথে মানবতার এক নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান ও সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও পড়ুন