মহাকাশে নতুন রেকর্ড গড়ে পৃথিবীর পথে আর্টেমিসের নভোচারীরা
মিশনের ষষ্ঠ দিনে পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে পৌঁছে এক নতুন ইতিহাস গড়েছিলেন আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী। মানুষের ইতিহাসে এর আগে কেউই নিজের গ্রহ ছেড়ে এত দূর মহাকাশে পাড়ি জমায়নি! যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরুর পাঁচ দিন পর, বাংলাদেশ সময় গত মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল চাঁদের মহাকর্ষের টানে নভোচারীরা চাঁদের উল্টো পিঠের দিকে ছুটে যান।
হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল থেকে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেনি গিবনস তাঁদের উদ্দেশে বলেন, ‘পুরো মানবজাতির হয়ে আজ আপনারা অজানার সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।’
উত্তরে আর্টেমিস ২ মিশনের কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন আগের মহাকাশ-পথিকৃৎদের স্মরণ করে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া, এই প্রজন্মের এবং আগামী প্রজন্মের কেউ যেন খুব দ্রুতই আমাদের এই রেকর্ডটি ভেঙে দেয়। এই রেকর্ড যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়।’
এর কয়েক ঘণ্টা পরই হ্যানসেন এবং নাসার তিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার এবং ক্রিস্টিনা কোচ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের আড়ালে হারিয়ে যান।
হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল থেকে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেনি গিবনস তাঁদের উদ্দেশে বলেন, ‘পুরো মানবজাতির হয়ে আজ আপনারা অজানার সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।’
ইস্টার্ন টাইম বা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৪টা ৪৪ মিনিট) আর্টেমিস ২ থেকে আসা ভিডিও সম্প্রচার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। মহাকাশযান ইন্টিগ্রিটি চাঁদের উল্টো পিঠে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বাকি ৮০০ কোটি মানুষের সঙ্গে তাঁদের রেডিও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সময়ই তাঁরা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে এবং চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি (৪ হাজার মাইলের একটু বেশি) অবস্থান করছিলেন।
টানা ৪০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতার পর নভোচারীরা আবার মানুষের সঙ্গে যুক্ত হন। নভোযানের জানালা দিয়ে তাঁরা দেখতে পান, সূর্যের আলোয় আলোকিত একফালি সরু পৃথিবী আবার উঁকি দিচ্ছে।
‘পৃথিবীর কণ্ঠস্বর আবার শুনতে পাওয়াটা দারুণ ব্যাপার!’ বলে ওঠেন ক্রিস্টিনা কোচ। তাঁদের ঠিক নিচেই, চাঁদের দিকে মুখ করে ছিল এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর। ক্রিস্টিনা এই মুহূর্তটিকে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘মানুষ শুধু চাঁদে ফিরে যাবে না, বরং সেখানে স্থায়ী উপস্থিতিও তৈরি করবে। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা সব সময় পৃথিবীকেই বেছে নেব। আমরা সব সময় একে অপরকেই বেছে নেব।’
টানা ৪০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতার পর নভোচারীরা আবার মানুষের সঙ্গে যুক্ত হন। নভোযানের জানালা দিয়ে তাঁরা দেখতে পান, সূর্যের আলোয় আলোকিত একফালি সরু পৃথিবী আবার উঁকি দিচ্ছে।
জিম লাভেলের আবেগঘন বার্তা এবং চাঁদের বুকে স্ত্রীর নাম
সোমবার নভোচারীদের দিনটি শুরু হয়েছিল একটি অপ্রত্যাশিত কণ্ঠস্বর দিয়ে। ১৯৬৮ সালে চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করা অ্যাপোলো ৮ মিশনের পাইলট এবং অ্যাপোলো ১৩ মিশনের কমান্ডার জিম লাভেল তাঁদের একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। গত আগস্টে মারা যাওয়ার আগেই তিনি এই বার্তাটি রেকর্ড করে গিয়েছিলেন।
বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমার পুরোনো পাড়ায় তোমাদের স্বাগতম! এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। আমি জানি তোমরা কতটা ব্যস্ত থাকবে, তবে জানালা দিয়ে দৃশ্য উপভোগ করতে ভুলো না।’
নভোচারীরা ঠিক তা-ই করেছিলেন। তবে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের সেই দূরত্বের রেকর্ড ভাঙার পর আসে দিনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি। জেরেমি হ্যানসেন চাঁদের দুটি গর্তের নামকরণের জন্য মিশন কন্ট্রোলের কাছে অনুরোধ জানান। একটির নাম মহাকাশযানের সঙ্গে মিল রেখে ইন্টিগ্রিটি রাখেন। আর অন্যটি মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের স্ত্রী ক্যারলের নামে, যিনি ২০২০ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
গলা ধরে আসা কণ্ঠে হ্যানসেন বলেন, ‘এটি চাঁদের বুকে একটি উজ্জ্বল গর্ত, আমরা এর নাম দিতে চাই ক্যারল।’ নভোচারীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। হিউস্টনের দর্শক গ্যালারি থেকে ওয়াইজম্যানের দুই মেয়ে যখন এই দৃশ্য দেখছিলেন, তখন মিশন কন্ট্রোল রুমে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়।
বার্তায় জিম লাভেল বলেন, ‘আমার পুরোনো পাড়ায় তোমাদের স্বাগতম! এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। আমি জানি তোমরা কতটা ব্যস্ত থাকবে, তবে জানালা দিয়ে দৃশ্য উপভোগ করতে ভুলো না।’
এরপর শুরু হয় বিজ্ঞানের আসল কাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলে চাঁদের পৃষ্ঠের নিখুঁত পর্যবেক্ষণ। ইন্টিগ্রিটি থেকে তোলা একটি নতুন ছবিতে ৬০০ মাইল চওড়া ওরিয়েন্টাল বেনের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখা যায়, যা চাঁদের সামনের ও পেছনের দিকজুড়ে বিস্তৃত। মানুষ আগে কখনোই এই গর্তের পুরোটা একসঙ্গে দেখেনি। রিড ওয়াইজম্যান বলেন, ‘ওরিয়েন্টালকে এখন প্রচণ্ড জীবন্ত ও ত্রিমাত্রিক দেখাচ্ছে।’
ক্রিস্টিনা কোচ চাঁদের বুকে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে নতুন তৈরি হওয়া ছোট ছোট গর্ত পর্যবেক্ষণ করেন। এই আঘাতের ফলে চাঁদের মাটির নিচের হালকা রঙের অংশ বেরিয়ে এসেছিল। তিনি বলেন, ‘এটা দেখতে ঠিক ল্যাম্পশেডের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে আলো বেরিয়ে আসার মতো লাগছে! চাঁদের বাকি অংশের তুলনায় এগুলো অনেক বেশি উজ্জ্বল।’
নভোচারীদের জন্য আরও একটি মহাজাগতিক উপহার অপেক্ষা করছিল, একটি বিরল সূর্যগ্রহণ! চাঁদ যখন সূর্যের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন শুধু পৃথিবীর প্রতিফলিত আলোয় আলোকিত চাঁদের সেই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন ছিল। গ্লোভার বলেন, ‘চাঁদের এত বড় একটা অংশ এভাবে দেখাটা সত্যিই অদ্ভুত!’
নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে ছোট ছোট পাঁচটি উল্কাপিণ্ডের আঘাতের আলোর ঝলকানিও গুনতে পেরেছিলেন। অন্ধকারের পটভূমিতে তাঁরা লালচে মঙ্গল গ্রহ এবং কিছুটা কমলা রঙের শনি গ্রহেরও দেখা পান।
ক্রিস্টিনা কোচ চাঁদের বুকে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে নতুন তৈরি হওয়া ছোট ছোট গর্ত পর্যবেক্ষণ করেন। এই আঘাতের ফলে চাঁদের মাটির নিচের হালকা রঙের অংশ বেরিয়ে এসেছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফোন এবং ঘরে ফেরা
সূর্য যখন চাঁদের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে, তখন বিজ্ঞানের এই দীর্ঘ দিনের সমাপ্তি ঘটে। এরপর নভোচারীদের সঙ্গে ফোনে যুক্ত হন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নভোচারীদের কাছে জানতে চান, পুরো বিশ্ব থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার ওই সময়টা তাঁদের কেমন লেগেছিল?
গ্লোভার জানান, তাঁরা তখন নিজেদের কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন। তবে তিনি হাসতে হাসতে যোগ করেন, ‘সত্যি বলতে, ওই সময়টা বেশ ভালোই কেটেছে!’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁদের ওভাল অফিসে আমন্ত্রণ জানানোর কথা জানিয়ে অটোগ্রাফ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
এরপর মিশনের সপ্তম দিনে নভোচারীরা বিশ্রাম নেন। ১০ এপ্রিল ইন্টিগ্রিটি চাঁদের মহাকর্ষীয় বাঁধা কাটিয়ে বেরিয়ে আসবে এবং পৃথিবীর মহাকর্ষ বল আবার যানটিকে নিজের দিকে প্রবলভাবে টানতে শুরু করবে। এ ছাড়া নভোচারীরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং জনসন স্পেস সেন্টারের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিজেদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে বাংলাদেশ সময় শনিবার প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে অবতরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এই চার বীর।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এখানে ফিরে আসতে আমাদের এত দীর্ঘ সময় লাগল! তবে আমরা অবশেষে পৌঁছেছি এবং আর কখনোই এটি ছেড়ে যাব না। এটি একটি দুর্দান্ত যাত্রার শুরু মাত্র।’