চাঁদের উল্টোপাশে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থায় কী করলেন নভোচারীরা
মহাকাশযাত্রার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও ভয়ের মুহূর্ত হলো, কোনো নভোযানের চাঁদের উল্টো পাশে চলে যাওয়া। কারণ, তখন চাঁদ স্বয়ং পৃথিবী ও মহাকাশযানের মাঝে বিশাল এক দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে পৃথিবীর সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর্টেমিস ২ মিশনের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। ওরিয়ন স্পেসক্রাফট যখন চাঁদের উল্টো পাশে ছিল, তখন প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবীর মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে নভোচারীদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার ও পিনপতন নিস্তব্ধতা ছিল। পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মাইল দূরে পৃথিবীর সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ ছিল না চার নভোচারীর! এই ৪০ মিনিট তাঁরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকেননি। এই সময়টাতেই তাঁরা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা মেতে উঠেছিলেন চাঁদের উল্টো পিঠের রহস্য উন্মোচনে।
বাংলাদেশ সময় আজ ৭ এপ্রিল, মঙ্গলবার ঘটেছে এই ঐতিহাসিক ঘটনা। আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী চাঁদের উল্টো পাশ দিয়ে উড়ে গেছেন। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ আবার আমাদের এই মহাজাগতিক প্রতিবেশীর এত কাছে গেল।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে অবস্থিত নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের মিশন কন্ট্রোল রুমে তখন টানটান উত্তেজনা ছিল। বিজ্ঞানীদের চোখ আটকে ছিল মনিটরে। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলেছিল এই লুনার ফ্লাইবাই।
আর্টেমিস ২ মিশনের ওরিয়ন স্পেসক্রাফট যখন চাঁদের উল্টো পাশে ছিল, তখন প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবীর মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে নভোচারীদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
চাঁদের উল্টো পিঠের রহস্য
চাঁদের যে পিঠটা আমরা পৃথিবী থেকে সব সময় দেখি, উল্টো পিঠটা তার চেয়ে একদম আলাদা। আমাদের দিকের পিঠে প্রাচীন লাভা প্রবাহের বিশাল সব সমতল প্রান্তর আছে। কিন্তু উল্টো পিঠে এমন লাভার প্রান্তর প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানকার ভূত্বক অনেক বেশি পুরু। আর সেখানে গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি হওয়া গর্ত বা ক্রেটারের সংখ্যাও অনেক বেশি।
নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চাঁদ এবং সূর্যের বর্তমান জ্যামিতিক অবস্থানের কারণে চাঁদের উল্টো পাশের মাত্র ২০ ভাগে সূর্যের আলো পড়বে। চাঁদের উল্টো পিঠের অনেক জায়গাতেই মানুষ কখনো সূর্যের আলো পড়তে দেখেনি। বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন, হয়তো এবার আরও বড় কোনো আলোকিত অংশ দেখা যাবে।
তবুও মিশন বিজ্ঞানীরা ভীষণ রোমাঞ্চিত। কারণ, যেটুকু অংশে আলো পড়েছে, সেখানকার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো নভোচারীরা নিজেদের চোখে সরাসরি দেখতে পেয়েছেন।
গবেষকদের আগ্রহের তালিকার একেবারে শীর্ষে ছিল ওরিয়েন্টাল বেসিন। এটি চাঁদের দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত ৯৩০ কিলোমিটার চওড়া একটি বিশাল গর্ত। এর ভেতরে অনেকগুলো বলয় বা রিং আছে।
নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চাঁদ এবং সূর্যের বর্তমান জ্যামিতিক অবস্থানের কারণে চাঁদের উল্টো পাশের মাত্র ২০ ভাগে সূর্যের আলো পড়বে।
আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে চাঁদের ওপর বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়েছিল অসংখ্য গ্রহাণু। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে লেট হেভি বোম্বার্ডমেন্ট। সেই সময়ে তৈরি হওয়া অসংখ্য গর্তের মধ্যে ওরিয়েন্টাল বেসিন সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে নতুন। বিজ্ঞানীদের ধারণা, একটি বিশাল গ্রহাণু চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ার পর এটি তৈরি হয়েছিল। আঘাতের ফলে চাঁদের পাথর বাষ্প হয়ে গিয়েছিল। সেই ধাক্কায় চারদিকে সুনামির ঢেউয়ের মতো ছিটকে পড়েছিল গলিত পদার্থ। এরপর আঘাতের জায়গার চারপাশের ভূত্বক ধসে পড়ে এই বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়।
আর্টেমিস ২ মিশনের প্রধান বিজ্ঞানী কেলসি ইয়াং বলেন, ‘পুরো সৌরজগতে কীভাবে গ্রহাণুর আঘাতে গর্ত তৈরি হয়, তা বোঝার জন্য ওরিয়েন্টাল বেসিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি এত বিশাল এবং বিস্তারিত যে, বিজ্ঞানীরা অন্য গ্রহে গর্ত তৈরির প্রক্রিয়া বোঝার জন্য একে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে ব্যবহার করেন।’
এই বেসিনটি চাঁদের সামনের ও পেছনের দিকের ঠিক সীমানায় অবস্থিত। তাই চাঁদ যখন নিজের কক্ষপথে সামান্য একটু দোলে, তখন পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর এক প্রান্তের একটুখানি ঝলক দেখতে পান। কিন্তু মানুষের চোখ আজ পর্যন্ত এর পুরো সৌন্দর্য একবারে দেখতে পায়নি। এবার হয়তো নভোচারীরা সেই সুযোগ পেলেন!
এই ফ্লাইবাইয়ের সময় আরও কিছু গর্তে সূর্যের আলো পড়ার কথা ছিল। মানুষের চোখ এই আলোকিত গর্তগুলো আগে কখনো সরাসরি দেখেনি। এর মধ্যে একটি হলো ৬৪ কিলোমিটার চওড়া ‘ওম’ ক্রেটার। বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিদ জর্জ ওমের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, একটি বিশাল গ্রহাণু চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ার পর ওরিয়েন্টাল বেসিন তৈরি হয়েছিল। এই বেসিনটি চাঁদের সামনের ও পেছনের দিকের ঠিক সীমানায় অবস্থিত।
এ ছাড়া নভোচারীরা ৯ কিলোমিটার চওড়া পিয়েরাজ্জো ক্রেটারও হয়তো পর্যবেক্ষণ করেছেন। ইতালীয়-মার্কিন গ্রহ-বিজ্ঞানী এলিসাবেটা পিয়েরাজ্জোর নামে এই গর্তের নাম রাখা হয়েছে। তিনি গ্রহাণুর আঘাতসংক্রান্ত গবেষণায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং ২০১১ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান।
নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে রঙের এবং উজ্জ্বলতার সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো খেয়াল করেছেন। সূর্যের আলোর কোণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের ভূপ্রকৃতি দেখতে কেমন লাগে, সেটাও তাঁরা পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই মিশনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, নভোযানের রোবোটিক ক্যামেরায় তোলা ছবির চেয়ে মানুষের চোখের এই সরাসরি পর্যবেক্ষণ অনেক বেশি জীবন্ত। এটি মানুষের উপলব্ধি ও অন্তর্দৃষ্টির এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
আর্টেমিস ২ মিশনের ক্রুরা চাঁদের দিগন্তের ওপর দিয়ে পৃথিবীকে অস্ত যেতে এবং নতুন করে উদিত হতে দেখেছেন। এটি ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো ৮ মিশনের নভোচারীদের দেখা সেই বিখ্যাত আর্থরাইজ বা পৃথিবী-উদয়ের স্মৃতি নিশ্চয়ই ফিরিয়ে এনেছে।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, চাঁদের উল্টো পাশ দিয়ে ঘোরার সময় নভোচারীরা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একটি সূর্যগ্রহণ দেখতে পেয়েছেন! চাঁদ তখন সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করে রেখেছিল। এই অন্ধকারের সময়ে তাঁরা সূর্যের করোনা বা সবচেয়ে বাইরের বায়ুমণ্ডলের হালকা আস্তরণটি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং ছবি তুলেছেন। এ ছাড়া তাঁরা চাঁদের অন্ধকার পিঠের দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রেখেছেন। হঠাৎ যদি কোনো উল্কাপিণ্ড চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ে, তবে সেই আলোর ঝলকানি দেখার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনাও তাঁদের ছিল।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, চাঁদের উল্টো পাশ দিয়ে ঘোরার সময় নভোচারীরা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একটি সূর্যগ্রহণ দেখতে পেয়েছেন! চাঁদ তখন সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করে রেখেছিল।
এই দারুণ সব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করার জন্য নভোচারীদের কাছে ছিল তিনটি নিকন ক্যামেরা। এর মধ্যে একটিতে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত জুম লেন্স লাগানো ছিল। এ ছাড়া সাধারণ ছবি তোলার জন্য তাঁদের কাছে ছিল আইফোন।
চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় ওরিয়ন ক্যাপসুলটি চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ওপরে ছিল। তখন জানালার বাইরে চাঁদকে দেখতে ঠিক একটা বাস্কেটবলের মতো মনে হয়েছে। এমন দৃশ্য আগে কেউ চোখে দেখেনি।