আর্টেমিস ৩ মিশনের জন্য ৪ নভোচারীর নাম ঘোষণা করল নাসা
দীর্ঘ ৫৬ বছর পর আবারও মানুষের পদচিহ্ন পড়তে যাচ্ছে চাঁদের বুকে! ২০২৮ সালে চাঁদে মানুষ পাঠানোর সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের আগে নাসার চাই একেবারে নিখুঁত প্রস্তুতি। তাই চাঁদে পা রাখার আগে পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথেই এক শ্বাসরুদ্ধকর মহড়ার পরিকল্পনা করেছে নাসা। এই মিশনটিকে স্বয়ং নাসা বলছে, ‘নাসার সবচেয়ে জটিল মিশনগুলোর একটি।’
আগামী বছরই পৃথিবীর নিম্ন-কক্ষপথে উড়াল দেবে আর্টেমিস ৩। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ মিশনের জন্য ৯ জুন, মঙ্গলবার (বাংলাদেশ সময় ১০ জুন, বুধবার) চার নভোচারীর নাম ঘোষণা করে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। তাঁরা হলেন কমান্ডার র্যান্ডি ব্রেসনিক, পাইলট লুকা পারমিতানো, মিশন স্পেশালিস্ট ফ্র্যাঙ্ক রুবিও এবং মিশন স্পেশালিস্ট আন্দ্রে ডগলাস।
এই মিশনের নেতৃত্ব দেবেন কমান্ডার র্যান্ডি ব্রেসনিক। ইউএস মেরিন কর্পসের এই সদস্য এর আগে দুবার মহাকাশে গেছেন এবং পৃথিবীর বাইরে ১৪৯ দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
পাইলট লুকা পারমিতানো ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী। এই মিশনের তিনি পাইলট হিসেবে কাজ করবেন। ইতালীয় এই নভোচারীও আগে দুবার মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো একটি স্পেসওয়াক, যেখানে তাঁর হেলমেটের ভেতরে হঠাৎ পানি জমতে শুরু করেছিল এবং তিনি মহাকাশে প্রায় ডুবেই যাচ্ছিলেন! ভাগ্যক্রমে সেই যাত্রা বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি।
আর্টেমিস ৩ মিশনের নেতৃত্ব দেবেন কমান্ডার র্যান্ডি ব্রেসনিক। ইউএস মেরিন কর্পসের এই সদস্য এর আগে দুবার মহাকাশে গেছেন এবং পৃথিবীর বাইরে ১৪৯ দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
মিশন স্পেশালিস্ট ফ্র্যাঙ্ক রুবিও একাধারে ইউএস আর্মির সাবেক সদস্য, বোর্ড-সার্টিফাইড ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান এবং ফ্লাইট সার্জন। এর আগে একবার রুশ সয়ুজ ক্যাপসুলে চড়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর সেই মহাকাশযানটি হঠাৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পৃথিবীতে ফেরা আটকে যায়। নতুন একটি যান আসার অপেক্ষায় মহাকাশে টানা ৩৭১ দিন কাটাতে বাধ্য হন তিনি। মার্কিন নভোচারী হিসেবে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি দিন থাকার রেকর্ড তাঁরই দখলে!
মিশন স্পেশালিস্ট আন্দ্রে ডগলাস এই মিশনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মহাকাশে পাড়ি জমাতে যাচ্ছেন। ২০২১ সালে নাসার নভোচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ডগলাস একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এর আগে আর্টেমিস ২ মিশনের ব্যাকআপ ক্রু হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
এখানে জানিয়ে রাখি, আগে আর্টেমিস ৩ মিশনে চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও এখন তা পরিবর্বত করা হয়েছে। এই মিশনটি এখন চাঁদে যাবে না। বরং চাঁদে নামার ভবিষ্যতের মিশনগুলোর জন্য একটি টেস্ট ফ্লাইট হিসেবে কাজ করবে। এর মূল লক্ষ্য, বেসরকারি কোম্পানির তৈরি দুটি লুনার ল্যান্ডারের সঙ্গে নাসার ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের মহাকাশে নিখুঁতভাবে যুক্ত হওয়া। এরপর সব ঠিক থাকলে আর্টেমিস ৪ মিশনে মানুষ আবার চাঁদে অবতরণ করবে।
মিশন স্পেশালিস্ট আন্দ্রে ডগলাস এই মিশনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মহাকাশে পাড়ি জমাতে যাচ্ছেন। ২০২১ সালে নাসার নভোচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ডগলাস একজন ইঞ্জিনিয়ার।
কীভাবে হবে এই মহাকাশ মহড়া
১৯৭২ সালের পর ২০২৮ সালে আবার চাঁদে মানুষ ফেরানোর জন্য নাসা স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিনের মতো বেসরকারি কোম্পানির তৈরি লুনার ল্যান্ডারের ওপর নির্ভর করছে। আর্টেমিস ৩ মিশনটি সেই ল্যান্ডারগুলো নিয়েই পরীক্ষা চালাবে।
নাসার জেরেমি পার্সনস জানান, পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে এই পরীক্ষা চালানোর মূল কারণ হলো, মহাকাশচারীরা চাঁদের বুকে গিয়ে যেসব লাইফ সাপোর্ট ও কন্ট্রোল সিস্টেমের ওপর নির্ভর করবেন, সেগুলো পৃথিবী থেকে চার দিনের দূরত্বে পরীক্ষা করার চেয়ে পৃথিবীর কাছাকাছি রেখে পরীক্ষা করাটা অনেক বেশি নিরাপদ।
মিশনটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে। শুরুতেই ব্লু অরিজিনের ব্লু মুন ল্যান্ডারকে মহাকাশে পাঠানো হবে। এটি নভোচারী ছাড়াই টানা ৯০ দিন কক্ষপথে থাকতে পারে। এরপর ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নাসার শক্তিশালী এসএলএস রকেটের পিঠে চড়ে ওরিয়ন স্পেস ক্যাপসুলে করে মহাকাশে পাড়ি দেবেন এই চার নভোচারী।
কক্ষপথে পৌঁছে নভোচারীরা ওরিয়ন স্পেসক্রাফটটি চালিয়ে ব্লু মুন ল্যান্ডারের কাছে গিয়ে এর সঙ্গে ডকিং করবেন, মানে একটির সঙ্গে অন্যটি জুড়ে দেবেন। টানা দুই দিন ল্যান্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তাঁরা দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করবেন এবং এর লাইফ সাপোর্ট ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করবেন। কাজ শেষে ব্লু মুন থেকে আলাদা হওয়ার পর, স্পেসএক্স তাদের স্টারশিপ ল্যান্ডারটি নিম্ন-কক্ষপথে পাঠাবে। এবার আর্টেমিস ৩ মিশনের নভোচারীরা ওরিয়ন যান নিয়ে সেই স্টারশিপের সঙ্গে যুক্ত হবেন এবং সেখানে প্রায় এক দিন কাটাবেন। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ওরিয়ন ক্যাপসুল এবং এর ক্রুরা ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে আসবেন।
আর্টেমিস ৩ মিশনটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে। শুরুতেই ব্লু অরিজিনের ব্লু মুন ল্যান্ডারকে মহাকাশে পাঠানো হবে। এটি নভোচারী ছাড়াই টানা ৯০ দিন কক্ষপথে থাকতে পারে।
এই মিশনের চ্যালেঞ্জ
নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জ্যারেড আইজ্যাকম্যান চাইছেন, আগামী বছরের শেষ নাগাদ মিশনটি উৎক্ষেপণ করতে। কিন্তু গত মাসে ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশনে ব্লু অরিজিনের লঞ্চিং ফ্যাসিলিটিতে ঘটা একটি দুর্ঘটনা এই টাইমলাইনকে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। উড্ডয়নপূর্ব এক রুটিন পরীক্ষার সময় ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেটটি বিস্ফোরিত হয়ে লঞ্চপ্যাডের ব্যাপক ক্ষতি করে। এই নিউ গ্লেন রকেটেই ব্লু অরিজিনের ল্যান্ডারটি আর্টেমিস ৩ মিশনের জন্য উৎক্ষেপণ করার কথা।
তবে নাসার জেরেমি পার্সনস বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘এই বাধাগুলো আমাদের জন্য শেখার দারুণ সুযোগ। আমরা নিশ্চিত, নিউ গ্লেন রকেটটি আর্টেমিস ৩ মিশনের জন্য ঠিক সময়ে প্রস্তুত হয়ে যাবে।’
অন্যদিকে স্পেসএক্সও তাদের স্টারশিপ ল্যান্ডারের ১২তম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শেষ করে এটি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যদিও কোম্পানিটি এখনো স্টারশিপকে কক্ষপথে পাঠাতে পারেনি।
নাসার জেরেমি পার্সনস বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘এই বাধাগুলো আমাদের জন্য শেখার দারুণ সুযোগ। আমরা নিশ্চিত, নিউ গ্লেন রকেটটি আর্টেমিস ৩ মিশনের জন্য ঠিক সময়ে প্রস্তুত হয়ে যাবে।’
সব মিলিয়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে নাসায়। আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীদের সঙ্গে নিয়ে আর্টেমিস ৩ মিশনের নভোচারীরা এখন জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কমান্ডার র্যান্ডি ব্রেসনিকের মতে, ‘আর্টেমিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন হলো সব সময় এর পরবর্তী মিশন।’
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ ভাগে আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা তাঁদের মিশনের সময় চাঁদ থেকে ঘুরে আসা একটি ব্যাটন আর্টেমিস ৩ মিশনের ক্রুদের হাতে তুলে দেন। আর্টেমিস ২ মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান মুচকি হেসে ব্যাটনটি তুলে দিয়ে বলেন, ‘আমরা এই ব্যাটনটা অনেক দিন নিজেদের কাছে রেখেছি। এবার এটি আপনাদের হাতে তুলে দেওয়ার পালা। এখন থেকে এর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আপনাদের হাতে!’