ফেস আনলক: এক পলকেই কীভাবে মুখ চেনে ক্যামেরা
ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তা আনলক হয়ে যায়। কোনো পাসওয়ার্ড লিখতে হয় না, কোনো বোতামও চাপতে হয় না। মাত্র এক মুহূর্তের জন্য ক্যামেরার দিকে তাকানো, আর ফোন যেন আপনাকে চিনে ফেলে! শুধু ফেস আনলক নয়, ছবি তোলার সময়ও একই ঘটনা ঘটে। ক্যামেরা চালু করলেই মানুষের মুখের চারপাশে ছোট একটি বক্স দেখা যায়। আপনি মাথা একটু এদিক-ওদিক করলেও সেই বক্সটি আপনার মুখের সঙ্গে সঙ্গে নড়তে থাকে। কিন্তু একটি ছোট ক্যামেরা কীভাবে এত দ্রুত বুঝে যায় যে ছবির কোন অংশটি মানুষের মুখ? কীভাবে ক্যামেরা বুঝতে পারে, এই মুখটি ফোনের মালিকের? এর পেছনে কাজ করে কম্পিউটার ভিশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং এবং বিশেষায়িত প্রসেসিং প্রযুক্তি।
মানুষ যখন কোনো ছবি দেখে, তখন আমাদের মস্তিষ্ক খুব সহজেই মানুষের মুখ চিনতে পারে। কিন্তু ক্যামেরা মানুষের মতো কিছু দেখে না। ক্যামেরা প্রথমে চারপাশের আলো বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। এরপর সেই তথ্য অসংখ্য ছোট ছোট পিক্সেল হিসেবে তৈরি হয়। প্রতিটি পিক্সেলের মধ্যে থাকে রং, উজ্জ্বলতা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের তথ্য। অর্থাৎ ক্যামেরার কাছে একটি মানুষের মুখ প্রথমে শুধু অনেকগুলো সংখ্যার সমষ্টি। এই সংখ্যার মধ্যেই মুখের নির্দিষ্ট প্যাটার্ন খুঁজে বের করার কাজটি করে এআই।
ক্যামেরা প্রথমে চারপাশের আলো বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। এরপর সেই তথ্য অসংখ্য ছোট ছোট পিক্সেল হিসেবে তৈরি হয়। প্রতিটি পিক্সেলের মধ্যে থাকে রং, উজ্জ্বলতা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের তথ্য।
এখন আপনার মাথায় একটি প্রশ্ন আসতেই পারে যে এআই কীভাবে বোঝে, আমাদের মুখ কোথায় আছে? একটি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় তাকে মানুষের মুখের প্রচুর ছবি দেখানো হয়। এসব ছবি বিশ্লেষণ করতে করতে মডেলটি মুখের বিভিন্ন সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ধরন শিখে নেয়। যেমন চোখের অবস্থান, নাকের গঠন, চোয়ালের রেখা এবং মুখের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সম্পর্ক। তবে এআই শুধু দুটি চোখ, একটি নাক ও একটি মুখ খুঁজেই মুখ শনাক্ত করে না। আধুনিক এআই অনেক বেশি জটিল গাণিতিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারে। এই কাজের পেছনে থাকে নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং ডিপ লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তি। ফলে ক্যামেরার সামনে কেউ দাঁড়ালে এআই খুব দ্রুত হিসাব করে বলতে পারে, ছবির এই অংশে একটি মুখ থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি।
স্মার্টফোনের ক্যামেরায় আমাদের চেহারা সাধারণত দুটি কাজে লাগে—ফেস ডিটেকশন ও ফেস রিকগনিশন। এই দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
ফেস ডিটেকশন হলো ছবির মধ্যে কোথায় মানুষের মুখ আছে, তা শনাক্ত করা। যেমন আপনি ক্যামেরা চালু করলেন এবং স্ক্রিনে তিনজন মানুষের মুখের চারপাশে তিনটি বক্স দেখা গেল। এটি ফেস ডিটেকশন।
একটি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় তাকে মানুষের মুখের প্রচুর ছবি দেখানো হয়। এসব ছবি বিশ্লেষণ করতে করতে মডেলটি মুখের বিভিন্ন সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ধরন শিখে নেয়।
অন্যদিকে ফেস রিকগনিশন বা আরও নির্দিষ্টভাবে বললে ফেস ভেরিফিকেশন হলো, একটি মুখ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মেলে কি না, তা যাচাই করা। অর্থাৎ ডিটেকশন বলছে, এখানে একটি মুখ আছে। আর রিকগনিশন বা ভেরিফিকেশন বলছে, এই মুখটি অনুমোদিত ব্যক্তির মুখ কি না।
আমরা দৈনন্দিন ফোন আনলক করার জন্য যে ফেস আনলক ব্যবহার করি, এখানেই প্রযুক্তিটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আপনি যখন প্রথমবার ফেস আনলক সেটআপ করেন, ফোন আপনার মুখের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একটি ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করে। পরে ফোনের দিকে তাকালে ক্যামেরা আপনার মুখের নতুন তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেটিকে আগে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে।
এটি সাধারণত ছবির সঙ্গে ছবির সরাসরি কোনো তুলনা নয়; বরং মুখের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে গাণিতিকভাবে উপস্থাপন করে তাদের মধ্যে মিল খোঁজা হয়। সিস্টেম যদি মনে করে নতুন মুখটি অনুমোদিত মুখের সঙ্গে যথেষ্ট মিলে যাচ্ছে, তাহলে ফোন আনলক হয়ে যায়।
অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা এ রকম—ক্যামেরা থেকে মুখ শনাক্ত, এরপর মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ, সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে যাচাই এবং মিল পাওয়া গেলে ফোন আনলক হয়। এই পুরো কাজটি এত দ্রুত ঘটে যে আমাদের মনে হয়, ফোন যেন শুধু একঝলক তাকিয়েই আমাদের চিনে ফেলেছে!
ফেস রিকগনিশন বা আরও নির্দিষ্টভাবে বললে ফেস ভেরিফিকেশন হলো, একটি মুখ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মেলে কি না, তা যাচাই করা। অর্থাৎ ডিটেকশন বলছে, এখানে একটি মুখ আছে।
আরও একটি মজার প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে। আপনার যদি যমজ ভাই বা বোন থাকে, তাহলে কি সে আপনার ফেস আনলক দিয়ে ফোন খুলতে পারবে? এর উত্তর নির্ভর করে ফোনে ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর। কিছু সাধারণ দ্বিমাত্রিক ক্যামেরার ফেস আনলক মুখের সামনের ছবি ও বৈশিষ্ট্যের ওপর বেশি নির্ভর করে। যমজদের মুখের গঠন অনেক কাছাকাছি হওয়ায় এমন সিস্টেমের পক্ষে তাঁদের আলাদা করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
তাই অনেক সময় যমজ ভাই বা বোন নিজের চেহারা দিয়ে অন্যের ফোন আনলক করে ফেলতে পারে। অন্যদিকে উন্নত ফেস আনলক ব্যবস্থায় ডেপথ সেন্সিং, ইনফ্রারেড বা থ্রি-ডি ফেস ম্যাপিং ব্যবহার করা হয়। এগুলো শুধু মুখের দ্বিমাত্রিক ছবি নয়, মুখের ত্রিমাত্রিক গঠন ও গভীরতার তথ্যও বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে যমজদের আলাদা করার ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়। তবে কোনো ফেস আনলক ব্যবস্থাকেই একেবারে ১০০ ভাগ নিখুঁত ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
উন্নত ফেস আনলক ব্যবস্থায় ডেপথ সেন্সিং, ইনফ্রারেড বা থ্রি-ডি ফেস ম্যাপিং ব্যবহার করা হয়। এগুলো শুধু মুখের দ্বিমাত্রিক ছবি নয়, মুখের ত্রিমাত্রিক গঠন ও গভীরতার তথ্যও বিশ্লেষণ করতে পারে।
মাথা নাড়ালেও ক্যামেরা মুখ অনুসরণ করে কীভাবে
ক্যামেরা শুধু একবার মুখ খুঁজে পেয়েই থেমে যায় না। ভিডিও বা লাইভ ক্যামেরা ব্যবহারের সময় প্রতি মুহূর্তে নতুন ফ্রেম বা ছবি তৈরি হয়। প্রথম ফ্রেমে এআই আপনার মুখের অবস্থান শনাক্ত করার পর পরবর্তী ফ্রেমগুলোতে সেই তথ্য ব্যবহার করে মুখটি কোথায় যেতে পারে, তা দ্রুত অনুমান করতে পারে। ফলে প্রতিটি ফ্রেমে শূন্য থেকে পুরো ছবির মধ্যে মুখ খোঁজার প্রয়োজন হয় না। এ কারণেই আপনি মাথা একটু ঘোরালেও বা নড়াচড়া করলেও ক্যামেরার ফেস-ট্র্যাকিং বক্সটি আপনার মুখের সঙ্গে সঙ্গেই চলতে থাকে।
মুখের কোন অংশগুলো দেখে এআই
অনেক আধুনিক সিস্টেম মুখের বিভিন্ন ফেসিয়াল ল্যান্ডমার্ক শনাক্ত করতে পারে। চোখ, নাক, ঠোঁট, চোয়াল এবং মুখের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিন্দুর অবস্থান বিশ্লেষণ করে এআই মুখের গঠন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। এর সাহায্যে ক্যামেরা বুঝতে পারে মুখটি সোজা আছে, কিছুটা ঘোরানো হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কোণে রয়েছে। এই প্রযুক্তি শুধু ফেস আনলকের জন্যই নয়; বরং ছবি তোলার সময় অটোফোকাস, এক্সপোজার, পোর্ট্রেট মোড এবং ক্যামেরার বিভিন্ন ইফেক্টের কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্যামেরা এত দ্রুত কাজ করে কীভাবে
এখানে শুধু এআই সফটওয়্যারই নয়, মোবাইলের হার্ডওয়্যারও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক স্মার্টফোনের প্রসেসরে এআইভিত্তিক কাজ দ্রুত করার জন্য বিশেষ হার্ডওয়্যার অ্যাকসিলারেটর থাকতে পারে, যাকে এনপিইউ বা নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট বলা হয়। এগুলো নির্দিষ্ট ধরনের মেশিন লার্নিংয়ের হিসাব-নিকাশ খুব দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ফলে ফোনে প্রতিবার বিশাল পরিমাণ তথ্য সাধারণ প্রসেসরের মাধ্যমে ধীরগতিতে বিশ্লেষণ করতে হয় না।
আধুনিক স্মার্টফোনের প্রসেসরে এআইভিত্তিক কাজ দ্রুত করার জন্য বিশেষ হার্ডওয়্যার অ্যাকসিলারেটর থাকতে পারে, যাকে এনপিইউ বা নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট বলা হয়।
সব ফেস আনলক কি সমান নিরাপদ
এর উত্তর, না। সব ফোন একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে না। কিছু ডিভাইস মূলত সামনের ক্যামেরা ও সফটওয়্যারভিত্তিক পদ্ধতিতে মুখ যাচাই করে। আবার কিছু উন্নত সিস্টেম মুখের গভীরতা বা ইনফ্রারেডভিত্তিক তথ্যও ব্যবহার করতে পারে। ফলে বিভিন্ন ডিভাইসের ফেস আনলকের নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা এক হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রাইভেসিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মুখ মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয়ের তথ্য। তাই কোনো ডিভাইস কীভাবে মুখের তথ্য ব্যবহার ও সংরক্ষণ করে, সেটিও বিবেচনা করা উচিত।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা যখন ফোনের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রায় কিছুই বুঝতে পারি না। আলো থেকে পিক্সেল তৈরি হচ্ছে, পিক্সেল থেকে এআই প্যাটার্ন খুঁজে বের করছে, মুখ শনাক্ত হচ্ছে, মুখের ভঙ্গি বিশ্লেষণ করছে, প্রয়োজন হলে ফেস ভেরিফিকেশন হচ্ছে এবং সবশেষে ফোনের স্ক্রিন খুলে যাচ্ছে! অর্থাৎ আমাদের কাছে ফেস আনলক হয়তো কেবল একঝলক তাকানো। কিন্তু সেই একঝলকের আড়ালে চলছে ক্যামেরা, গণিত, কম্পিউটার ভিশন, মেশিন লার্নিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অসাধারণ এক সমন্বয়।