মারা গেলেন জিপিএসের পথিকৃৎ গণিতবিদ গ্ল্যাডিস ওয়েস্ট
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এখন পথ চলতে জিপিএস ব্যবহার করে। উবার ডাকা থেকে শুরু করে অচেনা শহরে পথ খুঁজে পাওয়া এখন অনেক সহজ গুগল ম্যাপের কল্যাণে। জিপিএস ছাড়া যেন আমাদের চলেই না। অথচ এই জিপিএস প্রযুক্তি যাঁর গণিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তিনি নিজে ব্যবহার করতেন কাগজের ম্যাপ! বলছি গ্ল্যাডিস ওয়েস্টের কথা। গত ১৭ জানুয়ারি ৯৫ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন এই গণিতবিদ। পরিবারের সদস্যদের পাশে রেখে শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি।
জিপিএস প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ গ্ল্যাডিস ওয়েস্ট বলতেন, ‘আমি ম্যাপই বেশি পছন্দ করি। প্রযুক্তির চেয়ে আমার নিজের হাতের ওপর ভরসা বেশি।’
১৯৩০ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বর্ণবাদের কালো ছায়া তখনো সমাজকে গ্রাস করে আছে। ছোট্ট গ্ল্যাডিস মে ব্রাউন বড় হচ্ছিলেন এক ছোট খামারে। এক কামরার স্কুলঘরে পড়াশোনা। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। তিনি জানতেন, এই খামারের হাড়ভাঙা খাটুনি থেকে মুক্তির একটাই পথ—শিক্ষা।
হাইস্কুলে পড়ার সময় শিক্ষকরা তাঁকে গণিত নিয়ে পড়ার পরামর্শ দেন। যদিও গ্ল্যাডিস প্রথমে ভেবেছিলেন হোম ইকোনমিক্স পড়বেন, কিন্তু জ্যামিতির প্রেমে পড়ে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। ক্লাসের সেরা ছাত্রী হয়ে স্কলারশিপ বাগিয়ে নেন এবং ভর্তি হন ভার্জিনিয়া স্টেট কলেজে (বর্তমান ভার্জিনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি)।
জিপিএস প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ গ্ল্যাডিস ওয়েস্ট বলতেন, ‘আমি ম্যাপই বেশি পছন্দ করি। প্রযুক্তির চেয়ে আমার নিজের হাতের ওপর ভরসা বেশি।’
১৯৫৬ সালে তিনি যোগ দেন ভার্জিনিয়ার ডালগ্রেনের নেভাল প্রুভিং গ্রাউন্ডে। সেখানে তখন কৃষ্ণাঙ্গ পেশাজীবী ছিলেন হাতে গোনা মাত্র চারজন! তাঁদেরই একজন, গণিতবিদ ইরা ওয়েস্টের সঙ্গে পরে তাঁর বিয়ে হয়। বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের সেই যুগে গ্ল্যাডিস শুধু নিজের কাজটাই করে যাননি, হয়ে উঠেছিলেন সেরাদের সেরা।
গ্ল্যাডিসের কাজ মোটেও সহজ ছিল না। আজকের মতো তখন হাতের মুঠোয় শক্তিশালী কম্পিউটার ছিল না। তাঁকে কাজ করতে হতো বিশাল সব সুপারকম্পিউটার নিয়ে, যা চালাতে রীতিমতো ঘাম ছুটে যেত।
১৯৬০-এর দশকে তিনি নেপচুনের সাপেক্ষে প্লুটোর গতিপথ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেই গবেষণা তাঁকে পুরস্কার এনে দেয়। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান আসে ৭০ ও ৮০-র দশকে। পৃথিবী তো আর নিখুঁত গোলক নয়; কোথাও পাহাড়, কোথাও সমুদ্র, আবার কোথাও মাটির ঘনত্ব কম-বেশি। ফলে অভিকর্ষ বলও সব জায়গায় সমান নয়।
গ্ল্যাডিস আইবিএম ৭০৩০ কম্পিউটার ব্যবহার করে পৃথিবীর আকৃতির এক অত্যন্ত নিখুঁত গাণিতিক মডেল তৈরি করেন। তিনি এমন সব জটিল অ্যালগরিদম লিখেছিলেন, যা পৃথিবীর অভিকর্ষ, জোয়ার-ভাটা এবং অন্যান্য শক্তির প্রভাব হিসাব করে স্যাটেলাইটের সঠিক অবস্থান বের করতে পারত।
সোজা কথায়, তাঁর তৈরি করা এই জিওড মডেল বা পৃথিবীর গাণিতিক নকশা না থাকলে জিপিএস স্যাটেলাইটগুলো সঠিক জায়গায় বসানো যেত না। আপনি হয়তো ডানে যেতে চাইতেন, আর জিপিএস আপনাকে পাঠাত বাঁয়ে!
১৯৬০-এর দশকে গ্ল্যাডিস নেপচুনের সাপেক্ষে প্লুটোর গতিপথ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেই গবেষণা তাঁকে পুরস্কার এনে দেয়। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান আসে ৭০ ও ৮০-র দশকে।
দীর্ঘ সময় তাঁর এই অবদান আড়ালেই ছিল। অনেকটা হিডেন ফিগারস মুভির সেই নারীদের মতো, যাঁরা পর্দার আড়ালে থেকে বিজ্ঞানের চাকা ঘুরিয়েছেন। তবে শেষ বয়সে তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মান পেয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি যুক্ত হন মার্কিন বিমান বাহিনীর স্পেস অ্যান্ড মিসাইল পাইওনিয়ার্স হল অব ফেম সম্মানে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং তাঁকে পুরস্কৃত করে প্রিন্স ফিলিপ মেডেল দিয়ে।
তরুণদের উদ্দেশে এই কিংবদন্তি বলে গেছেন, ‘হাল ছেড়ে নিজেকে চাপের মধ্যে ফেলা খুব সহজ। কিন্তু তোমার যা আছে, তা নিয়েই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করো।’
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তৃপ্ত গ্ল্যাডিস হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘আমি সন্তুষ্ট। কারণ, আমি জানি আমি নিজেকে এবং আমার মেধাকে পুরোপুরি উজাড় করে দিতে পেরেছি।’
তাঁর সেই উজাড় করে দেওয়া মেধার সুফল আজ ভোগ করছে পুরো বিশ্ব। ম্যাপ হাতে নেওয়া সেই বৃদ্ধা হয়তো চলে গেলেন, কিন্তু আমাদের প্রতিটি ডিজিটাল ম্যাপে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।