র‍্যাম কী, ডিভাইসে কেন র‍্যাম থাকে

কম্পিউটারে র‍্যামের ভূমিকাটা আসলে কেমন?ছবি: আইসি কম্পোনেন্টস

কম্পিউটারের যাবতীয় যন্ত্রপাতির মধ্যে র‍্যাম দেখতে বেশ ছোটখাটো, বলতে গেলে পকেট সাইজের চিরুনির সমান! মাদারবোর্ডে প্রসেসরের একেবারে পাশেই এর অবস্থান। আকারে ছোট হলেও কাজের বেলায় একে প্রসেসরের ‘ডান হাত’ বলা চলে। একটি কম্পিউটার যে কয়েকটি যন্ত্রাংশ ছাড়া কোনোভাবেই চলতে পারে না, তার মধ্যে র‍্যামের নাম থাকবে একেবারে শুরুর দিকে। কিন্তু কম্পিউটারে র‍্যামের ভূমিকাটা আসলে কেমন? চলুন, খুব সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি।

লাইব্রেরিতে তো নিশ্চয়ই গিয়েছেন। বিশাল সব তাকে থরে থরে সাজানো থাকে হাজারো বই। ধরা যাক, ক্যাটালগ ঘেঁটে আপনি প্রয়োজনীয় কয়েকটি বই খুঁজে বের করলেন। এখন, এসব বই থেকে আসল তথ্যটা বের করে আনতে প্রথমেই আপনার কী লাগবে? একটা পড়ার টেবিল। আপনি নিশ্চয়ই একটি বইয়ের একটুখানি পড়ে সেটি আবার তাকে রেখে এসে অন্য একটি বই হাতে নেবেন না! বরং বইয়ের সংখ্যা বেশি হলে বড়সড় একটা টেবিল খুঁজবেন, যাতে সব বই সামনে ছড়িয়ে রেখে দরকারি তথ্যটা খুব দ্রুত ও কার্যকরভাবে বের করে আনা যায়।

আরও পড়ুন
র‍্যাম থেকে প্রসেসর চাইলেই যেকোনো মেমোরি সেলের ডেটা পড়তে বা লিখতে পারে। পুরোনো দিনের ক্যাসেট ফিতার মতো এতে ডেটা ক্রমান্বয়ে খুঁজতে হয় না।

কম্পিউটারের কাজের ধরনও ঠিক একই রকম। এখানে পাঠকের মস্তিষ্ককে আমরা কম্পিউটারের প্রসেসর, পড়ার টেবিলকে র‍্যাম এবং বইয়ের তাক বা বুকশেলফকে হার্ডড্রাইভের সঙ্গে তুলনা করতে পারি।

র‍্যামের পূর্ণরূপ র‍্যানডম অ্যাকসেস মেমোরি। সহজ কথায়, এটি হলো আপনার কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি। আপনি যখন কোনো অ্যাপ চালু করেন, প্রসেসর তখন হার্ডড্রাইভ থেকে ডেটা এনে এই ডিজিটাল র‍্যামে সাময়িকভাবে জমা করে।

সবই বোঝা গেল। কিন্তু নাম র‍্যানডম কেন? কারণ, এখান থেকে প্রসেসর চাইলেই যেকোনো মেমোরি সেলের ডেটা পড়তে বা লিখতে পারে। পুরোনো দিনের ক্যাসেট ফিতার মতো (যেখানে একটা গান শুনতে হলে আগেরগুলো সিরিয়ালি পার হয়ে যেতে হতো) এতে ডেটা ক্রমান্বয়ে খুঁজতে হয় না।

আরও পড়ুন
র‍্যাম হলো আপনার কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি। আপনি যখন কোনো অ্যাপ চালু করেন, প্রসেসর তখন হার্ডড্রাইভ থেকে ডেটা এনে এই ডিজিটাল র‍্যামে সাময়িকভাবে জমা করে।

ভেতরের বিজ্ঞানটা কেমন

সবচেয়ে সাধারণ র‍্যাম, যাকে ডায়নামিক র‍্যাম বা DRAM বলা হয়, তার ভেতরের গঠন বেশ চমকপ্রদ। এর প্রতিটি মেমোরি সেল একটি ট্রানজিস্টর ও একটি ক্যাপাসিটর দিয়ে তৈরি। এই ক্যাপাসিটরকে ছোট্ট একটা বালতির সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা ইলেকট্রন ধরে রাখে। বালতি ভরা থাকলে তা বোঝায় ‘1’, আর খালি থাকলে ‘0’।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই বালতি একটু ছিদ্রযুক্ত! মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই ইলেকট্রন লিক করে বালতি খালি হয়ে যায়। এ জন্যই মেমোরি কন্ট্রোলারকে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার বার এই বালতিগুলো রিফ্রেশ করতে হয়, যাতে ভুলে না যায় সে কী ধরে রেখেছিল। ক্রমাগত রিফ্রেশ করার এই প্রয়োজনের কারণেই এর নাম ডায়নামিক বা পরিবর্তনশীল র‍্যাম।

আরও পড়ুন
র‍্যামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ধারণক্ষমতা ও গতি। র‍্যামের ধারণক্ষমতা যত বেশি হবে, কাজের টেবিল তত বড় হবে; অর্থাৎ আপনি একসঙ্গে তত বেশি প্রোগ্রাম চালু রাখতে পারবেন।

ডিভাইসে কেন র‍্যাম থাকতেই হয়

আপনার ফোনের প্রসেসর যদি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালীও হয়, তবু র‍্যাম ছাড়া সেটি কচ্ছপের মতো ধীরগতির মনে হবে। কেন?

ধরুন, আপনি ফেসবুকে স্ক্রল করছেন, হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এল। আপনি হোয়াটসঅ্যাপে গেলেন। র‍্যাম না থাকলে ফেসবুক থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাপটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেত। এরপর যখন আবার ফেসবুকে ফিরতেন, তখন অ্যাপটিকে মূল স্টোরেজ থেকে একদম নতুন করে আবার লোড হতে হতো, যা বেশ সময়সাপেক্ষ। এক অ্যাপ থেকে আরেক অ্যাপে দ্রুত যাওয়া এবং আগের জায়গায় ফিরে পাওয়া—একে আমরা মাল্টিটাস্কিং বলি। এটি র‍্যামের কারণেই সম্ভব হয়। র‍্যাম অ্যাপগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু রাখে।

র‍্যামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ধারণক্ষমতা ও গতি। র‍্যামের ধারণক্ষমতা যত বেশি হবে, কাজের ‘টেবিল’ তত বড় হবে; অর্থাৎ আপনি একসঙ্গে তত বেশি প্রোগ্রাম চালু রাখতে পারবেন। আর যদি র‍্যাম কম থাকে? তখন কম্পিউটার বাধ্য হয়ে হার্ডড্রাইভের কিছুটা অংশকে ভার্চ্যুয়াল মেমোরি হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু হার্ডড্রাইভ র‍্যামের তুলনায় মারাত্মক ধীরগতির হওয়ায় তখন কম্পিউটার স্লো হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
এক অ্যাপ থেকে আরেক অ্যাপে দ্রুত যাওয়া এবং আগের জায়গায় ফিরে পাওয়া—একে আমরা মাল্টিটাস্কিং বলি। এটি র‍্যামের কারণেই সম্ভব হয়। র‍্যাম অ্যাপগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু রাখে।

শুধু ধারণক্ষমতাই নয়, র‍্যামের গতিও পারফরম্যান্সে বিরাট প্রভাব ফেলে। র‍্যামের গতি মাপা হয় মেগাহার্টজ এককে। মেগাহার্টজ মানে সেকেন্ডে মিলিয়ন সাইকেল। আপনার র‍্যামের গায়ে যদি DDR4-3200MHz লেখা থাকে, এর মানে হলো এটি প্রতি সেকেন্ডে ৩২০ কোটি বার ডেটা আদান-প্রদান করতে পারে! একে আপনি ডেটা চলাচলের বিশাল এক হাইওয়ের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন, যেখানে হাইওয়ে যত চওড়া, গাড়ি তত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছায়। আবার DDR বা ডাবল ডেটা রেট প্রযুক্তির মানে, এটি ঘড়ির কাঁটার ওঠানামা, উভয় সময়েই ডেটা ট্রান্সফার করে, যা গতিকে দ্বিগুণ করে দেয়।

সংক্ষেপে, র‍্যাম সেই নিরলস কর্মী, যা আপনার ডিভাইসের ধীরগতির স্টোরেজ ও সুপার ফাস্ট প্রসেসরের মাঝখানে সেতুবন্ধ তৈরি করে। এটি ছাড়া আমাদের আধুনিক স্মার্টফোন বা কম্পিউটার নিছকই এক অলস বাক্সে পরিণত হতো!

লেখক: সফটওয়্যার ডেভেলপার, নেক্সালাইজ

সূত্র: ডেল ডটকম, হাউ স্টাফ ওয়ার্কস, বিজনেস ইনসাইডার, ইটসাইজার

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন