হাড় জোড়া লাগানো যাবে গ্লু গানের সাহায্যে

ভাঙা হাড় জোড়া দেবে গ্লু গান!ছবি: সোপোনে নাউট / অ্যালামি

স্কুল প্রজেক্ট বা ক্র্যাফটের ক্লাসে আমরা অনেকেই গ্লু গানের ব্যবহার দেখেছি। প্লাগ ইন করে পেছনের ট্রিগার চাপলে সামনের সরু মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে গরম তরল আঠা। নিমিষেই কার্ডবোর্ড, প্লাস্টিক বা ভাঙা খেলনা জোড়া লেগে যায়। কিন্তু অপারেশন থিয়েটারে একজন সার্জন যদি গ্লু গান হাতে দাঁড়ান?

দৃশ্যটা নিশ্চয়ই সুবিধের মনে হচ্ছে না! কিন্তু নিউ সায়েন্টিস্ট এবং অন্যান্য বিজ্ঞান সাময়িকীর সাম্প্রতিক খবর বলছে, এই দৃশ্যটিই হয়তো হতে যাচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আগামী দিনের বাস্তবতা। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকিউঙ্কওয়ান ইউনিভার্সিটির গবেষক জং সেউং লি এবং তাঁর দল এমনই এক অদ্ভুত কাণ্ড করে দেখিয়েছেন।

আমাদের হাড়ের ছোটখাটো চিড় বা ফাটল শরীর নিজেই সারিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বড় কোনো দুর্ঘটনা বা টিউমার অপারেশনের ফলে হাড়ে বড় গর্ত তৈরি হলে তা এমনি এমনি সারে না। সেই ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করার জন্য দরকার কোনো কৃত্রিম প্লাগ। আরেকটা সমাধান হলো থ্রি-ডি প্রিন্টার ব্যবহার করা। কিন্তু সেটা অনেক সময়সাপেক্ষ। স্ক্যান করে মাপমতো মিলিয়ে তারপর প্রিন্ট করতে হয়। সব মিলিয়ে অন্তত এক সপ্তাহ লেগে যায়। আগে থেকে প্ল্যান করা অপারেশনের জন্য এটা ঠিক আছে, কিন্তু ইমার্জেন্সি সার্জারিতে অত সময় কোথায়?

আরও পড়ুন
বড় কোনো দুর্ঘটনা বা টিউমার অপারেশনের ফলে হাড়ে বড় গর্ত তৈরি হলে তা এমনি এমনি সারে না। সেই ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করার জন্য দরকার কোনো কৃত্রিম প্লাগ।

এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্যই জং সেউং লির এই আবিষ্কার। তাঁরা সাধারণ গ্লু গানকে একটু পরিবর্তন করেছেন। সাধারণত গ্লু গান ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় কাজ করে। কিন্তু তাঁরা এর তাপমাত্রা কমিয়ে এনেছেন ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে, যাতে শরীরের কোনো ক্ষতি না হয়।

আর এই বন্দুকের ভেতরে যে ফিলামেন্ট ব্যবহার করা হয়, সেটাও সাধারণ প্লাস্টিক নয়। তাঁরা তৈরি করেছেন এক বিশেষ বায়োলজিক্যাল গ্লু বা জৈবিক আঠা।

এই আঠার উপাদান দুটি। হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট ও পলিক্যাপ্রোল্যাকটোন। আমাদের স্বাভাবিক হাড়ের ৫০ শতাংশই হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট দিয়ে তৈরি। আর পলিক্যাপ্রোল্যাকটোন হলো একধরনের বায়োডিগ্রেডেবল থার্মোপ্লাস্টিক। সার্জনরা এই গ্লু গান ব্যবহার করে অপারেশনের সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাড়ের গর্ত ভরাট করে ফেলতে পারেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের কোষগুলো ওই ফাঁকা জায়গা পূরণ করে হাড়কে পুরোপুরি সারিয়ে তোলে।

গবেষক লি বলেন, ‘এটা মূলত বাজারে পাওয়া সাধারণ গ্লু গান দিয়েই তৈরি। এতে আমাদের সময় এবং খরচ উভয়ই বাঁচে।’

গবেষকেরা খরগোশের পায়ের হাড়ের এক সেন্টিমিটার লম্বা গর্ত ভরাট করে এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করেছেন। ১২ সপ্তাহ পর দেখা গেছে, আঠা ও হাড়ের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই এবং কোনো মেডিকেল সমস্যাও হয়নি। এমনকি প্রচলিত বোন সিমেন্ট দিয়ে চিকিৎসা করা প্রাণীদের তুলনায় গ্লু গান দিয়ে চিকিৎসা করা প্রাণীদের হাড়ের ঘনত্ব ছিল দ্বিগুণেরও বেশি!

আরও পড়ুন
পলিক্যাপ্রোল্যাকটোন হলো একধরনের বায়োডিগ্রেডেবল থার্মোপ্লাস্টিক। সার্জনরা এই গ্লু গান ব্যবহার করে অপারেশনের সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাড়ের গর্ত ভরাট করে ফেলতে পারেন।

শুধু তাই নয়, সংক্রমণ ঠেকাতে তাঁরা এই আঠার মধ্যে ভ্যানকোমাইসিন এবং জেন্টামাইসিন নামে দুটি অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ওষুধ মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। এই ওষুধগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে ওই জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং জীবাণু ধ্বংস করে।

সবাই যে এখনই এই প্রযুক্তি লুফে নিচ্ছেন, তা নয়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের গবেষক বেঞ্জামিন অলিভিয়ের কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কনসেপ্টটা কি ইন্টারেস্টিং? হ্যাঁ। এটা কি কাজ করতে পারে? হ্যাঁ। এটা কি যুক্তিসংগত? হ্যাঁ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটাই যে মূল সমাধান হবে, তা হয়তো নয়।’

তাঁর মতে, থ্রি-ডি প্রিন্টিং ও স্ক্যানিং প্রযুক্তি হয়তো ভবিষ্যতে আরও দ্রুতগতির হয়ে যাবে এবং গ্লু গানের জায়গা দখল করে নেবে। তবুও, ইমার্জেন্সি অপারেশনে পকেট থেকে একটা গ্লু গান বের করে হাড় জোড়া লাগানোর আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ নয়!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

আরও পড়ুন