বিশ্বের প্রথম হাইড্রোজেন চালিত যাত্রীবাহী বিমান তৈরি করছে এয়ারবাস
আকাশে ডানা মেলার স্বপ্ন মানুষ বহু আগেই পূরণ করেছে। কিন্তু মানুষের এই স্বপ্নের এক ভয়ংকর মূল্য প্রতিনিয়ত চোকাচ্ছে পৃথিবী। আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থার অন্যতম বড় একটি অংশ জুড়ে আছে বিমান চলাচল খাত। আপনি কি জানেন, প্রতি বছর হাজার হাজার যাত্রীবাহী বিমান বায়ুমণ্ডলে কী পরিমাণ বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও ক্ষতিকর ধোঁয়াটে মেঘ ছড়িয়ে দিচ্ছে? বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারিগর এই সাধারণ জেট ইঞ্জিনগুলো। তবে এবার হয়তো সেই দূষণের দিন শেষ হতে চলেছে। বিমানের ইঞ্জিন থেকে বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার বদলে বের হবে শুধু বিশুদ্ধ জলীয় বাষ্প। এমনই এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস।
বৈদ্যুতিক হাইড্রোজেন-চালিত উড়োজাহাজ একসময় প্রযুক্তিবিদদের কাছে ছিল কেবলই একটি ব্যয়বহুল আকাশকুসুম কল্পনা। অনেকেই ভাবতেন, এটি হয়তো কখনোই বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি প্রমাণ করেছে, এই অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতেই এয়ারবাস এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে। তারা জার্মানির বিখ্যাত ইঞ্জিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমটিইউ অ্যারো ইঞ্জিনসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
তাদের লক্ষ্য একটাই, বিশ্বের প্রথম এমন একটি উড়োজাহাজের ইঞ্জিন তৈরি করা, যা শতভাগ ইলেকট্রিক হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের মাধ্যমে চলবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষঙ্গিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে ২০২৭ সালের মধ্যেই এই দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত নতুন জয়েন্ট কোম্পানি তাদের কাজ পুরোদমে শুরু করবে।
বৈদ্যুতিক হাইড্রোজেন-চালিত উড়োজাহাজ একসময় প্রযুক্তিবিদদের কাছে ছিল কেবলই একটি ব্যয়বহুল আকাশকুসুম কল্পনা। অনেকেই ভাবতেন, এটি হয়তো কখনোই বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে না।
কীভাবে কাজ করবে এই ইঞ্জিন
সাধারণ বিমানের ইঞ্জিনে আমরা যে জীবাশ্ম জ্বালানি ফুয়েল ব্যবহার করি, তা বাতাসের অক্সিজেনের উপস্থিতিতে তীব্রভাবে পোড়ানো হয়। ফলে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড ধাক্কা বা থ্রাস্ট বিমানকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়। কিন্তু হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের কাজ করার পদ্ধতিটা একেবারেই ভিন্ন এবং শতভাগ পরিবেশবান্ধব।
এই ইঞ্জিনে মূল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে হালকা ওজনের তরল হাইড্রোজেন। ফুয়েল সেলের ভেতরে এই হাইড্রোজেন এবং বাতাসের অক্সিজেনের মধ্যে একটি তড়িৎ-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হবে। এই বিক্রিয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎশক্তি উৎপন্ন হবে, যা সরাসরি বড় বড় লিথিয়াম ব্যাটারিগুলোকে চার্জ করবে। সেই ব্যাটারির সঞ্চিত শক্তিতেই চলবে বিমানের বিশাল মোটরগুলো।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বিক্রিয়ার পর বর্জ্য হিসেবে তৈরি হবে শুধুই বিশুদ্ধ জলীয় বাষ্প! অর্থাৎ, যে ইঞ্জিন একসময় কার্বন ডাই-অক্সাইড বা নাইট্রোজেন অক্সাইড উগড়ে দিত, সেটি আকাশে মেঘের মতো জলীয় বাষ্প ছড়িয়ে এগিয়ে যাবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সালফার অক্সাইড তৈরির সামান্যতম কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো আরও নিখুঁত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্টেফান ওয়েবার জানান, তাদের মূল লক্ষ্য এমন একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী প্রোপালশন সিস্টেম তৈরি করা, যা বিমান চলাচল খাতকে পুরোপুরি জলবায়ু-নিরপেক্ষ করে তুলবে।
বর্তমানে অনেক এভিয়েশন কোম্পানি পরিবেশ দূষণ কমাতে টেকসই জ্বালানি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এয়ারবাসের মতে, সেটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা চূড়ান্ত সমাধান নয়। কারণ এসব বিকল্প জ্বালানি পোড়ালেও পরিবেশে কিছুটা হলেও ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়। অন্যদিকে তরল হাইড্রোজেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি শক্তির দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও ওজনে খুবই হালকা। এটি কার্বন এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমনকে পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সক্ষম।
এয়ারবাসের এই মহাযজ্ঞের শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে, যখন তারা প্রথমবার তাদের ‘জিরো-ই’ প্রজেক্টের ঘোষণা দেয়। গত বছর প্যারিস এয়ার শোতে এমটিইউর সঙ্গে তাদের যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, বর্তমান চুক্তিটি তারই একটি চূড়ান্ত রূপ। এমটিইউ অ্যারো ইঞ্জিনসের ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি বিষয়ক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেফান ওয়েবার এই প্রজেক্ট সম্পর্কে বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানান, তাদের মূল লক্ষ্য এমন একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী প্রোপালশন সিস্টেম তৈরি করা, যা বিমান চলাচল খাতকে পুরোপুরি জলবায়ু-নিরপেক্ষ করে তুলবে।
হাইড্রোজেন গ্যাসকে তরল অবস্থায় বিমানে সংরক্ষণ করতে হলে একে শূন্যের নিচে প্রায় ২৫৩°C তাপমাত্রায় রাখতে হয়। সাধারণ জেট ফুয়েলের চেয়ে তরল হাইড্রোজেন বেশি জায়গা দখল করে।
বাস্তবায়নের পেছনের কঠিন চ্যালেঞ্জ
হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের ধারণাটি চমৎকার হলেও, একে বিশাল আকারের যাত্রীবাহী বিমানে ব্যবহার করাটা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ। এর সবচেয়ে বড় কারণ, হাইড্রোজেনের নিজস্ব প্রকৃতি। হাইড্রোজেন গ্যাসকে তরল অবস্থায় বিমানে সংরক্ষণ করতে হলে একে শূন্যের নিচে প্রায় ২৫৩°C তাপমাত্রায় রাখতে হয়। সাধারণ জেট ফুয়েলের চেয়ে তরল হাইড্রোজেন অনেক বেশি জায়গা দখল করে। ফলে বর্তমান গতানুগতিক বিমানগুলোর নকশা দিয়ে আর কাজ হবে না; বিশাল হাইড্রোজেন ট্যাংক বসানোর জন্য বিমানের ভেতরকার নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
সব কিছু যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে এয়ারবাস এবং এমটিইউর আশা, ২০৩৫ সালের মধ্যেই তাদের এই নতুন প্রজন্মের যাত্রীবাহী হাইড্রোজেন বিমান বাণিজ্যিকভাবে আকাশে ডানা মেলবে। একই সঙ্গে তারা শুধু ইঞ্জিন তৈরি করেই বসে নেই, বরং ভবিষ্যতের এই টেকসই বিমানগুলো যেন নিরাপদে বিশ্বের যেকোনো বিমানবন্দরে নামতে পারে এবং অনায়াসে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে, সে জন্য একটি বিস্তৃত হাইড্রোজেন এভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতেও কাজ করে যাচ্ছে। আগামী এক দশকের মধ্যেই হয়তো আপনার বিমানযাত্রার অভিজ্ঞতা পুরোপুরি বদলে যেতে চলেছে!