শীতকালীন অলিম্পিকে ব্যবহৃত হচ্ছে যেসব প্রযুক্তি
ইতালির মিলান এখন সরগরম। চারদিকে বরফের সাদা চাদর, আর তার ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটছে স্কি ও স্নোবোর্ড। গত ৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ২০২৬ সালের এই শীতকালীন অলিম্পিক চলবে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কিন্তু এবারের আসরে শুধু খেলোয়াড়রাই তারকা নন, আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছে প্রযুক্তি!
চোখের পলক ফেলতে যেখানে সময় লাগে সেকেন্ডের ১০ ভাগের এক ভাগ, সেখানে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে হার-জিত নির্ধারণ করা কি চাট্টিখানি কথা? এই অসাধ্য সাধন করতেই মিলানে বসানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চলুন, এবারের শীতকালীন অলিম্পিকের কিছু প্রযুক্তি সম্পর্কে জানা যাক।
সময়ের পাহারাদার ওমেগা
অলিম্পিকের সব রোমাঞ্চ ও উত্তেজনার মাঝে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে সুইস ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওমেগা। ১৯৩২ সাল থেকে তারা অলিম্পিকের অফিশিয়াল টাইমকিপার। কিন্তু এবারের মিলান অলিম্পিকে তারা যা এনেছে, তা আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।
আগে যেখানে সাধারণ স্টপওয়াচ দিয়ে সময় মাপা হতো, সেখানে এবার বসানো হয়েছে এমন ক্যামেরা যা প্রতি সেকেন্ডে ৪০ হাজার ছবি তুলতে পারে! কারণ স্পিড স্কেটিং বা ক্রস কান্ট্রি স্কিইংয়ের মতো রেসগুলোতে কে জিতল, তা খালি চোখে বোঝা অসম্ভব।
যেমন পুরুষদের ১০০০ মিটার শর্ট ট্র্যাক স্পিড স্কেটিংয়ের কথাই ধরুন। সেখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়া প্রতিযোগীর সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ০.০০০২ সেকেন্ড! আবার মেয়েদের ক্রস কান্ট্রি স্কিইংয়ে নরওয়েজিয়ান স্কিয়ার মিলা গ্রোসবার্গহাউজেন সুইডেনের প্রতিযোগীকে হারিয়েছেন মাত্র ০.০৪ সেকেন্ডের ব্যবধানে। মানুষের চোখের পক্ষে এই পার্থক্য ধরা অসম্ভব। কিন্তু ওমেগার ম্যাজিক ক্যামেরার কাছে কিছুই লুকানো থাকে না।
আগে যেখানে সাধারণ স্টপওয়াচ দিয়ে সময় মাপা হতো, সেখানে এবার বসানো হয়েছে এমন ক্যামেরা যা প্রতি সেকেন্ডে ৪০ হাজার ছবি তুলতে পারে!
ফিগার স্কেটিংয়ে এআই বিচারক
ফিগার স্কেটিং মানেই বরফের ওপর শৈল্পিক সব মুভমেন্ট। কিন্তু বিচারকেরা বুঝবেন কী করে কার জাম্প কত উঁচুতে ছিল বা কার ঘূর্ণি কতটা নিখুঁত? চিন্তা নেই, রিঙ্কের চারপাশে বসানো আছে ১৪টি ৮-কে (8K) রেজ্যুলেশনের ক্যামেরা।
এই ক্যামেরাগুলো স্কেটারদের প্রতিটি নড়াচড়া রেকর্ড করে এবং সুইস টাইমিং নামে এআই সিস্টেমে পাঠায়। চোখের পলকে তৈরি হয়ে যায় স্কেটারদের একটি থ্রি-ডি মডেল। প্রতিযোগীরা বরফ থেকে কতটা উঁচুতে লাফালেন, কতক্ষণ ভেসে থাকলেন, এমনকি ল্যান্ডিংয়ের সময় তাঁদের ব্লেড কত ডিগ্রি কোণে ছিল, সব তথ্য স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। টিভি দর্শকেরা ঘরে বসেই হিট ম্যাপ ও গ্রাফিক্সের মাধ্যমে এসব দেখতে পাচ্ছেন। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে সময় লাগে সেকেন্ডের ১০ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম!
স্কি ও স্নোবোর্ডেও সেন্সর
আগের অলিম্পিকগুলোতে প্রতিযোগীদের গোড়ালি বা পোশাকে সেন্সর লাগানো থাকত, যা অনেক সময় বিরক্তির কারণ হতো। এবার সেই ঝামেলা নেই। সেন্সর এখন বসানো হয়েছে স্কি বা স্নোবোর্ডের নিচে।
বিগ এয়ার ইভেন্টে যখন অ্যাথলেটরা শূন্যে ভেসে থাকেন, তখন এই সেন্সরগুলো তাঁদের গতি, উচ্চতা ও বাতাসের মধ্যে শরীরের ভারসাম্য মাপে। এই ডেটা শুধু টিভি দর্শকদের জন্যই নয়, কোচদের জন্যও এক বড় হাতিয়ার।
৮-কে রেজ্যুলেশনের ক্যামেরাগুলো স্কেটারদের প্রতিটি নড়াচড়া রেকর্ড করে এবং সুইস টাইমিং নামে এআই সিস্টেমে পাঠায়। চোখের পলকে তৈরি হয়ে যায় স্কেটারদের একটি থ্রি-ডি মডেল।
আধুনিক ড্রোনের ব্যবহার
প্রযুক্তির এই মেলায় আরেকটি জিনিস বেশ চোখে পড়ছে। সেটি হলো ড্রোন। প্রায় ১০টি বড় কোয়াডকপ্টার ও দুই ডজন এফপিভি ড্রোন সারাক্ষণ ভনভন করে অ্যাথলেটদের পিছু নিচ্ছে।
টিভিতে আমরা যে দুর্দান্ত সব শট দেখছি, স্কিয়ারদের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় বেয়ে নিচে নামা বা একদম মুখের সামনে থেকে ভিডিও করা; সেগুলো এসব ড্রোনেরই কারসাজি। তবে এতে সবাই খুশি নয়। আমেরিকান স্নোবোর্ডার বিয়া কিমের মতো কেউ কেউ বলছেন, মাথার ওপর ড্রোনের এই ভনভন শব্দ অনেক সময় মনোযোগ নষ্ট করে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
১৯৫৬ সালে ইতালিতেই প্রথম অলিম্পিকে স্বয়ংক্রিয় সময় গণনা শুরু হয়েছিল। আর আজ ৭০ বছর পর সেই ইতালিতেই এআই ও ড্রোন বদলে দিচ্ছে খেলার জগত। ২২ ফেব্রুয়ারি যখন এই আসরের পর্দা নামবে, তখন নিশ্চিতভাবেই পদক জিতবে মানুষ, কিন্তু আসল জয় হবে প্রযুক্তিরই।