দিনদিন বড় হচ্ছে গাড়ির আকার, বাড়ছে পৃথিবীর সমস্যা
রাস্তায় বের হলেই আজকাল একটা জিনিস খুব চোখে পড়ে। আগের সেই ছিমছাম, ছোটখাটো প্রাইভেট কারের জায়গা দখল করে নিচ্ছে বিশাল আকারের সব গাড়ি। এগুলোকে আমরা সাধারণত স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল বলে থাকি। দেখতে বেশ রাজকীয়, চাকচিক্যময় ও আভিজাত্যে ভরপুর এই গাড়িগুলো যেন আভিজাত্যের নতুন প্রতীক। কিন্তু গাড়িগুলোর এই বড় হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক অ্যান্থনি ল্যাভার্টি সম্প্রতি এই নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য বিএমজে-তে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে বলেছেন, গাড়ির এই বিশাল আকার আমাদের স্বাস্থ্য এবং পৃথিবীর পরিবেশের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনছে।
পরিসংখ্যানটা শুনলে চমকে উঠবেন। গত বছর যুক্তরাজ্যে নতুন গাড়ি বিক্রির বড় একটি অংশ, প্রায় ৬৩ শতাংশই ছিল এসইউভি। অথচ ২০১০ সালে এই হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ! পুরো বিশ্বের হিসাব করলেও দেখা যায়, নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির প্রায় ৪৮ শতাংশই এখন এই বিশাল আকৃতির এসইউভি। এই সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণই আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
ল্যাভার্টি দেখিয়েছেন, এই বড় গাড়িগুলো মূলত তিনভাবে আমাদের ক্ষতি করছে। রাস্তায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, বাড়ছে দূষণ। সঙ্গে মানুষের হাঁটা বা সাইকেল চালানোর মতো স্বাস্থ্যকর অভ্যাস দিনদিন বদলে যাচ্ছে।
গত বছর যুক্তরাজ্যে নতুন গাড়ি বিক্রির বড় একটি অংশ, প্রায় ৬৩ শতাংশই ছিল এসইউভি। অথচ ২০১০ সালে এই হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ!
যুক্তিটা খুব সহজ। একটা ছোট গাড়ির ধাক্কা খাওয়ার চেয়ে একটা বিশাল গাড়ির ধাক্কা খাওয়া অনেক বেশি বিপজ্জনক। বিশেষ করে পথচারী এবং সাইকেল আরোহীদের জন্য এই গাড়িগুলো রাস্তার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ গাড়ির তুলনায় এসইউভির ধাক্কায় কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি!
যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, রাস্তায় এসইউভির বদলে যদি ছোট গাড়ি চলত, তবে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের মৃত্যু এবং গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা অন্তত ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব হতো। সংখ্যায় হিসাব করলে দেখা যায়, শুধু ছোট গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৭০০ মানুষের জীবন বাঁচানো বা পঙ্গুত্ব রোধ করা সম্ভব।
গাড়িগুলো শুধু লম্বায় বা উচ্চতায় নয়, চওড়াতেও বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা এই অদ্ভুত প্রবণতার নাম দিয়েছেন কারস্প্রেডিং। ইউরোপের হিসাব বলছে, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর নতুন গাড়িগুলো গড়ে আধা সেন্টিমিটার করে চওড়া হয়েছে। রাস্তার জায়গা তো আর রাবারের মতো বাড়ে না! বড় গাড়িগুলো রাস্তার বেশি জায়গা দখল করে নিচ্ছে। ফলে সাইকেল বা হাঁটার জন্য জায়গা কমে যাচ্ছে। মানুষ বাধ্য হয়ে সাইকেল বা হাঁটা বাদ দিয়ে গাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অথচ বেশি মানুষ যদি হাঁটত বা সাইকেল চালাত, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভালো হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিসংখ্যান অনুসারে, রাস্তায় এসইউভির বদলে যদি ছোট গাড়ি চলত, তবে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের মৃত্যু এবং গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা অন্তত ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব হতো।
অনেকে হয়তো বলবেন, এখন তো ইলেকট্রিক এসইউভি চলে এসেছে, ধোঁয়া তো বের হয় না! কথাটা আংশিক সত্য। ইলেকট্রিক গাড়ির সাইলেন্সার পাইপ থেকে কালো ধোঁয়া বের হয় না ঠিকই, কিন্তু গাড়ির ওজন যখন বেশি হয়, তখন তার টায়ার এবং ব্রেক রাস্তার সঙ্গে অনেক বেশি ঘষা খায়। এই ঘর্ষণের ফলে টায়ার ও ব্রেক থেকে অতি সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়ায়, যা বর্তমানে শহুরে বায়ুদূষণের এক বড় কারণ। এসইউভি যেহেতু সাধারণ গাড়ির চেয়ে অনেক ভারী, তাই ইলেকট্রিক হলেও এগুলো ছোট ইলেকট্রিক গাড়ির মতো শতভাগ পরিবেশবান্ধব নয়।
তাহলে এই দানবীয় গাড়ির আগ্রাসন ঠেকানোর উপায় কী? ২০২৫ সালে অক্টোবর মাসে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফের সিটি কাউন্সিল একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা আবাসিক এলাকায় পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে এসইউভি বা বড় গাড়ির মালিকদের কাছ থেকে বেশি ফি আদায়ের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস তো আরও একধাপ এগিয়ে। শহরের কেন্দ্রে এসইউভি পার্কিংয়ের ফি তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে! জার্মানি ও ফ্রান্সের আরও কয়েকটি শহর ভারী ও বড় গাড়ির জন্য পার্কিং ফি বেশি নেওয়ার এই পথে হাঁটছে।
গাড়ির ওজন যখন বেশি হয়, তখন তার টায়ার এবং ব্রেক রাস্তার সঙ্গে অনেক বেশি ঘষা খায়। এই ঘর্ষণের ফলে টায়ার ও ব্রেক থেকে অতি সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়ায়, যা বর্তমানে বায়ুদূষণের বড় কারণ।
শুধু পার্কিং নয়, গবেষকরা বলছেন জাতীয় সরকারগুলোর উচিত গাড়ির ট্যাক্স বা করের নিয়মেও পরিবর্তন আনা। বড় গাড়ির জন্য বেশি ট্যাক্স ধার্য করলে মানুষ ছোট গাড়ি কিনতে উৎসাহিত হবে। যেহেতু বড় গাড়িগুলো সমাজকে বেশি বিপদে ফেলছে এবং দূষণ বাড়াচ্ছে, তাই তাদের করের বোঝাও বেশি হওয়াটাই যৌক্তিক।
কারও কারও হয়তো বিশাল পরিবারের জন্য বা বিশেষ প্রয়োজনে বড় গাড়ির দরকার হতে পারে। কিন্তু যখন নতুন গাড়ির অর্ধেকই এসইউভি হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে এটা আর সাধারণ প্রয়োজন নয়, বরং স্ট্যাটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি সত্যিই নিরাপদ রাস্তা এবং পরিষ্কার বাতাস চাই, তবে গাড়ি কেনার আগে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। পৃথিবীর শ্বাস নেওয়ার জায়গা করে দিতে হলে। এটা এখন সময়ের দাবি। এটা শুধু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের সমস্যা নয়, পুরো পৃথিবীর সমস্যা। তাই আমাদের সবার সচেতন হওয়া জরুরি।