অ্যারোপ্লেন মোড ও ডু নট ডিস্টার্ব মোডের মধ্যে পার্থক্য কোথায়

অ্যারোপ্লেন মোড এবং ডু নট ডিস্টার্ব মোড ফিচার দুটি কীভাবে কাজ করে?ছবি: দ্য আইফোন এফএকিউ/ইয়াকুব পজিকি/নূরফটো/গেটি ইমেজ

আধুনিক স্মার্টফোন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যোগাযোগ, কাজ এবং বিনোদন—সবকিছুই এখন এক ডিভাইসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আধুনিক স্মার্টফোনগুলোতে এত বেশি ফিচার থাকে যে কখনো কখনো কোনটার কাজ কী, তা বোঝাই কঠিন হয়ে যায়। যেমন ধরুন, অ্যারোপ্লেন মোড এবং ডু নট ডিস্টার্ব মোড।

এই দুটি অপশনই আসলে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেশ কাজের। অনেকের কাছে এই ফিচার দুটি একটু বিভ্রান্তিকর মনে হলেও ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এগুলো আপনার দৈনন্দিন জীবনকে আরও সহজ করে দিতে পারে। এই লেখায় আমরা স্মার্টফোনের এই দুটি ফিচার কীভাবে কাজ করে, তাদের পার্থক্য কোথায় আর কোন পরিস্থিতিতে কোনটি ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো; সেটা পরিষ্কারভাবে বোঝার চেষ্টা করব। চলুন দেখে নেওয়া যাক।

আরও পড়ুন
অ্যারোপ্লেন মোড বিমানে থাকা যোগাযোগ ও নেভিগেশন সিস্টেমগুলো ভূমি থেকে আসা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির ওপর নির্ভর করে কাজ করে। এই সিস্টেমগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল।

অ্যারোপ্লেন মোড আসলে কী

অ্যারোপ্লেন মোড বা ফ্লাইট মোড হলো স্মার্টফোনের একটি সেটিং, যা চালু করলে ফোনের নেটওয়ার্ক সিগন্যাল এবং ওয়াই-ফাই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ফোনের অন্যান্য ফিচার ঠিকই কাজ করে। অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সাধারণত স্ক্রিনের ওপর থেকে নিচে সোয়াইপ করলে সেটিংস প্যানেল আসে। সেখানে অ্যারোপ্লেন আইকন থাকে, সেটিতে ট্যাপ করলেই মোডটি চালু হয়ে যায়। আইফোনে এটি কন্ট্রোল সেন্টার থেকে চালু করা যায়।

অ্যারোপ্লেন মোড চালু করলে ফোন রেডিও সিগন্যাল গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে আপনি কল করতে বা রিসিভ করতে পারবেন না। টেক্সট মেসেজ পাঠানোও সম্ভব নয়। ওয়েব ব্রাউজিং বা জিমেইলের মতো অনলাইন সেবা ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে আগে থেকে ডাউনলোড করা বা সংরক্ষিত কন্টেন্ট, যেমন মেসেজ, ছবি, ডকুমেন্ট, গেম, গান বা মুভি অফলাইনে ঠিকই ব্যবহার করতে পারবেন।

অ্যারোপ্লেন মোড চালু করলে ফোন রেডিও সিগন্যাল গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়
ছবি: আইটি সাপোর্ট এলএ

এখন প্রশ্ন হলো, অ্যারোপ্লেন মোড আসলে কেন প্রয়োজন? এটি মূলত বিমানের সংবেদনশীল সিস্টেমে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের সংকেতের বাধা কমাতে ব্যবহার করা হয়। বিমানে থাকা যোগাযোগ ও নেভিগেশন সিস্টেমগুলো ভূমি থেকে আসা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির ওপর নির্ভর করে কাজ করে। এই সিস্টেমগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল, তাই রেডিও সিগন্যালের বাধা পাওয়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে।

অন্যদিকে, স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটও একই ধরনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে কাজ করে। যেমন ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, ভয়েস কলিং, 3G, 4G এবং 5G ডেটা। যদিও এগুলো রেডিও তরঙ্গের ভিন্ন ভিন্ন অংশ ব্যবহার করে, তবু একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে সম্ভাব্য সিগন্যাল সংঘর্ষ এড়াতে বিমানে ভ্রমণকালে অ্যারোপ্লেন মোড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন
অ্যারোপ্লেন মোড চালু করলে ফোন রেডিও সিগন্যাল গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে আপনি কল করতে বা রিসিভ করতে পারবেন না। টেক্সট মেসেজ পাঠানোও সম্ভব নয়

ডু নট ডিস্টার্ব মোড কী

অ্যারোপ্লেন মোড যেখানে আপনার ফোনকে পুরো নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, সেখানে ডু নট ডিস্টার্ব মোড শুধু ফোনটাকে মিউট করে দেয়। সহজভাবে বললে, এটি মূলত সাইলেন্ট মোডেরই একটি উন্নত সংস্করণ। এই মোড চালু থাকলে ফোনে আসা সব ধরনের নোটিফিকেশন, যেমন রিংটোন, বিপ সাউন্ড, পপ-আপ অ্যালার্ট, মেসেজ, কল, খবর ইত্যাদি সবই সাইলেন্ট হয়ে যায়। তবে এগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে যায় না; বরং আপনি ফোন চেক করলে সবকিছুই দেখতে পাবেন। শুধু পার্থক্য হলো, স্বাভাবিকভাবে এগুলোর নোটিফিকেশন যেভাবে আপনাকে অ্যালার্ট দেয়, ডু নট ডিস্টার্ব মোড চালু থাকলে তা আর হয় না। অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে এটি সাধারণত Settings > Sound and Vibration-এ পাওয়া যায়, অথবা স্ক্রিনের ওপর থেকে নিচে সোয়াইপ করেও চালু করা যায়। আর আইফোনে কন্ট্রোল সেন্টার থেকে খুব সহজেই ডু নট ডিস্টার্ব মোড অন করা যায়।

ডু নট ডিস্টার্ব মোড শুধু ফোনকে মিউট করে দেয়
ছবি: মেক ইউজ অব

ডু নট ডিস্টার্ব মোডের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর কাস্টমাইজেশন। আপনি চাইলে নির্দিষ্ট কিছু কন্টাক্টকে অনুমতি দিতে পারবেন, যাতে তাদের কল বা মেসেজ এলেই ফোনে নোটিফিকেশন আসে। এই ফিচারটাই ডু নট ডিস্টার্ব মোডকে সাধারণ সাইলেন্ট মোড থেকে আলাদা করেছে।

সাধারণ সাইলেন্ট মোড সব ধরনের নোটিফিকেশন একেবারে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু কখনো কখনো এমন পরিস্থিতিও থাকে, যখন আপনি সবকিছু বন্ধ রাখতে চান না; বরং কিছু নির্দিষ্ট মানুষের কল বা মেসেজ পেতে চান। সেই ক্ষেত্রে ডু নট ডিস্টার্ব মোডই সবচেয়ে ভালো সমাধান।

আরও পড়ুন
ডু নট ডিস্টার্ব মোডের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর কাস্টমাইজেশন। আপনি চাইলে নির্দিষ্ট কিছু কন্টাক্টকে অনুমতি দিতে পারবেন, যাতে তাদের কল বা মেসেজ এলেই ফোনে নোটিফিকেশন আসে

এই ফিচারটিকে আপনি আপনার ফোনের একজন স্মার্ট দারোয়ান হিসেবে কল্পনা করতে পারেন। দারোয়ান যেমন নির্দিষ্ট মানুষকে কোথাও ঢুকতে দেয় আর অপ্রয়োজনীয়দের ফিরিয়ে দেয়, তেমনি ডু নট ডিস্টার্ব মোড আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কল আসতে দিতে পারে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় অ্যালার্ট বন্ধ করে দিতে পারে। অন্যদিকে সাইলেন্ট মোড হলো পুরো দরজা তালা মেরে দেওয়ার মতো, যেখানে শুধু অ্যালার্ম ছাড়া আর কিছুই ঢোকে না।

আজকাল আমরা এত বেশি নোটিফিকেশন পাই যে, দিনে অনেক সময় ১০ থেকে ১০০ বার পর্যন্ত ফোন ভাইব্রেট করতে পারে। এই জায়গায় ডু নট ডিস্টার্ব মোড গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে মিস না করে খুব ভালোভাবে সাহায্য করে।

অ্যারোপ্লেন মোড নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, আর ডু নট ডিস্টার্ব মোড নেটওয়ার্ক সংযোগকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে
ছবি: লাইফওয়্যার

অ্যারোপ্লেন মোড এবং ডু নট ডিস্টার্ব মোড উভয়ই আমাদের ডিজিটাল জীবনে ভারসাম্য আনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যারোপ্লেন মোড নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, আর ডু নট ডিস্টার্ব মোড নেটওয়ার্ক সংযোগকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে। আজকের যুগে যেখানে আমরা সব সময় অনলাইনে থাকি, সেখানে কখন নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকতে হবে আর কখন নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে, এই সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, এগ্রিকালচারাল সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

সূত্র: মেন্টাল ফ্লস, রিডার্স ডাইজেস্ট ও হাউ টু গিক

আরও পড়ুন