স্মার্টওয়াচ যে ৬ উপায়ে আপনাকে মিথ্যা বলে
সকালে বেশ ফুরফুরে মেজাজে দৌড় শেষ করে ঘর্মাক্ত শরীরে ঘরে ফিরলেন। মনে বেশ তৃপ্তি, কারণ দৌড়ানোটা আজ সত্যিই ভালো হয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকালেন ফিটনেস স্কোর দেখার জন্য। কিন্তু আপনার স্মার্টওয়াচ বলছে ভিন্ন কথা! আপনার ফিটনেস স্কোর নাকি কমে গেছে, ক্যালরিও তেমন পোড়েনি, রিকভারি স্কোর তো একদম তলানিতে! ঘড়ি আপনাকে বলছে, পরের ৭২ ঘণ্টা আপনার নাকি বিশ্রাম নেওয়া উচিত!
সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হলো, আপনার শরীর কিন্তু বেশ চনমনে ও সুস্থ বোধ করছে। তাহলে ঘড়ি কেন উল্টো কথা বলছে? সহজ উত্তর হলো, স্মার্টওয়াচ এবং অন্যান্য ফিটনেস ট্র্যাকার সব সময় একদম নিখুঁত বা নির্ভুল তথ্য দেয় না।
সকালে বেশ ফুরফুরে মেজাজে দৌড় শেষ করে ঘর্মাক্ত শরীরে ঘরে ফিরলেন। ঘড়ির দিকে তাকালেন ফিটনেস স্কোর দেখার জন্য। কিন্তু আপনার স্মার্টওয়াচ বলছে ভিন্ন কথা!
স্মার্টওয়াচ যেভাবে আমাদের প্রভাবিত করে
গত প্রায় এক দশক ধরে স্মার্টওয়াচের মতো পরিধানযোগ্য ফিটনেস প্রযুক্তি ব্যবহারের চল হু হু করে বেড়েছে। বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ এখন প্রতিদিন এগুলো ব্যবহার করেন।
এই ডিভাইসগুলো ধীরে ধীরে আমাদের ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যের ধারণাকেই পাল্টে দিচ্ছে। আমরা কত ক্যালরি পুড়িয়েছি, আমরা কতটা ফিট, ব্যায়ামের পর শরীর কতটা রিকভার করেছে এবং আমরা আবার ব্যায়াম করার জন্য প্রস্তুত কি না—এসবের ওপর ভিত্তি করে এই ঘড়িগুলো আমাদের নানা তথ্য দেয়।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আপনার স্মার্টওয়াচ বেশির ভাগ সূচকই সরাসরি মাপে না! বরং এগুলো হলো কিছু গাণিতিক হিসাব বা অনুমান। সোজা কথায়, এগুলো আপনার ভাবনার মতো এতটা নির্ভুল নয়। চলুন, বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখে নিই এমন ৬টি বিষয়, যেখানে আপনার স্মার্টওয়াচ হয়তো আপনাকে ভুল তথ্য দিচ্ছে।
মজার ব্যাপার হলো, আপনার স্মার্টওয়াচ বেশির ভাগ সূচকই সরাসরি মাপে না! বরং এগুলো হলো কিছু গাণিতিক হিসাব বা অনুমান।
১. ক্যালরি ট্র্যাকিং
স্মার্টওয়াচের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিচারগুলোর একটি হলো ক্যালরি ট্র্যাকিং। কিন্তু এর নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। একটি পরিধানযোগ্য ডিভাইস আপনার শক্তির খরচ বা পোড়ানো ক্যালরির হিসাব ২০ শতাংশের চেয়েও বেশি বা কম দেখাতে পারে! তা ছাড়া ব্যায়ামের ধরন অনুযায়ী এই ভুলের মাত্রা বদলায়। যেমন, ভারোত্তোলন বা স্ট্রেংথ ট্রেনিং, সাইক্লিং এবং হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিংয়ের সময় এই ঘড়িগুলো আরও বেশি ভুল তথ্য দিতে পারে।
এটি একটি বড় সমস্যা। কারণ, মানুষ এই হিসাব দেখে তাদের খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করে। ঘড়ি যদি দেখায়, আপনি অনেক ক্যালরি পুড়িয়েছেন, তবে আপনি হয়তো বেশি খেয়ে ফেলবেন। এতে আপনার ওজন বেড়ে যেতে পারে। উল্টোদিকে, ঘড়ি যদি কম ক্যালরি পোড়ানোর হিসাব দেখায়, তবে আপনি হয়তো কম খাবেন। এর প্রভাব পড়বে আপনার ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যের ওপর।
২. স্টেপ কাউন্ট
সারাদিনে আপনি কতটা শারীরিকভাবে সক্রিয় ছিলেন, তা মাপার জন্য স্টেপ কাউন্ট দারুণ এক পদ্ধতি। কিন্তু স্মার্টওয়াচ এই পদক্ষেপগুলোও নিখুঁতভাবে গুনতে পারে না।
সাধারণ ব্যায়ামের সময় স্মার্টওয়াচ আপনার পদক্ষেপের সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ কম গুনতে পারে। আপনি যদি কোনো ভারী জিনিস বহন করেন, অথবা হাঁটার সময় হাত কম নাড়ান, তবে এই হিসাব আরও বেশি ভুল হতে পারে। কারণ, স্মার্টওয়াচ আসলে আপনার হাতের নড়াচড়া দেখেই পদক্ষেপের হিসাব কষে।
সাধারণ মানুষের জন্য এটি খুব বড় কোনো সমস্যা নয়। তবে এই হিসাবগুলোকে একদম নিখুঁত না ভেবে একটি সাধারণ নির্দেশক হিসেবে ধরাই ভালো।
একটি পরিধানযোগ্য ডিভাইস আপনার শক্তির খরচ বা পোড়ানো ক্যালরির হিসাব ২০ শতাংশের চেয়েও বেশি বা কম দেখাতে পারে! তা ছাড়া ব্যায়ামের ধরন অনুযায়ী এই ভুলের মাত্রা বদলায়।
৩. হার্ট রেট
আপনার হাতের কবজির শিরা দিয়ে বয়ে চলা রক্তের প্রবাহের পরিবর্তন মেপেই স্মার্টওয়াচ আপনার হৃৎস্পন্দনের হিসাব করে। আপনি যখন বিশ্রামে থাকেন বা হালকা ব্যায়াম করেন, তখন এই হিসাব বেশ নির্ভুল হয়। কিন্তু ব্যায়ামের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর নির্ভুলতা কমতে থাকে।
হাতের নড়াচড়া, ঘাম, ত্বকের রং এবং আপনি ঘড়িটি কতটা শক্ত করে পরেছেন, এই সবকিছুই হৃৎস্পন্দনের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ, মানুষভেদে এই হিসাব আলাদা হতে পারে। যারা হার্ট রেট জোন মেনে ব্যায়াম করেন, তাদের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ সামান্য ভুলের কারণে তারা ভুল তীব্রতায় ব্যায়াম করে ফেলতে পারেন।
৪. স্লিপ স্কোর
বাজারের প্রায় প্রতিটি স্মার্টওয়াচই এখন স্লিপ স্কোর দেয় এবং আপনার ঘুমকে লাইট, ডিপ এবং রেম স্লিপের মতো নানা ধাপে ভাগ করে দেখায়।
ঘুম মাপার সবচেয়ে নিখুঁত ও বিজ্ঞানসম্মত উপায় হলো পলিসমনোগ্রাফি। এটি একটি ল্যাব-ভিত্তিক পরীক্ষা, যা সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করে। কিন্তু স্মার্টওয়াচ আপনার নড়াচড়া এবং হৃৎস্পন্দন দেখে ঘুমের অনুমান করে।
মানে, আপনি কখন ঘুমিয়েছেন বা কখন জেগে আছেন, তা ঘড়িটি মোটামুটি ভালোভাবে বুঝতে পারে। কিন্তু ঘুমের বিভিন্ন পর্যায় বা স্টেজ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটি মোটেও নির্ভুল নয়। তাই আপনার ঘড়ি যদি বলে, আপনার ডিপ স্লিপ ভালো হয়নি, তবে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। এটি সত্যি না-ও হতে পারে!
ঘুম মাপার সবচেয়ে নিখুঁত ও বিজ্ঞানসম্মত উপায় হলো পলিসমনোগ্রাফি। এটি একটি ল্যাব-ভিত্তিক পরীক্ষা, যা সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করে।
৫. এইচআরভি
বেশিরভাগ স্মার্টওয়াচ হার্ট রেট ভ্যারিয়াবিলিটি বা এইচআরভি পরিমাপ করে। মানে হৃৎস্পন্দনের পরিবর্তনশীলতা মাপে। এর সঙ্গে আপনার স্লিপ স্কোর বা ঘুমের হিসাব মিলিয়ে ঘড়িটি আপনার রেডিনেস বা রিকভারি স্কোর তৈরি করে।
হার্ট রেট ভ্যারিয়াবিলিটি থেকে বোঝা যায়, আপনার শরীর চাপের সঙ্গে কতটা ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারছে। ল্যাবে এটি ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) দিয়ে মাপা হয়। কিন্তু কবজিতে থাকা সেন্সর দিয়ে স্মার্টওয়াচ যে হিসাব করে, তাতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।
অর্থাৎ, আপনার রিকভারি স্কোর আসলে দুটি ভুল অনুমানের—এইচআরভি এবং ঘুমের মান—ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে! ফলে ঘড়ি যদি বলে, আপনার শরীর এখনো ব্যায়ামের জন্য প্রস্তুত নয়, অথচ আপনি একদম সতেজ অনুভব করছেন, তখন ঘড়ির কথা শুনে ব্যায়াম বাদ দেওয়াটা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
৬. ভিওটু-ম্যাক্স
বেশিরভাগ ডিভাইস আপনার VO₂max অনুমান করে, যা আপনার সর্বোচ্চ ফিটনেসের নির্দেশক। এটি মূলত ব্যায়াম করার সময় আপনার শরীর সর্বোচ্চ কতটুকু অক্সিজেন ব্যবহার করতে পারে, তার পরিমাণ।
VO₂max মাপার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো মুখে মাস্ক পরে ব্যায়াম করা, যাতে আপনার শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার অক্সিজেনের পরিমাণ নিখুঁতভাবে মাপা যায়।
কিন্তু আপনার ঘড়ি তো আর অক্সিজেনের ব্যবহার মাপতে পারে না! সে আপনার হৃৎস্পন্দন ও নড়াচড়া দেখে এর একটা অনুমান করে মাত্র। দেখা যায়, স্মার্টওয়াচ সাধারণত কম সক্রিয় মানুষদের VO₂max বেশি দেখায় এবং অনেক বেশি ফিট মানুষদের VO₂max কম দেখায়! তাই ঘড়ির এই সংখ্যাটি হয়তো আপনার আসল ফিটনেসকে মোটেও প্রতিফলিত করছে না।
হার্ট রেট ভ্যারিয়াবিলিটি থেকে বোঝা যায়, আপনার শরীর চাপের সঙ্গে কতটা ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারছে। ল্যাবে এটি ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম বা ইসিজি দিয়ে মাপা হয়।
তাহলে আপনার কী করা উচিত
স্মার্টওয়াচের দেওয়া তথ্যে যদিও ভুলভ্রান্তি থাকে, তার মানে এই নয় যে এটি একদমই মূল্যহীন। এই ডিভাইসগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য আপনার স্বাস্থ্যের একটা সাধারণ ট্রেন্ড বুঝতে সাহায্য করতে পারে। তবে এর প্রতিদিনের হিসাব বা নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলো নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকার নেই।
সবচেয়ে বড় কথা, আপনার নিজের কেমন লাগছে, আপনি কীভাবে কাজ করছেন এবং আপনার শরীর কীভাবে ক্লান্তি থেকে সেরে উঠছে, সেদিকে মনোযোগ দিন। আপনার স্মার্টওয়াচের চেয়ে আপনার নিজের শরীর আপনাকে আরও অনেক বেশি সঠিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারবে!