এআই কি এখন গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করতে পারে
জুলাইয়ের এক দুপুর। পৃথিবীর ১০৮টি দেশ থেকে আসা কয়েক শ তরুণ গণিতবিদ হলরুমে বসে আছে। সামনে তিনটি করে মোট ছয়টি প্রশ্ন। হাতে সময় সাড়ে চার ঘণ্টা করে মোট নয় ঘণ্টা। আসলে শিক্ষার্থীরা দুই দিনে তিনটি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দেয়, সময় পায় প্রতিদিন সাড়ে ৪ ঘণ্টা করে মোট ৯ ঘণ্টা। সবার একটাই লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে নিজের সেরাটা দিয়ে পদক ছিনিয়ে নেওয়া। ১৯৫৯ সাল থেকে চলে আসা এই প্রতিযোগিতায় প্রতিবছর বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিভাবান তরুণ গণিতপ্রেমীরা অংশ নেয়। ফিল্ডস মেডেলজয়ী অনেক গণিতবিদের শুরু হয়েছিল এই মঞ্চ থেকে। কিন্তু ২০২৪ সালে এই মঞ্চে নতুন এক প্রতিযোগী যোগ দিয়েছিল। তার হাত নেই, মুখ নেই, ঘুমও নেই। প্রতিযোগীর নাম আলফাপ্রুফ (AlphaProof)।
১৯৫৯ সাল থেকে চলে আসা আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে প্রতিবছর বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিভাবান তরুণ গণিতপ্রেমীরা অংশ নেয়। ফিল্ডস মেডেলজয়ী অনেক গণিতবিদের শুরু হয়েছিল এই মঞ্চ থেকে।
যেদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রৌপ্যপদক পেল!
না, সত্যি সত্যি রৌপ্যপদক পায়নি এআই। কিন্তু রৌপ্যপদক পেতে যে নম্বর অর্জন করতে হয়, সেই নম্বর এআই পেয়েছিল। সেই এআই মডেল দুটির নাম আলফাপ্রুফ ও আলফাজ্যামিতি ২। দুটিই গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি এআই সিস্টেম। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে চারটির সঠিক সমাধান দিতে পেরেছিল এই সিস্টেম দুটি। ৪২ নম্বরের মধ্যে পেয়েছিল ২৮। সে বছর রৌপ্যপদক দেওয়া হয়েছিল ২২ নম্বরে। অর্থাৎ, আলফাপ্রুফের ২৮ নম্বর অনায়াসেই রৌপ্যপদকের সীমা অতিক্রম করেছিল। এমনকি স্বর্ণপদকের নম্বর ছিল ২৯। মানে আর মাত্র ১ পয়েন্ট পেলেই স্বর্ণপদক পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করত।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, আলফাপ্রুফ একাই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি (৬ নম্বর প্রশ্ন) সমাধান করেছিল। ওই বছর বিশ্বের ৬০৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন মানুষ এটি সম্পূর্ণ সমাধান করতে পেরেছিল! আর জ্যামিতির চতুর্থ প্রশ্নটি সমাধান করেছিল আলফাজ্যামিতি ২। এই ফলাফল পরে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ পিয়ার-রিভিউ হয়ে প্রকাশিত হয়।
চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, আলফাপ্রুফ একাই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সমাধান করেছিল। ওই বছর বিশ্বের ৬০৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন মানুষ এটি সম্পূর্ণ সমাধান করতে পেরেছিল!
আলফাপ্রুফ কীভাবে কাজ করে
মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, আলফাপ্রুফ সম্পর্কে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। এটি চ্যাটজিপিটির মতো সাধারণ ভাষানির্ভর এআই মডেল নয়। চ্যাটজিপিটি বিপুল পরিমাণ লেখার ধরন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করে। কিন্তু আলফাপ্রুফ সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিতে কাজ করে। এর ভিত্তি হলো রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং। এই পদ্ধতিতেই ডিপমাইন্ডের ‘আলফাজিরো’ দাবা খেলায় বিশ্বসেরা মানব খেলোয়াড়দের পরাজিত করার দক্ষতা অর্জন করেছিল। তবে এখানে খেলার বোর্ডের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে লিন নামে একটি ফরমাল থিওরেম-প্রুভিং সিস্টেম।
ধরুন, একজন গণিত শিক্ষক প্রতিটি লাইনের পর ঠিক বা ভুল লিখে দিচ্ছেন। লিন ঠিক এমনই একটি কম্পিউটার ব্যবস্থা, যা কোনো ধাপ বাদ না দিয়ে প্রতিটি যুক্তি যাচাই করে। ফলে কোনো প্রমাণে সামান্যতম যুক্তিগত ত্রুটি থাকলেও তা সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে। আলফাপ্রুফকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রথমে প্রায় ১০ লাখ সাধারণ গাণিতিক সমস্যাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফরমালাইজ করে লিনে আনুষ্ঠানিক ভাষায় রূপান্তর করা হয়। এরপর সেখান থেকে প্রায় ১০ কোটি ফরমাল সমস্যা তৈরি করে সিস্টেমটিকে আরও জটিল গাণিতিক প্রমাণ খুঁজে বের করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
কোনো অলিম্পিয়াডের সমস্যা সামনে এলে আলফাপ্রুফ সম্ভাব্য বহু প্রমাণের পথ অনুসন্ধান করে। এরপর প্রতিটি ধাপ লিনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে দেখে, কোনটি গাণিতিকভাবে বৈধ। ভুল পথগুলো বাদ দিয়ে এবং সফল প্রমাণ থেকে শিক্ষা নিয়ে সিস্টেমটি ধাপে ধাপে আরও উন্নত হয়। সহজভাবে বললে, আলফাপ্রুফ মানুষের মতো অনুমাননির্ভর উত্তর দেয় না; বরং সম্ভাব্য প্রমাণ তৈরি করে, প্রতিটি ধাপ কঠোরভাবে যাচাই করে এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি নির্ভুল গাণিতিক প্রমাণে পৌঁছায়।
জ্যামিতির প্রশ্নগুলোর জন্য আলাদা একটি সিস্টেম, অর্থাৎ আলফাজ্যামিতি ২ ব্যবহার করা হয়েছিল। কারণ, জ্যামিতিক সমস্যার গঠন বীজগণিত বা সংখ্যাতত্ত্বের চেয়ে ভিন্ন যুক্তি দাবি করে।
কোনো অলিম্পিয়াডের সমস্যা সামনে এলে আলফাপ্রুফ সম্ভাব্য বহু প্রমাণের পথ অনুসন্ধান করে। এরপর প্রতিটি ধাপ লিনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে দেখে, কোনটি গাণিতিকভাবে বৈধ।
এক বছরের মাথায় স্বর্ণপদক
অগ্রগতি এখানেই থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে গুগলের জেমিনি মডেলের একটি উন্নত সংস্করণ ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে পাঁচটিই সমাধান করে ফেলে। ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এআই সরাসরি স্বর্ণপদকের মানে পৌঁছে যায়! একই প্রতিযোগিতায় ওপেনএআইয়ের একটি সিস্টেমও পাঁচটি প্রশ্নের সমাধান দিতে পেরেছিল। যে প্রক্রিয়ায় ২০২৪ সালে দিন-রাত সময় লেগেছিল, ২০২৫ সালে তা আরও অনেক দ্রুত সম্পন্ন হয়।
২০২৪ সালে আলফাপ্রুফ ছিল একটি অতি-বিশেষায়িত সিস্টেম, যা শুধু প্রমাণ লেখার জন্যই তৈরি এবং লিনভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়া। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি স্বতন্ত্র বেঞ্চমার্কে আরও চমকপ্রদ কিছু দেখা গেল। কোনো বিশেষায়িত গণিত-সিস্টেম ছাড়াই, শুধু তিনটি সাধারণ টুল ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি জেনারেল-পারপাস এআই মডেল আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে প্রকৃত ছয়টি প্রশ্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে।
ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ, কোনো মানুষের সাহায্য নেই, কোনো রিভিউয়ার বা পর্যালোচক নেই; শুধু মডেল ও একটি টার্মিনাল। ফলাফল যাচাই করা হয়েছে আলাদা ভেরিফায়ার এআই এজেন্ট দিয়ে। এরা প্রতিটি প্রমাণের বীজগণিত প্রতীকীভাবে পুনরায় যাচাই করেছে, সন্দেহজনক দাবি কম্পিউটারে পরীক্ষা করেছে এবং ভুল লেমার জন্য সুনির্দিষ্ট কন্ট্রাডিকশন তৈরি করে দেখিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গ্রেডাররাও এ ক্ষেত্রে এআই এজেন্ট। এখানে কোনো মানুষ বিচারক হিসেবে ছিল না। তাই একে অফিশিয়াল বা দাপ্তরিক মূল্যায়ন হিসেবে না দেখে একটি স্বচ্ছ ও পুনরুৎপাদনযোগ্য স্বাধীন মূল্যায়ন হিসেবে দেখাই সংগত।
সবচেয়ে লক্ষণীয় তথ্য হলো, ক্লড ফেবল ৫ প্রথম চেষ্টাতেই পূর্ণ ৪২ নম্বর পেয়েছিল। তা-ও আবার সবচেয়ে কম সময়ে এবং তুলনামূলক কম খরচে। এই এআইয়ের মোট খরচ হয়েছিল ৫১ ডলার। জিপিটি-৫.৬ সল এবং কিমি কে৩ শেষ পর্যন্ত ৪২ নম্বর পেয়েছে, তবে তা যাচাইকারীর নির্দিষ্ট ত্রুটি-অনুসন্ধান দেখে সেই তথ্য দিয়ে প্রমাণ মেরামত করার পর। কিমি কে৩ এই কাজে ১৭ ঘণ্টার বেশি সময় নিয়েছে।
সবচেয়ে লক্ষণীয় তথ্য হলো, ক্লড ফেবল ৫ প্রথম চেষ্টাতেই পূর্ণ ৪২ নম্বর পেয়েছিল। তা-ও আবার সবচেয়ে কম সময়ে এবং তুলনামূলক কম খরচে। এই এআইয়ের মোট খরচ হয়েছিল ৫১ ডলার।
তাহলে কি অলিম্পিয়াডের দিন ফুরালো
এই প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে। কিন্তু বাস্তবতা আরও সূক্ষ্ম। আলফাপ্রুফের সমাধানে এখনো মানুষের চেয়ে অনেক বেশি কম্পিউটিং শক্তি লাগে। প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আলাদা প্রকৌশলগত প্রস্তুতি দরকার হয়। অর্থাৎ এটি এখনো সাধারণ গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ পরিসরে অসাধারণ এক দক্ষতা। তবে বাংলাদেশের অলিম্পিয়াড-সংস্কৃতির জন্য এই খবরের বার্তাটা হতাশার নয়, বরং সুযোগের। যে শিক্ষার্থী আজ প্রমাণ লিখতে শিখছে, আগামী দিনে তাকে হয়তো এমন এক পৃথিবীতে কাজ করতে হবে, যেখানে এআই তার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহকর্মী হবে।
লিনের মতো ফরমাল ভাষা শেখা, যুক্তির প্রতিটি ধাপ কঠোরভাবে যাচাই করার অভ্যাস ও সমস্যাকে ভাঙাগড়া করে দেখার ক্ষমতা—এগুলো এমন দক্ষতা, যা মানুষ ও মেশিনের যৌথ ভবিষ্যতে সমানভাবে মূল্যবান থেকে যাবে। গণিত অলিম্পিয়াড কখনোই শুধু উত্তর মেলানোর প্রতিযোগিতা ছিল না। এটি ছিল চিন্তার শৃঙ্খলা শেখার জায়গা। আলফাপ্রুফ হয়তো সেই শৃঙ্খলাকেই এখন মেশিনের ভাষায় অনুকরণ করতে শিখছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই শৃঙ্খলাকে আরও গভীরভাবে আয়ত্ত করব, নাকি মেশিনের হাতে ছেড়ে দেব? সেই সিদ্ধান্ত এখনো আমাদের হাতেই।