মানুষের কণ্ঠে কথা বলবে কম্পিউটার! এআই-এর নতুন জাদুর দুনিয়া

যখন একটি এআই একই সাথে টেক্সট, অডিও, ভিডিও কিংবা ছবি একসাথে প্রসেস করতে পারে, তখন তাকে মাল্টি-মোডাল বলা হয়ছবি: ক্লাউডবেডস

ভাবুন তো, আপনি ঘরে বসে বিজ্ঞানের একটি কঠিন থিওরি বা সূত্র বোঝার চেষ্টা করছেন। বইয়ের পড়াটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ ল্যাপটপ থেকে আইনস্টাইনের চেনা গম্ভীর গলার আওয়াজ ভেসে এল! আইনস্টাইন নিজে সহজ বাংলায় কৌতুক করে সেই কঠিন সূত্রটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কিংবা ধরুন, হ্যারি পটারের প্রিয় ডাম্বলডোর স্যারের কণ্ঠে আপনি শুনছেন মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলের গল্প!

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগছে তো? কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর কল্যাণে এই জাদুকরী কাণ্ডটি এখন আমাদের দোরগোড়ায় চলে এসেছে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে মাল্টি-মোডাল এআই এবং রিয়েল-টাইম ভয়েস ক্লোনিং।

সহজ কথায়, এআই এখন আর শুধু চ্যাটবটের মতো টেক্সট লিখতে পারে না। সে মানুষের মতো দেখতে পায়, শুনতে পায় এবং ঠিক আমাদের মতোই যেকোনো মানুষের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে রিয়েল-টাইমে (অর্থাৎ পলকের মধ্যে) কথা বলতে পারে।

আরও পড়ুন
মোডালিটি মানে হলো যোগাযোগের মাধ্যম—যেমন টেক্সট, অডিও, ভিডিও কিংবা ছবি। যখন একটি এআই একই সাথে এই সবগুলো মাধ্যম প্রসেস করতে পারে, তখন তাকে মাল্টি-মোডাল বলা হয়।

এতদিন এআই ছিল একচোখা। তাকে লিখে প্রশ্ন করলে সে লিখে উত্তর দিত। ছবি দিলে বড়জোর বলে দিত ছবিতে কী আছে। কিন্তু ২০২৬ সালের লেটেস্ট এআই মডেলগুলো—যেমন ওপেনএআই-এর নতুন ওয়ান (o1) সিরিজ বা গুগলের জেমিনাই লাইভ—হয়ে উঠেছে পুরোপুরি মাল্টি-মোডাল।

মোডালিটি মানে হলো যোগাযোগের মাধ্যম—যেমন টেক্সট, অডিও, ভিডিও কিংবা ছবি। যখন একটি এআই একই সাথে এই সবগুলো মাধ্যম একসাথে প্রসেস করতে পারে, তখন তাকে মাল্টি-মোডাল বলা হয়।

২০২৬ সালের লেটেস্ট এআই মডেল ওপেনএআই-এর নতুন ওয়ান সিরিজ
ছবি: ওপেনএআই

একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। আপনি ল্যাপটপের ক্যামেরা অন করে তার সামনে একটা ছেঁড়া তার আর একটা সার্কিট বোর্ড ধরলেন। এআই তার নিজস্ব ডিজিটাল চোখ দিয়ে সেই লাইভ ভিডিও দেখবে। আপনি মুখে বললেন, ‘এই সার্কিটটা কীভাবে জোড়া দেব বলো তো? ’ এআই সাথে সাথে মানুষের মতো ওপাশে উঁকি দিয়ে দেখে আপনার কথা শুনে চমৎকার গলার স্বরে (কোনো রোবোটিক টোন ছাড়া, ঠিক মানুষের মতো শ্বাস নিয়ে, হেসে) আপনাকে গাইড করতে শুরু করবে।

আরও পড়ুন
একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। আপনি ল্যাপটপের ক্যামেরা অন করে তার সামনে একটা ছেঁড়া তার আর একটা সার্কিট বোর্ড ধরলেন। এআই তার নিজস্ব ডিজিটাল চোখ দিয়ে সেই লাইভ ভিডিও দেখবে।

ভয়েস ক্লোনিং: মাত্র ৩ সেকেন্ডের জাদু!

এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং কিছুটা ভুতুড়ে অংশটি হলো ভয়েস ক্লোনিং বা কণ্ঠস্বর নকল করার প্রযুক্তি।

আগে এআই-কে দিয়ে কোনো মানুষের গলায় কথা বলাতে হলে সেই মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেকর্ড করা অডিও দিয়ে এআই-কে দিনের পর দিন ট্রেনিং দিতে হতো। আর এখন? মাত্র ৩ থেকে ৫ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপ হলেই কেল্লাফতে! আপনি মাত্র ৫ সেকেন্ডের জন্য মাইক্রোফোনে বললেন, ‘হ্যালো বিজ্ঞানচিন্তা, কেমন আছ?’

ভয়েস ক্লোনিং বা কণ্ঠস্বর নকল করার প্রযুক্তি মাধ্যমে এআইকে দিয়ে আস্ত একটা উপন্যাস হুবহু আপনার নিজের গলার স্বরের মতো করে পড়িয়ে নিতে পারবেন!
ছবি: অ্যালামি স্টক ভেক্টর

এআই ওই ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই আপনার গলার পিচ, টোন, কথা বলার গতি এবং আঞ্চলিক টান নিখুঁতভাবে অ্যানালাইসিস বা বিশ্লেষণ করে ফেলবে। এরপর তাকে দিয়ে আস্ত একটা উপন্যাস বা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ হুবহু আপনার নিজের গলার স্বরের মতো করে পড়িয়ে নিতে পারবেন!

চিকিৎসা বিজ্ঞানেও এর মানবিক ব্যবহার শুরু হয়েছে। যেসব মানুষ কোনো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে বা অস্ত্রোপচারের কারণে নিজেদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলেছেন, তাদের পুরনো ছোট্ট কোনো অডিও ক্লিপ থেকে কণ্ঠস্বর ক্লোন করে আবার ডিজিটাল দুনিয়ায় তাদের নিজস্ব কণ্ঠে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে এই প্রযুক্তি।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা এখন এমন কিছু এআই ডিটেক্টর তৈরি করছেন, যা কান দিয়ে শুনে বোঝা না গেলেও কম্পিউটারের কোড দিয়ে ধরে ফেলবে যে কণ্ঠটি আসল মানুষের নাকি এআই-এর তৈরি ক্লোন।

মুদ্রার ওপিঠ: ‘ডিপফেক অডিও’ ও আমাদের সতর্কতা

বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকেরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে আন্দাজ করে ফেলেছেন—যে প্রযুক্তিতে মাত্র ৫ সেকেন্ডে কণ্ঠস্বর নকল করা যায়, তার অপব্যবহারও কিন্তু হতে পারে। ইন্টারনেটে এখন দেদারসে তৈরি হচ্ছে ডিপফেক অডিও।

দেখা গেল, আপনার কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের গলার আওয়াজ নকল করে হ্যাকাররা আপনাকেই ফোন দিল। তারপর বলল, ‘আমি খুব বিপদে পড়েছি, আমাকে এখনই কিছু টাকা পাঠাও।’

ইন্টারনেটে এখন দেদারসে তৈরি হচ্ছে ডিপফেক অডিও
ছবি: সিএসআইআরও

আপনি গলার আওয়াজ শুনে বিশ্বাস করে টাকা পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু পরে জানা গেল, সেটা আদতে কোনো মানুষ ছিলই না, ছিল একটি এআই এজেন্ট!

এই কারণেই বিজ্ঞানীরা এখন এমন কিছু ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক বা এআই ডিটেক্টর তৈরি করছেন। সেটা কান দিয়ে শুনে বোঝা না গেলেও কম্পিউটারের কোড দিয়ে ধরে ফেলবে যে কণ্ঠটি আসল মানুষের নাকি এআই-এর তৈরি ক্লোন।

আরও পড়ুন
দেখা গেল, আপনার কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের গলার আওয়াজ নকল করে হ্যাকাররা আপনাকেই ফোন দিল। তারপর বলল, ‘আমি খুব বিপদে পড়েছি, আমাকে এখনই কিছু টাকা পাঠাও।’

যন্ত্রের চোখ ও মানুষের মন

কম্পিউটার এখন আমাদের দেখতে পাচ্ছে। আমাদের ভাষায় কথাও বলতে পারছে। এমনকি আমাদের কণ্ঠস্বরও ধারণ করতে পারছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন যে আমাদের জীবনকে অনেক বেশি সহজ করে দিচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে মনে রাখতে হবে, এআই যতই নিখুঁতভাবে আইনস্টাইন কিংবা আপনার নিজের গলায় কথা বলুক না কেন, সেই কথার পেছনের আসল আবেগ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সত্য-মিথ্যা বিচারের ক্ষমতা কিন্তু কেবল মানুষের মগজেই বাস করে। তাই এই প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, এর পেছনের বিজ্ঞানটা বুঝে একে আমাদের জ্ঞানচর্চার এক দারুণ হাতিয়ার বানিয়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য!

লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

সূত্র: এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ (মাল্টি-মোডাল আর্কিটেকচার রিপোর্ট) এবং ওপেনএআই ভয়েস ইঞ্জিন সিকিউরিটি হোয়াইটপেপার।

আরও পড়ুন