আজকাল স্মার্টফোনের চার্জ ফুরিয়ে গেলেই আমরা হন্যে হয়ে চার্জার খুঁজি। কিন্তু খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন বাংলাদেশের সব জায়গায় বিদ্যুৎ ছিল না। তখন প্রযুক্তি ছিল মূলত ব্যাটারিনির্ভর। রেডিও, টর্চলাইট চলত ব্যাটারির শক্তিতে। সেই সময় ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে গেলে আজকের মতো চার্জ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। দোকান থেকে নতুন ব্যাটারি কিনে আনাই ছিল একমাত্র উপায়। তাই ব্যাটারি যাতে আরেকটু বেশি দিন টেকে, তার জন্য নানা কসরত করা হতো।
ধীরে ধীরে সারা দেশে বিদ্যুৎ আসায় আমাদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন সুইচ টিপলেই আলো জ্বলে, ফ্যান ঘোরে। তবে আধুনিক জীবনে ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা কিন্তু ফুরায়নি, বরং বেড়েছে। আগের মতোই দেয়ালঘড়ি কিংবা টিভির রিমোটের ব্যাটারি যাতে আরেকটু বেশি দিন টেকে, তার জন্য এখনো নানা রকম চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রতিনিয়ত ব্যবহার করলেও ব্যাটারি আসলে ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে আমাদের ধারণা এখনো খুব বেশি পরিষ্কার নয়।
আর এই না জানার কারণেই ব্যাটারি নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে নানা রকম ভুল ধারণা। অনেকেরই বিশ্বাস, ফ্রিজে ব্যাটারি রাখলে তা অনেক দিন টেকে এবং চার্জ শেষ হয় ধীরে। আসলে এটা কি সত্যি, নাকি শুধুই প্রচলিত কোনো ভুল ধারণা?
আধুনিক জীবনে ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা কিন্তু ফুরায়নি, বরং বেড়েছে। আগের মতোই দেয়ালঘড়ি কিংবা টিভির রিমোটের ব্যাটারি যাতে আরেকটু বেশি দিন টেকে, তার জন্য এখনো নানা রকম চেষ্টা করা হয়।
সে প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া দরকার, ব্যাটারি আসলে কীভাবে কাজ করে। বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য আমরা এখানে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের মতো জটিল ব্যাটারি নিয়ে কথা বলব না। বরং আমাদের ঘরে প্রতিদিন ব্যবহৃত সাধারণ এএ (AA) ও এএএ (AAA) ব্যাটারিগুলো নিয়েই আলোচনা করব।
সহজ করে বললে, এটি এমন একটি বস্তু যা এর ভেতরে জমানো রাসায়নিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে বদলে দিতে পারে। এর ভেতরে থাকে তিনটি মূল অংশ। একটি ঋণাত্মক বা নেগেটিভ প্রান্ত অ্যানোড, একটি ক্যাথোড বা ধনাত্মক প্রান্ত। এদের মাঝখানে থাকে ইলেক্ট্রোলাইট নামে একটি বিশেষ পদার্থ।
ব্যাটারি কোনো রিমোট বা টর্চলাইটের সঙ্গে যুক্ত করলে ব্যাটারির ভেতরের উপাদানগুলোর মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এই বিক্রিয়ার ফলেই তৈরি হয় প্রচুর ইলেকট্রন। ইলেকট্রনগুলো যখন তারের ভেতর দিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটতে শুরু করে, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ তৈরি হয়। এভাবেই ছোট একটি ব্যাটারি আমাদের বড় বড় ডিভাইসগুলোকে সচল রাখে।
তবে ব্যাটারি যখন কোনো ডিভাইসে লাগানো থাকে না, তখনো এর ভেতর থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সেলফ-ডিসচার্জ। ফলে ব্যাটারিটি ব্যবহার না করলেও সময়ের সঙ্গে এটি নিজে নিজেই শক্তি বা চার্জ হারাতে থাকে।
ব্যাটারির ভেতরে থাকে তিনটি মূল অংশ। একটি ঋণাত্মক বা নেগেটিভ প্রান্ত অ্যানোড, একটি ক্যাথোড বা ধনাত্মক প্রান্ত। এদের মাঝখানে থাকে ইলেক্ট্রোলাইট নামে একটি বিশেষ পদার্থ।
এখন আসা যাক আসল কথায়। ব্যাটারি নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রচলিত অনেকগুলো ধারণার একটি হলো—ব্যবহৃত ব্যাটারি কিছু সময় ফ্রিজে রাখলে শক্তি বা কার্যকারিতা বেড়ে যায়। এই ধারণার পেছনে একটি যুক্তিও দেওয়া হয়। যুক্তিটি হলো, প্রচণ্ড ঠান্ডায় ব্যাটারির ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো ধীর হয়ে যায়। ফলে ব্যাটারি ব্যবহার না করলেও যে সামান্য পরিমাণ চার্জ নিজে নিজেই শেষ হয়, ঠান্ডার কারণে হয়তো সেই প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।
তবে গবেষণায় এই দাবির কোনো শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি বিশ্বের বড় বড় ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোও ব্যাটারি ফ্রিজে রাখার পক্ষপাতী নয়। বিখ্যাত ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কোম্পানি ডুরাসেল তাদের ওয়েবসাইটে পরিষ্কার জানিয়েছে, ফ্রিজে ব্যাটারি রাখলে এর আয়ু বা স্টোরেজ লাইফ মোটেও বাড়ে না। বরং ব্যাটারি ভালো রাখার সবচেয়ে সেরা উপায় হলো এগুলোকে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় শুকনো কোনো জায়গায় রাখা।
ফ্রিজে ব্যাটারি রাখলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। এর অন্যতম কারণ ঘনীভবন বা জলীয় বাষ্প জমে যাওয়া। আরেক বিখ্যাত ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কোম্পানি এনার্জাইজার বলছে, ফ্রিজের ভেতরের আর্দ্রতা বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ব্যাটারির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। ফ্রিজ থেকে ব্যাটারি বের করার পর এর গায়ে যে জলীয় বাষ্প জমে, তা থেকে ব্যাটারির ক্ষয় শুরু পারে। এমনকি এর সিল ফেটে গিয়ে ভেতরের রাসায়নিক লিক হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
ফ্রিজে ব্যাটারি রাখলে এর আয়ু বা স্টোরেজ লাইফ মোটেও বাড়ে না। বরং ব্যাটারি ভালো রাখার সবচেয়ে সেরা উপায় হলো এগুলোকে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় শুকনো কোনো জায়গায় রাখা।
তবে এর মানে এই নয় যে তাপমাত্রার কোনো ভূমিকা নেই। ব্যাটারিকে যদি চুলার পাশে কিংবা রোদে থাকা কোনো বদ্ধ ঘরে খুব গরম জায়গায় রাখা হয়, তবে এর আয়ু দ্রুত কমে যাবে। কেন এমন হয়? আসলে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ব্যাটারির ভেতরে থাকা রাসায়নিক উপাদানগুলো উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং এদের মধ্যকার বিক্রিয়ার গতি বেড়ে যায়। ফলে ব্যাটারিটি যখন ব্যবহার করা হচ্ছে না, তখনো ভেতরে ভেতরে দ্রুত রাসায়নিক শক্তি খরচ হতে থাকে। সহজ কথায়, অতিরিক্ত গরমে ব্যাটারি তার অভ্যন্তরীণ শক্তি ধরে রাখতে পারে না। ফলে ব্যাটারি শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়।
ব্যাটারি তৈরির সব কোম্পানিই একটি বিষয়ে একমত, ব্যাটারি ভালো রাখার সেরা উপায় সেগুলোকে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় শুকনো কোনো জায়গায় রাখা। ব্যাটারি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যালকালাইন ব্যাটারি সাধারণ তাপমাত্রায় রাখলে বছরে মাত্র ৩ শতাংশের মতো চার্জ হারায়; যা খুবই সামান্য। আর লিথিয়াম ব্যাটারিগুলো তো আরও কম চার্জ হারায়। তাই ব্যাটারি ফ্রিজে না রেখে ঘরের কোনো শুকনো ড্রয়ারে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।