একই অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান দুই এআইয়ের, জমা পড়ল তিন ঘণ্টার ব্যবধানে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পথিকৃৎ জন ম্যাকার্থি ব্ল্যাকবোর্ডে কাজ করছেনছবি: গেটি ইমেজ

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্নাতক শিক্ষার্থী সেয়ুন রাঘবন তার বন্ধু ইয়াও-টিং লিনকে একটি ইমেইল পাঠান। লিন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান্তা বারবারার ডক্টরাল শিক্ষার্থী। ইমেইলে যুক্ত ছিল কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির একদম নতুন একটি গাণিতিক প্রমাণ। কিন্তু লিন সঙ্গে সঙ্গে ইমেইলটি খুলে দেখতে পারেননি। কারণ তিনি তখন তার সুপারভাইজার অধ্যাপক প্রভঞ্জন অনন্তের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক সেই মিটিংয়ে বসেই লিন তার অধ্যাপকের মুখে ওই একই গাণিতিক প্রমাণের কথা শুনছিলেন! মিটিং শেষ হওয়ার পর লিন তার বন্ধু রাঘবনকে ইমেইলের জবাবে শুধু একটি কথাই লেখেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

ওই দিনই গবেষকরা আর্কাইভ ডটঅর্গ (arXiv.org) নামে প্রি-প্রিন্ট ওয়েবসাইটে দুটি আলাদা গবেষণাপত্র জমা দেন। একটির লেখক ছিলেন রাঘবন। অন্যটির লেখক অধ্যাপক অনন্ত এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক অমিত সাহাই। সবচেয়ে বড় চমকের জায়গাটি ছিল অন্যখানে—দুটি গবেষণাপত্রেই একটি নির্দিষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেটি হলো ওপেনএআইয়ের নতুন মডেল জিপিটি-৫.৬ সল আল্ট্রা। দুটি দলই পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, তাদের প্রমাণের মূল ধারণাগুলো এই এআই মডেলটিই বের করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন
সবচেয়ে বড় চমকের জায়গাটি ছিল অন্যখানে—দুটি গবেষণাপত্রেই একটি নির্দিষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেটি হলো ওপেনএআইয়ের নতুন মডেল জিপিটি-৫.৬ সল আল্ট্রা।

আপনি হয়তো ভাবছেন, এমন কাকতালীয় ঘটনা কীভাবে সম্ভব? আসলে এটি পুরোপুরি শূন্য থেকে ঘটেনি। সেই মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে অবস্থিত সাইমন্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য থিওরি অব কম্পিউটিংয়ে একটি আলোচনা সভা হয়েছিল। সেখানে রাঘবন এবং সাহাই উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই একটি অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যা সবার সামনে তুলে ধরা হয়। তারা দুজনেই আলাদাভাবে সমস্যাটি সমাধানের সিদ্ধান্ত নেন। মজার ব্যাপার হলো, তারা দুজনেই একই এআই মডেল ব্যবহার করেন, কিন্তু তাদের কাজের ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

এই গবেষণার মূল বিষয়টি হলো কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি বিশেষ শাখা, যাকে বলা হয় আনক্লোনাবল এনক্রিপশন। কোয়ান্টাম তথ্যের একটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণ ডেটার মতো একে কখনো হুবহু কপি বা প্রতিলিপি করা যায় না। এই এনক্রিপশনের মূল লক্ষ্য হলো, কোনো সংবেদনশীল বার্তাকে এমনভাবে গোপন করা, যেন কেউ এটি হাতে পেলেও ডিক্রিপ্ট করার চাবি দিয়ে সেটিকে দুটি ব্যবহারযোগ্য অংশে ভাগ করতে না পারে।

২০১৯ সালে কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান ব্রডবেন্ট এবং তার তৎকালীন ছাত্র সেবাস্টিয়েন লর্ড এই আনক্লোনাবল এনক্রিপশনের একটি আধুনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে এটি করা সম্ভব, কিন্তু সেই পদ্ধতিগুলো তেমন কার্যকর ছিল না অথবা নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু নতুন এই দুটি গবেষণাপত্র দাবি করেছে যে, কোনো রকম শর্ত বা অনুমান ছাড়াই এই এনক্রিপশনের একটি কার্যকর সংস্করণ এখন তৈরি করা সম্ভব।

আরও পড়ুন
২০১৯ সালে কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান ব্রডবেন্ট এবং তার তৎকালীন ছাত্র সেবাস্টিয়েন লর্ড এই আনক্লোনাবল এনক্রিপশনের একটি আধুনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন।

রাঘবন কয়েক বছর আগেই এই সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই সাইমন্স ইনস্টিটিউটের আলোচনায় যখন তিনি দেখলেন সমস্যাটি এখনো অমীমাংসিত, তখন তিনি বেশ অবাক হন। তিনি যেহেতু নিজের গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে কাজ করছিলেন, তাই তিনি জিপিটি-৫.৬ সল আল্ট্রাকে এই কাজে লাগিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

রাঘবন বেশ সরাসরি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ওপেনএআইয়ের এই আল্ট্রা সিস্টেমে ডিফল্টভাবে চারটি এআই এজেন্ট একসঙ্গে কাজ করে। রাঘবন সিস্টেমটিকে দুই ঘণ্টার জন্য কাজ করতে দেন। প্রতিটি বিরতির পর তিনি নিজে এআইয়ের অগ্রগতি যাচাই করতেন এবং প্রয়োজনে নতুন নির্দেশনা দিয়ে পথে ফেরাতেন। কয়েক ধাপের পর এআই সিস্টেমটি এমন একটি প্রমাণ দাঁড় করায়, যা রাঘবনের কাছে একদম নির্ভুল মনে হয়। এআইয়ের দেওয়া কাঁচা খসড়াটি গুছিয়ে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র তৈরি করেন।

অন্যদিকে, অনন্ত এবং সাহাই একই এআই মডেল ব্যবহার করলেও তাদের কৌশল ছিল ভিন্ন। তারা সরাসরি এআইয়ের সঙ্গে ধাপে ধাপে কথা বলার বদলে UCLA-এর তৈরি করা একটি বিশেষ সিস্টেম ব্যবহার করেন। এই সিস্টেমটি এআই মডেলগুলোকে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজতে এবং নিজেরাই সেই সমাধানের সমালোচনা করতে সাহায্য করে। তাদের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এআই মডেলটি মূল প্রমাণ এবং কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে, আর গবেষকেরা কেবল সেটি যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করেছেন।

আরও পড়ুন
রাঘবন বেশ সরাসরি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ওপেনএআইয়ের এই আল্ট্রা সিস্টেমে ডিফল্টভাবে চারটি এআই এজেন্ট একসঙ্গে কাজ করে। রাঘবন সিস্টেমটিকে দুই ঘণ্টার জন্য কাজ করতে দেন।

সময়ের হিসাবটা শুনলে আপনি আরও বেশি বিস্মিত হবেন। অনন্ত এবং সাহাই প্যাসিফিক সময় সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আর্কাইভে তাঁদের গবেষণাপত্র জমা দেন। ঠিক তিন ঘণ্টা ১৮ মিনিট পর রাঘবন তার গবেষণাপত্রটি জমা দেন। লিন যখন এই অদ্ভুত মিলটি ধরতে পারেন এবং দুই পক্ষকে যোগাযোগ করিয়ে দেন, তখনো কোনো গবেষণাপত্রই সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়নি। পরবর্তীতে তারা দুটি গবেষণাপত্রকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

দ্রুত পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের জগতে দুটি দলের একই ফলাফলের দিকে ছুটে চলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু দুই পক্ষকে একই গন্তব্যে পৌঁছাতে একই এআইয়ের সাহায্য নেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। রাঘবন বলেন, ‘এই অল্প সময়ের হিসাবটা একেবারে পাগলামি। এই ধারণাটি মাথায় আসার পর থেকে মাত্র দুই সপ্তাহ এক দিন সময় লেগেছে!’

অধ্যাপক অনন্ত অবশ্য এই মিল দেখে মোটেও অবাক হননি। তার মতে, এখন বিজ্ঞানীদের সাধারণ মানসিকতা হলো—কেউ কোনো অমীমাংসিত সমস্যার কথা বললেই প্রথমে দেখা হয় জিপিটি এটি সমাধান করতে পারে কি না।

আরও পড়ুন
অনন্ত এবং সাহাই প্যাসিফিক সময় সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আর্কাইভে তাঁদের গবেষণাপত্র জমা দেন। ঠিক তিন ঘণ্টা ১৮ মিনিট পর রাঘবন তার গবেষণাপত্রটি জমা দেন।

তবে এই ঘটনাটি বিজ্ঞানের জগতে নতুন কিছু দুশ্চিন্তারও জন্ম দিয়েছে। অধ্যাপক অ্যান ব্রডবেন্ট ফলাফল দেখে সন্তুষ্ট হলেও বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। তিনি জানান, ‘যে ধরনের কাজগুলো এখন এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে দিচ্ছে, সেই কাজগুলো সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি শিক্ষার্থীদের দেওয়া হতো।’ অধ্যাপক অনন্তও একই শঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি খুশি যে আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়েছে। তবে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আমি সত্যিই চিন্তিত।’

রাঘবন নিজে একজন তৃতীয় বর্ষের পিএইচডি শিক্ষার্থী হয়েও এই অস্থিরতা অনুভব করছেন। তবে তিনি দ্রুত বদলে যাওয়া এই গবেষণার দুনিয়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ারই পক্ষপাতী। তিনি বলেন, ‘আমি এখন যেভাবে গবেষণা করছি, দুই মাস আগেও সেভাবে করতাম না। অনুভূতিটা অদ্ভুত, কিন্তু আপনাকে এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।’

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন