৪৩ কোটি বছর আগের এক খুদে মাছে উন্মোচিত হলো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের নতুন রহস্য

ছবি: নাইস প্যালিওভিসল্যাব/আইভিপিপি

আকারে মাত্র ৩ সেন্টিমিটার। আমাদের আঙুলের একটি করের সমান! অথচ এই ছোট্ট একটি মাছের জীবাশ্মই এখন বিজ্ঞানীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ চীনে পাওয়া এই প্রাচীন জীবাশ্মটি মেরুদণ্ডী প্রাণীদের আদি ইতিহাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি অ্যান্ড প্যালিওঅ্যানথ্রোপলজির একদল গবেষক এই যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক মিন ঝু, জিং লু এবং ইউয়ান ঝু। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এর প্রচ্ছদে পরপর দুটি নিবন্ধে তাঁদের এই চমকপ্রদ গবেষণার কথা ছাপা হয়েছে।

এই আবিষ্কারটি মূলত বোনি ফিশের প্রাচীন ইতিহাস জানতে সাহায্য করছে। আজ আমরা নদী বা সাগরে যত ধরনের মাছ দেখি, তার প্রায় সবই এই অস্থিময় মাছের দলের অংশ। পৃথিবীতে বর্তমানে এদের প্রায় ৩০ হাজার প্রজাতি রয়েছে।

কিন্তু একদম শুরুর দিকে এই মাছগুলো দেখতে কেমন ছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেক ধোঁয়াশা ছিল। কারণ এত প্রাচীনকালের সম্পূর্ণ জীবাশ্ম এর আগে খুব একটা পাওয়া যায়নি। ফলে আধুনিক এই মাছগুলোর আদি উৎস সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে খুব স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না।

আরও পড়ুন
আজ আমরা নদী বা সাগরে যত ধরনের মাছ দেখি, তার প্রায় সবই এই অস্থিময় বোনি ফিশের দলের অংশ। পৃথিবীতে বর্তমানে এদের প্রায় ৩০ হাজার প্রজাতি রয়েছে।

টানা দশ বছরের বেশি সময় ধরে মাঠপর্যায়ে এবং ল্যাবরেটরিতে কাজ করার পর গবেষকেরা এই অজানা রহস্যের জট খুলেছেন। তাঁরা এমন দুটি বড় আবিষ্কার করেছেন, যা প্রাচীন মাছের শারীরিক গঠনের এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের প্রথম বড় আবিষ্কারটি হলো ইওস্টিয়াস চংকিংয়েনসিস (Eosteus chongqingensis) নামে একটি মাছের জীবাশ্ম। চীনের চংকিং শহরের শিউশান এলাকার আদি শিলাস্তরে এটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি আজ থেকে প্রায় ৪৩ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের জীবাশ্ম! আর এটিই হলো বিশ্বের বুকে খুঁজে পাওয়া অস্থিময় মাছের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সম্পূর্ণ জীবাশ্ম।

এত প্রাচীন হওয়া সত্ত্বেও জীবাশ্মটি অবিশ্বাস্যভাবে ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত পুরো শরীরটাই এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। এর শরীরটা ছিল বেশ ছিপছিপে। আধুনিক মাছের মতো এর পিঠে একটি পাখনা আছে। আবার এর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা সাধারণত অস্থিময় মাছের বদলে হাঙরের মতো তরুণাস্থিময় মাছের মধ্যে দেখা যায়। সব মিলিয়ে এই জীবাশ্মটি প্রাচীন প্রাণীদের শারীরিক গঠনের অনেক অজানা তথ্য সামনে নিয়ে এসেছে।

গবেষকদের দ্বিতীয় আবিষ্কারটি হলো মেগামাস্ট্যাক্স অ্যামব্লিওডাস (Megamastax amblyodus) নামে আরেকটি মাছ। এটি পাওয়া গেছে চীনের ইউনান প্রদেশের কুজিং এলাকায়। এটি আজ থেকে প্রায় ৪২ কোটি ৩০ লাখ বছর আগের।

আরও পড়ুন
চীনের চংকিং শহরের শিউশান এলাকার আদি শিলাস্তরে ইওস্টিয়াস চংকিংয়েনসিস মাছের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি আজ থেকে প্রায় ৪৩ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের জীবাশ্ম!

প্রথম মাছটি খুদে হলেও এটি ছিল সেই আমলের বিশাল দানব! লম্বায় এটি ১ মিটারেরও বেশি হতো। ওই সময়ের সবচেয়ে বড় মেরুদণ্ডী প্রাণী ছিল এটি। বিজ্ঞানীরা এই মেগামাস্ট্যাক্সের মাথার খুলি এবং দাঁতের ভেতরের গঠন বোঝার জন্য আধুনিক থ্রিডি স্ক্যানিং প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছেন।

এর ফলে তাঁরা এর চোয়ালের নিখুঁত গঠন দেখতে পান। এর দাঁতগুলো ভেতরের এবং বাইরের দুই সারিতে সুন্দরভাবে সাজানো ছিল। এই আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীদের একটি পুরোনো সমস্যার দারুণ সমাধান হয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাল্টিক অঞ্চলে পাওয়া কিছু প্রাচীন দাঁতের জীবাশ্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তুমুল তর্কবিতর্ক চলছিল। মেগামাস্ট্যাক্সের দাঁতের এই গঠনের সঙ্গে মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা অবশেষে সেই পুরোনো রহস্যের জট খুলতে পেরেছেন এবং ওই প্রাচীন দাঁতগুলোকে সঠিকভাবে শ্রেণিবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন।

এই দুটি যুগান্তকারী আবিষ্কারে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে। প্রাচীনকালে দক্ষিণ চীন অঞ্চলটি মেরুদণ্ডী প্রাণী এবং অস্থিময় মাছের উৎপত্তির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ৪৩ কোটি বছর আগের এই জীবাশ্মগুলো আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাস কতটা বৈচিত্র্যময় এবং রহস্যে ঘেরা ছিল।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সাইটেক ডেইলি

আরও পড়ুন