ফুটবলের অন্ধ ভক্ত হলে শরীরে যেসব সমস্যা হতে পারে
২০১৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সময় একটি পেনাল্টি কিক মিস হওয়ার পর, চিলির ৫৮ বছর বয়সী এক ফুটবল ভক্ত তীব্র হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। এর কিছুক্ষণ পরেই তাঁর স্ত্রীর বুকেও প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে হওয়া হৃদরোগে আক্রান্ত। ম্যাচের চরম উত্তেজনা আর স্বামীর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়া ধাক্কা সহ্য করতে না পারায় তার হার্টের একটি অংশ সাময়িকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল।
অবশ্য সাধারণ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এমন মারাত্মক ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বেশ কম। তবে তার মানে এই নয় যে ফুটবল খেলা দেখার কোনো শারীরিক প্রভাব নেই। গবেষণা বলছে, খেলা দেখার সময় আমাদের শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যা সবসময় বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক ম্যাট বাটলার সম্প্রতি ফুটবল ভক্তদের আচরণ ও মস্তিষ্কে প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, ফুটবল খেলা দেখা মানেই শুধু অলস বসে থাকা নয়। মাঠে যখন প্রিয় দলের খেলোয়াড়েরা ঘাম ঝরান, তখন গ্যালারি বা টিভির সামনে থাকা দর্শকদের মন আর শরীরও ঠিক একইভাবে সাড়া দেয়। যেন তারা নিজেরাই মাঠে খেলছেন।
দলের প্রতি ভালোবাসা যত বাড়ে, শরীরের ওপর এর প্রভাবও তত বেশি হয়। কট্টর সমর্থকেরা প্রিয় দলের ভালো-মন্দের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে এমনভাবে মিলিয়ে ফেলেন যে দলের জয়-পরাজয়কে তারা একদম ব্যক্তিগতভাবে নেন। আর এই অতিরিক্ত আবেগের কারণেই তাদের শরীর ও মনে অনেক বেশি মানসিক চাপ তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয় দলের খেলা শুরু হওয়ার প্রায় ১৪ ঘণ্টা আগে থেকেই সমর্থকদের শরীরে মানসিক চাপের মাত্রা আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে।
হুট করে মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়া
২০১২ সালে বিজ্ঞানীরা একটি গবেষণা চালিয়েছিলেন স্পেনের ফুটবল ভক্তদের ওপর। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ যখন চলছিল, তখন খেলা দেখার সময় ভক্তদের শরীরে ‘কর্টিসল’ নামের স্ট্রেস হরমোন বা মানসিক চাপের হরমোন অনেক বেশি মাত্রায় তৈরি হয়েছিল। সাধারণ দিনের তুলনায় এই হরমোনের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে পুরুষ, তরুণ ও যারা প্রিয় দলের চরম ভক্ত, তাদের শরীরে এই হরমোনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে কাজ করে সামাজিক আত্মরক্ষা নামের একটি মানসিক বিষয়। মানুষের মনের ভেতর সবসময় একটি গভীর ইচ্ছা থাকে, যাতে সবাই তাকে ভালো চোখে দেখে এবং সে নিজে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।
কিন্তু যখনই এই অনুভূতি কোনো হুমকির মুখে পরে মস্তিষ্ক বিষয়টিকে একটি শারীরিক বিপদের মতো মনে করে। ফলে শরীর নিজেকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা মানসিক চাপ অনেক বাড়িয়ে দেয়।
খেলার মাঠের এই উত্তেজনা ও মানসিক চাপ কিন্তু শুধু ম্যাচের ৯০ মিনিটের মধ্যেই আটকে থাকে না। গবেষকেরা জার্মানির একটি ফুটবল দলের সমর্থকদের শরীরে স্মার্টওয়াচ বেঁধে টানা ১২ সপ্তাহ ধরে তাদের স্বাস্থ্যের তথ্য পরীক্ষা করেছিলেন। সেখানে দেখা গেছে, প্রিয় দলের খেলা শুরু হওয়ার প্রায় ১৪ ঘণ্টা আগে থেকেই সমর্থকদের শরীরে মানসিক চাপের মাত্রা আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে।
২০১০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ যখন চলছিল, তখন খেলা দেখার সময় ভক্তদের শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন বা মানসিক চাপের হরমোন অনেক বেশি মাত্রায় তৈরি হয়েছিল।
হৃৎপিণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ
মানসিক চাপের সময় শরীরে অ্যাড্রেনালিন ও অন্য কিছু হরমোন খুব বেড়ে যায়। এগুলো আমাদের হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। ফলে হৃৎপিণ্ডের সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু একই সময়ে এই হরমোনগুলো হৃৎপিণ্ডের রক্তনালীকে চিকন করে ফেলে অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়। একদিকে অক্সিজেনের বাড়তি চাহিদা আর অন্যদিকে কম সরবরাহ, এই দুইয়ের ভারসাম্য নষ্ট হলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
বিভিন্ন দেশের গবেষণা এই তথ্যকে প্রমাণ করেছে। ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপের সময় উত্তেজনাকর ম্যাচ দেখার দিনে দর্শকদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড যখন আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায়, তখন ম্যাচ দেখার দিনে ও পরের দুই দিনে ইংল্যান্ডে হার্ট অ্যাটাকের কারণে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। আবার স্পেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষের আগে থেকেই হার্টের সমস্যা ছিল, তাদের প্রিয় দল হেরে যাওয়ার দিনে হৃদরোগের কারণে হাসপাতালে যাওয়ার হার ৩০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।
গবেষকরা এ নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হতে নিষেধ করেছেন। খেলা দেখলে হৃদরোগের ঝুঁকি কিছুটা বাড়ে ঠিকই, তবে সাধারণ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি এমনিতেই অনেক কম থাকে। তাই বেশিরভাগ দর্শকের জন্য খেলা দেখা সরাসরি বড় কোনো বিপদের কারণ নয়।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড যখন আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায়, তখন ম্যাচ দেখার দিনে ও পরের দুই দিনে ইংল্যান্ডে হার্ট অ্যাটাকের কারণে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার ২৫ শতাংশ বেড়েছিল।
ঘুমের অভাব ও গাড়ি দুর্ঘটনা
ভিন্ন দেশে খেলা হওয়ার কারণে যখন সময়ের পার্থক্যের জন্য গভীর রাত বা ভোরে জেগে খেলা দেখতে হয়, তখন শরীরে এর বড় প্রভাব পরে।
২০০২ সালের এশিয়া বিশ্বকাপের খেলাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের মাঝরাতে বা ভোরে দেখতে হতো। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব শহরে জার্মান বংশোদ্ভূত মানুষ বেশি ছিল, সেখানে জার্মানির খেলার দিনগুলোতে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। যেখানে জার্মানদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল, সেখানে দুর্ঘটনার হার বেড়েছিল ১২২ শতাংশ।
পরবর্তী বিশ্বকাপে খেলাগুলো স্বাভাবিক সময়ে সম্প্রচার হওয়ায় গাড়ি দুর্ঘটনার এমন বাড়তি হার আর দেখা যায়নি। এ থেকে স্পষ্ট রাত জেগে খেলা দেখার কারণে তৈরি হওয়া ঘুমের অভাবই ছিল ওই দুর্ঘটনাগুলোর মূল কারণ।
গবেষকরা জানান, মাত্র এক রাতের ঘুমের ঘাটতিও মানুষের মনোযোগ ও চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই গভীর রাত জেগে খেলা দেখার পর গাড়ি চালানোর সময় চালকদের অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমেরিকার যেসব শহরে জার্মান বংশোদ্ভূত মানুষ বেশি ছিল, সেখানে জার্মানির খেলার দিনগুলোতে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।
ফুটবল ছাড়াও অন্যান্য খেলার প্রভাব
শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলা দেখার সময়ও দর্শকদের হৃদযন্ত্র ও শরীরে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
তবে ফুটবলের ক্ষেত্রে এই মানসিক ও শারীরিক চাপ অন্য খেলার চেয়ে বেশি তীব্র হয়। এর কারণ হলো ফুটবলে গোলের সংখ্যা সাধারণত খুব কম থাকে। তাই প্রতিটি গোল ভক্তদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের হয়ে ওঠে।
যেহেতু এই খেলায় গোল কম হয়, তাই অন্যান্য খেলার চেয়ে ফুটবলে ভাগ্যের ভূমিকাও অনেক বেশি থাকে। এখানে অনেক সময় ভালো দলও হেরে যেতে পারে, আবার দুর্বল দলও হুট করে বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে। আর এই অনিশ্চয়তার কারণেই ফুটবল খেলা দেখা এত বেশি উত্তেজনা, মানসিক চাপ আর আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই গবেষকরা পরামর্শ দেন, পরের বার যখন প্রিয় দলের খেলা দেখবেন তখন মনে রাখবেন এটি শেষ পর্যন্ত কেবলই একটি খেলা।