এআই যুগে ফুটবল বিশ্বকাপ
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে বহু কারণে। তিন দেশ মিলে আয়োজন করা এই বিশ্বকাপ হতে চলেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। বড় আয়োজন মানে ভুল হওয়ার আশঙ্কাও বেশি। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রত্যেক মানুষের চোখ থাকবে মাঠে বন্দী। সেখানে পান থেকে চুন খসার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। ফলে মাঠের খেলা নিখুঁত করতে ফিফা এবারও হাজির হয়েছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি নিয়ে। গত বিশ্বকাপকে বলা হয়েছিল প্রযুক্তির বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপ সেটিকে ছাড়িয়ে পা দিয়েছে এআই যুগে।
আগে দেখা যেত, অফসাইড চেক করতে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড সময় লেগে যেত। এতে খেলার ফ্লো নষ্ট হয়ে যেত। নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ার পর সেই সময়টা নেমে এসেছে মিলিসেকেন্ডে।
সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি
গত বছরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে উইদাদ ও আল আইনের মধ্যকার ম্যাচে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। সামান্য অফসাইডের কারণে একটি গোল বাতিল করেছিলেন রেফারি। কিন্তু সেই অফসাইড না লাইনসম্যান ধরতে পেরেছেন, না ভার্চ্যুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি চেক করে বুঝতে পেরেছেন। সরাসরি রেফারির কানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, খেলোয়াড়টি অফসাইডে ছিলেন। সেই টুর্নামেন্টেই প্রথম সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিতে এআই ব্যবহার করা হয়েছিল।
সেমি-অটোমেটেড বা অর্ধস্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছিল গত বিশ্বকাপেই। অতি অল্প সময়ে নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেত এই প্রযুক্তির সাহায্যে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য মাঠের চারপাশে ১২টি করে ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ক্যামেরাগুলোর সাহায্যে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের শরীরের ২৯টি স্থানের অবস্থান চিহ্নিত করা যায়। প্রতি মিনিটে ৫০ বার পর্যন্ত রেকর্ড করা যায় খেলোয়াড়দের অবস্থান ও দৈহিক ভঙ্গি। সেখান থেকেই তৈরি করা হয় খেলোয়াড়দের ত্রিমাত্রিক অবয়ব। বলের ভেতরে থাকা প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। বলের প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার পর্যন্ত কিক পয়েন্ট ও অবস্থান রেকর্ড করা যায়। আগের সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি সব তথ্য পাঠাত ভিডিও অপারেশন রুমে। সেখান থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে নির্ধারণ করা হতো অফসাইড। সেটি দেখে মাঠে সিদ্ধান্ত জানাতেন রেফারি।
কিন্তু নতুন প্রযুক্তির আগমনে এই চিন্তাও দূর হয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এটি অফসাইড হয়েছে কি হয়নি। যদি অফসাইড হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সেই তথ্য পাঠিয়ে দেবে লাইনসম্যানের কানে। শুধু লাইনসম্যান নয়, সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও অপারেশন রুমেও সে তথ্য পাঠাবে। রেফারির কোনো সন্দেহ থাকলেই কেবল তিনি ভিএআর চেক করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবেন। আগে দেখা যেত, অফসাইড চেক করতে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড সময় লেগে যেত। এতে খেলার ফ্লো নষ্ট হয়ে যেত। নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ার পর সেই সময়টা নেমে এসেছে মিলিসেকেন্ডে। ফলে রেফারির কষ্ট যেমন কমল, দর্শকদেরও উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে আবার আশাহত হওয়ার সম্ভাবনাও কমল। তবে সিদ্ধান্ত বদলানোর ক্ষেত্রে রেফারিকে ঠিকই আগের মতো ভিএআর চেক করতে হবে।
বলের ভেতরে থাকা প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। বলের প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার পর্যন্ত কিক পয়েন্ট ও অবস্থান রেকর্ড করা যায়।
খেলোয়াড়দের বডি স্ক্যান
সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিতে যা যা ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দিয়ে আপনা–আপনি প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ত্রিমাত্রিক অবয়ব তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেটি এত দিন কাজে লেগেছে শুধু অফসাইড দেখার জন্যই। এবার ফিফা সেখানে আর সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং মাঠের প্রতিটি প্রান্তে যেখানেই খেলোয়াড়েরা আনাগোনা করবেন, সেখানেই তাঁদের স্ক্যান করা হবে। এত দিন পর্যন্ত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিতে খেলোয়াড়দের অবয়ব দেখতেন না কেউ। বরং একটি ধূসর মানব অবয়ব এবং সঙ্গে একটি জার্সি তৈরি করা হতো। এবার থেকে তা হচ্ছে না। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আলাদা করে স্ক্যান করা হবে। এতে যে খেলোয়াড়কেই ত্রিমাত্রিক দেখানো হোক না কেন, তাঁকে যেন আলাদা করে বোঝা যায়।
কারণটা শুধু দর্শকদের বোঝার জন্য নয়। প্রত্যেক মানুষই শারীরিক গঠনে একে অপরের চেয়ে আলাদা। প্রত্যেকের জন্যই যদি লম্বা ও চওড়ায় মিল রাখা একজন ধূসর মানবকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ঠিক মানানসই হয় না। সে কারণে ফিফা প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আলাদা করে স্ক্যান করে তাঁদের ত্রিমাত্রিক অবয়ব তৈরি করতে চাইছে।
এত দিন পর্যন্ত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিতে খেলোয়াড়দের অবয়ব দেখতেন না কেউ। বরং একটি ধূসর মানব অবয়ব এবং সঙ্গে একটি জার্সি তৈরি করা হতো। এবার থেকে তা হচ্ছে না।
ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও আইপিএলে যেমন প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নির্দিষ্ট কোমরের উচ্চতা মাপা হয়, যাতে নো বল নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে। একইভাবে ফিফাও চাইছে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ঠিকঠাক ত্রিমাত্রিক অবয়ব তৈরি করতে, যাতে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঠিক অবয়ব তৈরি করা যায় এবং অফসাইড থেকে শুরু করে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সিদ্ধান্তও সহজে নেওয়া সম্ভব হয়।
বর্তমানে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তাতে ৩০টি ক্যামেরা থাকে। এটি বলের অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি একজন খেলোয়াড়ের অবস্থানসংক্রান্ত সর্বোচ্চ ১০ হাজার ডেটা পয়েন্ট ট্র্যাক করতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ট্র্যাক করা সম্ভব হয় না বলে গ্রাফিক্যাল মডেলের সঙ্গে খেলোয়াড়ের প্রকৃত শারীরিক গঠন পুরোপুরি মেলে না। যে কারণে ভুলও থেকে যায়। বিশেষ করে লাফিয়ে ওঠা খেলোয়াড়কে ঠিকঠাক ট্র্যাক করতে পারে না এই প্রযুক্তি।
বিশ্বকাপে তাই সে চিন্তা থাকছে না। পুরো বডি স্ক্যানের কাজটি করবে লেনোভো। তারা প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড স্ক্যান করে তাঁদের একটি ত্রিমাত্রিক অবয়ব তৈরি করবে। অফসাইড কিংবা গোলের সময় শুধু ফুটেজ নয়, থ্রিডিতেও দেখা যাবে পুরো রিপ্লে।
বড় বড় দল সাধারণত বিশাল প্যানেল নিয়ে বিশ্বকাপে আসে। তাদের সঙ্গে থাকেন অ্যানালিস্ট বা বিশ্লেষকেরা, যাঁরা প্রতিপক্ষের প্রতিটি মুভমেন্ট, প্রতিটি ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারেন।
তথ্য এবার সবার জন্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে শুধু খেলোয়াড়দের মুভমেন্টই ধরে রাখবে, তা কিন্তু নয়। চায়নিজ টেক কোম্পানি লেনোভোর সঙ্গে মিলে ফিফা নিয়ে এসেছে ফুটবল এআই প্রো। এটি অনেকটা ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি কিংবা মাইক্রোসফটের কো–পাইলটের মতো কাজ করবে। এটি মূলত একটি অ্যাডভান্সড ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, যা প্রতিটি ম্যাচ ও খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ করবে।
কয়েক বছর ধরে লেনোভোর সঙ্গে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন বিখ্যাত ফুটবল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার। ফুটবল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, গোল, ইতিহাস ও পারফরম্যান্সের ডেটা দিয়ে ফুটবল এআই প্রো তৈরি করেছেন তাঁরা। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বিশ্বকাপে আনার কারণ একটাই—সব দলের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা।
বড় বড় দল সাধারণত বিশাল প্যানেল নিয়ে বিশ্বকাপে আসে। তাদের সঙ্গে থাকেন অ্যানালিস্ট বা বিশ্লেষকেরা, যাঁরা প্রতিপক্ষের প্রতিটি মুভমেন্ট, প্রতিটি ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু তুলনামূলক ছোট দলগুলোর কাছে সেই সুযোগ থাকে না।
বরং তাদের নির্ভর করতে হয় পুরোনো ফুটেজ কিংবা অন্যান্য তথ্যের ওপর। ফিফা আর সেই সুযোগ দিচ্ছে না, বরং তৈরি করছে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। এতে প্রতিটি দেশের কোচিং স্টাফ একই ডেটা ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন।
প্রতিটি দল নিজেদের নিজস্ব এআই মডেল পাবে। সেই মডেল, ভিডিও ক্লিপ ও থ্রিডি অ্যাভাটারের মাধ্যমে যেমন নিজেদের খেলোয়াড়দের বিশ্লেষণ করা যাবে, তেমনই প্রতিপক্ষের খেলার ধরন বিশ্লেষণ করতে পারবেন। কোচরা বুঝতে পারবেন, বদলে যাওয়া পরিকল্পনা মাঠে কতটা কার্যকর হতে পারে। খেলোয়াড়েরাও এআই দিয়ে নিজের দুর্বলতা খুব ভালোভাবে আন্দাজ করতে পারবেন।
আপাতত কোচ ও স্টাফদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের জন্যও এটিকে উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা আছে ফিফার। এতে মাঠের লড়াইয়ে কোন খেলোয়াড় কী করলেন, তা আতশি কাচের নিচে নিয়ে দেখার সুযোগ পাবেন সবাই।
চায়নিজ টেক কোম্পানি লেনোভোর সঙ্গে মিলে ফিফা নিয়ে এসেছে ফুটবল এআই প্রো। এটি অনেকটা ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি কিংবা মাইক্রোসফটের কো–পাইলটের মতো কাজ করবে।
বিশ্বকাপের অন্যান্য প্রযুক্তি
এসবের পাশাপাশি তিন দেশের ১৬টি মাঠে থাকছে ডিজিটাল টুইন সিস্টেম। সেখানে একনজরে দেখা যাবে স্টেডিয়ামের প্রতিটি তথ্য। রিয়েল টাইমে দেখা যাবে দর্শকের ঢল, নিরাপত্তার ঝুঁকি, এমনকি খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যও। সানডিস্কের হিসাব অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ থেকে ৯০ পেটাবাইটের বেশি তথ্য তৈরি হবে, যা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তৈরি হওয়া তথ্যের প্রায় ৪৫ গুণ। ব্যাংক অব আমেরিকার ধারণা, মোট ডেটার পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ২ এক্সাবাইটে, মানে ১-এর পর ১৮টি শূন্য।
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে অবাক করা প্রযুক্তি হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় রোবটের চালানো গাড়ি, যা যাতায়াতব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
সানডিস্কের হিসাব অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ থেকে ৯০ পেটাবাইটের বেশি তথ্য তৈরি হবে, যা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তৈরি হওয়া তথ্যের প্রায় ৪৫ গুণ।
বিশ্বকাপের বল
এবারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বলের নাম ত্রিওনদা। স্প্যানিশ শব্দ ত্রিওন্দা মূলত দুটি শব্দের মিশেল। ত্রিও অর্থ তিন আর ওন্দা মানে ঢেউ। অর্থাৎ তিনটি ঢেউ। লাল, নীল ও সবুজ; তিন রঙের ঢেউ দিয়ে বোঝানো হয়েছে আয়োজক তিন দেশকে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে আগের বলগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে ত্রিওন্দা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা অ্যানালাইসিসের বড় একটি অংশ কাজ করবে বলের ভেতর থেকে। ক্রীড়াপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের তৈরি করা বলে থাকছে কানেক্টেড বল প্রযুক্তি, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট সেন্সর। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার পর্যন্ত বলের কিক পয়েন্ট ও অবস্থান রেকর্ড করা যায়।
ফলে অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির সঙ্গে মিলে এই প্রযুক্তি কাজ করবে। শুধু তা-ই নয়, বলের সঙ্গে হওয়া প্রতিটি স্পর্শ বোঝা যাবে এই সেন্সর থেকে। ফলে পায়ের স্পর্শ থেকে হাতের স্পর্শ সহজেই আলাদা করা যাবে। হ্যান্ডবল নিয়েও আলাদা চিন্তা থাকবে না।
বিশ্বকাপের বলে কমিয়ে আনা হয়েছে প্যানেলের সংখ্যা। সাধারণত একটি বলে ১২ থেকে ৩২টি পর্যন্ত প্যানেল থাকতে পারে। প্রতিটি প্যানেল সেলাই করে তৈরি করা হয় বল। অর্থাৎ যত কম প্যানেল, তত মসৃণ বল। আর বল যত মসৃণ, তত বেশি সমস্যা। এবারের বিশ্বকাপের বল তৈরি করা হয়েছে মাত্র ৪টি প্যানেল দিয়ে। ফলে ২০১০ বিশ্বকাপের জাবুলানি বলের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল অনেকের।
সাধারণত একটি বলে ১২ থেকে ৩২টি পর্যন্ত প্যানেল থাকতে পারে। প্রতিটি প্যানেল সেলাই করে তৈরি করা হয় বল। অর্থাৎ যত কম প্যানেল, তত মসৃণ বল। আর বল যত মসৃণ, তত বেশি সমস্যা।
সে কারণে ইউনিভার্সিটি অব সুকুবার গবেষকেরা দীর্ঘ গবেষণা করেছেন বিশ্বকাপের বল নিয়ে। ২০ বছর ধরে বিশ্বকাপের প্রতিটি বল নিয়ে আলাদা করে গবেষণা করছেন তাঁরা। সেই গবেষণাই বলছে, এবারের বল বিচিত্র কর্মকাণ্ড করার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। সাধারণত বল যদি বেশি মসৃণ হয়, তাহলে বাতাসে যেমন অনেক সময় ধরে ভেসে থাকে, তেমনি বলের গতিপথও পরিবর্তন হয়ে যায়। ২০১০ বিশ্বকাপের জাবুলানি বল যে কারণে খুব অদ্ভুত আচরণ করত। দূরপাল্লার শটে বল গোলরক্ষকের সামনে গিয়ে পথ পরিবর্তন করে ফেলত। এমনও দেখা গেছে, শট নেওয়া হয়েছে খুবই আস্তে, কিন্তু বাতাসে ভেসে তার গতি বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। জাবুলানি বলের সমস্যার কারণে গোলরক্ষকদের যেমন বেগ পেতে হয়েছে, তেমনি দূরপাল্লার শট নেওয়া খেলোয়াড়দের অনেক সুবিধাও হয়েছে। সেই বলে প্যানেল ছিল মাত্র ৮টি।
কিন্তু এবার ৪টি প্যানেল নিয়েও বল ঠিকঠাক কাজ করছে কীভাবে? কারণ, এবারের বলে প্যানেল চারটি থাকলেও বল একেবারে মসৃণ নয়। বরং বলটির প্রতিটি প্যানেলে খাঁজ খাঁজ নকশা করা হয়েছে। এতে বলের মসৃণতা অনেকখানি কমে গেছে। ফলে বলের গতি প্রায় এক রকমই থাকে। দূরপাল্লার শটে গতি ও উচ্চতা দুটোই তুলনামূলক তাড়াতাড়ি হারায়। কিন্তু বাকি বিশ্বকাপের বল থেকে এই বলে খুব একটা পার্থক্য নেই।
জাবুলানি বলের সমস্যার কারণে গোলরক্ষকদের যেমন বেগ পেতে হয়েছে, তেমনি দূরপাল্লার শট নেওয়া খেলোয়াড়দের অনেক সুবিধাও হয়েছে। সেই বলে প্যানেল ছিল মাত্র ৮টি।
তবে বলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে কানেক্টেড বলপ্রযুক্তি। গত বিশ্বকাপের বলেও একই ধরনের প্রযুক্তি ছিল। কিন্তু সেই বলের ঠিক মাঝখানে ব্যালান্স করে রাখা হয়েছিল সেই প্রযুক্তি। এবার তা থাকছে না। বরং একটি প্যানেলের সঙ্গে আঠার মতো জুড়ে দেওয়া হয়েছে সেন্সরটিকে, যাতে এআই আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারে। মাত্র ১৪ গ্রাম ওজনের চিপটির কারণে একটি প্যানেলের ওজন বাকি তিন প্যানেল থেকে তুলনামূলক একটু বেশি। তবে ফুটবল মাঠে যেখানে এক মিলিমিটারও বড় পার্থক্য গড়ে দেয়, সেখানে ১৪ গ্রাম ওজনের চিপ ঠিক কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে, তা জানা যাবে শুধু মাঠের খেলাতেই।
এই কানেক্টেড বল প্রযুক্তির কারণে অদ্ভুত এক দৃশ্যের দেখা মিলবে এবার। বিশ্বকাপের প্রতিটি বলকে সচল রাখতে হলে দিতে হবে চার্জ। ফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে যেমন চার্জ দিতে হয়, তেমনি বলের ভেতরের সব তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পেতে চাইলে বলকেও দিতে হবে চার্জ। একবার চার্জ দিলে বল সচল থাকবে টানা ছয় ঘণ্টা। আস্ত এই কম্পিউটারকে সচল রাখতে এটুকু তো করাই যায়!
রেফারির বুকে বাটনের মধ্যে থাকবে ক্যামেরা। অনেকটা পুলিশের ভেস্টে থাকা ক্যামেরার মতো, যা দিয়ে পুরো ম্যাচের সব ফুটেজ সরাসরি দেখতে পারবেন দর্শকেরা।
রেফারির চোখে বিশ্বকাপ
ফুটবল মাঠে সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বটা থাকে রেফারির কাঁধে। পুরো ম্যাচকে একা হাতে সামলাতে হয় তাঁকে, মুহূর্তের ব্যবধানে দিতে হয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আর সিদ্ধান্ত যদি একচুলও এদিক-সেদিক হয়, তাহলে তো সমালোচনার পসরা সাজিয়ে বসেন দর্শকেরা। মাঠে রেফারিকে ঠিক কতটা চাপের মধ্যে থাকতে হয়, তা ভাবনারও বাইরে। তাঁর জায়গায় বসে যদি পুরো খেলা দেখার সুযোগ হতো, তাহলে হয়তো সেই চাপটা আপনিও অনুভব করতে পারতেন। সেই কাজটাই করবে এবারের বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপের খেলা দেখার চোখই বদলে যাচ্ছে এবার। বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ফুটবলের প্রতিটি ম্যাচেই নির্দিষ্ট ক্যামেরার জায়গা বরাদ্দ থাকে। সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় খেলা, টিভি পর্দায় আমরা সেই দৃশ্যই দেখি। কিন্তু এবারই প্রথমবারের মতো যুক্ত হচ্ছে রেফারি ক্যামেরা। যেখানে রেফারির বুকে বাটনের মধ্যে থাকবে ক্যামেরা। অনেকটা পুলিশের ভেস্টে থাকা ক্যামেরার মতো, যা দিয়ে পুরো ম্যাচের সব ফুটেজ সরাসরি দেখতে পারবেন দর্শকেরা।
শুধু যে রেফারির চোখ দিয়ে দেখা তা নয়, মাঠে কী কথাবার্তা হচ্ছে, তা-ও শুনতে পারবেন সবাই। কারণ, অনেক সময়ই রেফারির সঙ্গে অসদাচরণের কারণে কার্ড দেখানো হয় খেলোয়াড়দের। পরে খেলোয়াড়েরা দাবি করেন, তিনি তেমন বাজে কিছুই বলেননি। সেই বিভ্রান্তি দূর করে দেবে রেফারি ক্যামেরা। ক্যামেরার ফুটেজ প্রসেসিংয়েও থাকছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। মাঠে এত দৌড়াদৌড়ির মধ্যে ক্যামেরার ফুটেজ ভালো আসবে না। সেই ফুটেজকে স্ট্যাবিলাইজ করে দেখার মতো অবস্থায় নিয়ে আসবে এআই। বিভিন্ন লিগে পরীক্ষামূলকভাবে ইতিমধ্যে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে রেফারি ক্যামেরা। ক্লাব বিশ্বকাপেও এই ক্যামেরা ব্যবহারের সুফল পাওয়া গেছে।
গোললাইনে একটি চিকন তার দিয়ে ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করা হয়। অন্যদিকে বলের ভেতর তো চিপ আছেই। ফলে এই ছোট্ট চিপ যখন ম্যাগনেটিক সেন্সর অতিক্রম করে, তখনই রেফারি সংকেত পান।
গোললাইন প্রযুক্তি
ফুটবল খেলায় প্রযুক্তির সবচেয়ে প্রাচীন ও যুগান্তকারী ব্যবহার খুব সম্ভবত গোললাইন প্রযুক্তি। ২০১০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচের কেলেঙ্কারির পর ফিফা নড়েচড়ে বসেছিল গোললাইন প্রযুক্তি নিয়ে। ২০১৪ বিশ্বকাপ থেকে এই প্রযুক্তি এখন নিয়মিত। বল গোলপোস্টের নির্ধারিত রেখা অতিক্রম করেছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় গোললাইন প্রযুক্তি। বল গোললাইন পার হয়েছে কি না, সেটা বোঝার জন্য মাঠে থাকে ১৪টি ক্যামেরা। প্রতিটি ক্যামেরা সেকেন্ডে ৫০০টি করে ছবি তুলতে পারে। সেখান থেকে বোঝা যায় বলের নির্দিষ্ট অবস্থান।
ক্যামেরা ছাড়াও অনেক মাঠে ব্যবহার করা হয় ম্যাগনেটিক সেন্সর। গোললাইনে একটি চিকন তার দিয়ে ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করা হয়। অন্যদিকে বলের ভেতর তো চিপ আছেই। ফলে এই ছোট্ট চিপ যখন ম্যাগনেটিক সেন্সর অতিক্রম করে, তখনই রেফারি সংকেত পান।
রেফারির ঘড়িতে বেজে ওঠে গোলের ভাইব্রেশন এবং রেফারির স্মার্টওয়াচে লেখা ওঠে ‘গোল’। সেটি দেখেই রেফারি বাঁশি বাজিয়ে জানিয়ে দেন গোল হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ শুরুর আগেই পরিণত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খেলাঘরে। ব্যাংক অব আমেরিকার মতে, ‘এটাই হবে প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে ডেটা নিজেই একটি প্রধান পণ্য। ফুটবলের চেয়ে বেশি মূল্য থাকবে ডেটার।’ ত্রিমাত্রিক অবয়ব থেকে শুরু করে দ্রুতগতিতে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়াসহ সবকিছুতেই ফুটবল হয়ে উঠেছে আরও দ্রুতগতির, আরও বেশি শাণিত। কে জানে, বিশ্বকাপে হয়তো মাঠে খেলার চেয়ে ডেটা নিয়েই বেশি আলোচনা হবে!