নীল তিমির চেয়েও লম্বা জেলিফিশ

সাগরের রাজা নীল তিমিকেও আকারের দিক দিয়ে টেক্কা দেয় এক জেলিফিশ! ১২০ ফুট লম্বা এই প্রাণীটি দেখতে যতটা সুন্দর, ঠিক ততটাই যন্ত্রণাদায়ক তার স্পর্শ। সাগরের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই লাল দানব আসলে কে?

লায়নস মেন জেলিফিশছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমি। সাগরের বুক চিরে যখন এই বিশাল প্রাণীটি ভেসে ওঠে, তখন এর আকার দেখে আমাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। কিন্তু বিজ্ঞানের জগৎ বড়ই অদ্ভুত। এখানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কারণ, লম্বায় নীল তিমির চেয়েও বড় এক প্রাণী আছে সাগরেই!

না, এটি কোনো ডাইনোসর যুগের প্রাণী নয়, কিংবা কোনো কাল্পনিক দৈত্যও নয়। এটি দেখতে জেলি মতো থকথকে। নাম লায়নস মেন জেলিফিশ। সিংহের কেশরের মতো এর হাজার হাজার টেন্টাকল ছড়িয়ে থাকে বলেই এমন রাজকীয় নাম দেওয়া হয়েছে।

লায়নস মেন জেলিফিশের টেন্টাকলগুলো অবিশ্বাস্য রকমের লম্বা হয়
ছবি: উইকিপিডিয়া

একটি পূর্ণবয়স্ক নীল তিমি লম্বায় গড়ে প্রায় ২৭ মিটার বা ৮৯ ফুট। খুব বেশি হলে সেটা ৩০ মিটার হতে পারে। কিন্তু সাগরের এই জেলিফিশের কাছে নীল তিমিও যেন একটু খাটো হয়ে যায়! লায়নস মেন জেলিফিশের টেন্টাকলগুলো অবিশ্বাস্য রকমের লম্বা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০.৫ মিটার বা ১০০ ফুটের বেশি।

তবে চমকে যাওয়ার মতো তথ্য হলো, এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় যে লায়নস মেন জেলিফিশটি পাওয়া গেছে, তার দৈর্ঘ্য ছিল ১২০ ফুট! ছয়টা জিরাফকে যদি একটার ওপর একটা দাঁড় করানো হয়, তবেই কেবল এই জেলিফিশের সমান লম্বা হবে!

আরও পড়ুন
একটি পূর্ণবয়স্ক নীল তিমি লম্বায় গড়ে প্রায় ২৭ মিটার বা ৮৯ ফুট। খুব বেশি হলে সেটা ৩০ মিটার হতে পারে। কিন্তু সাগরের এই জেলিফিশের কাছে নীল তিমিও যেন একটু খাটো হয়ে যায়!

শুধু লম্বাতেই নয়, ওজনেও এরা বিশ্বরেকর্ডধারী। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের মতে, এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জেলিফিশ। যদিও সাগরের পানিতে ভাসমান জেলিফিশ ধরে ওজন মাপা চাট্টিখানি কথা নয়, তবুও বিজ্ঞানীদের ধারণা একটি পূর্ণবয়স্ক লায়নস মেন জেলিফিশের ওজন প্রায় ১০০০ কেজি হতে পারে! হ্যাঁ, নীল তিমির ২ লাখ কেজির কাছে এটা নস্যি মনে হতে পারে। কিন্তু তুলনাটা যখন হালকা জেলিফিশের সঙ্গে, তখন ১ হাজার কেজি মানেও বিশাল ব্যাপার।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এটাই কি সাগরের সবচেয়ে বড় জেলিফিশ? এখানে একটু ‘কিন্তু’ আছে। লম্বায় লায়নস মেন নিঃসন্দেহে চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু চওড়ায় বা ব্যাসের দিক থেকে জাপানের নোমুরাস জেলিফিশ (Nomura’s jellyfish) এগিয়ে আছে। নোমুরাস জেলিফিশের ছাতার ব্যাস প্রায় ৬.৬ ফুট হতে পারে। লায়নস মেনের ছাতার ব্যাস ৩.৩ ফুটের মতো। তবে দৈর্ঘ্যের দিক থেকে লায়নস মেনের ধারেকাছেও কেউ নেই।

জাপানের নোমুরাস জেলিফিশ
ছবি: নিওক্স/অ্যাট্রেসমিডিয়া

আপনি যদি ভেবে থাকেন কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিনের সৈকতে হাঁটতে হাঁটতে এদের দেখা পাবেন, তবে ভুল ভাবছেন। এই দানবদের ঠান্ডা পছন্দ। এরা মূলত আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর ও উত্তর মহাসাগরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পানিতে থাকতেই ভালোবাসে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের উপকূলীয় এলাকায় গ্রীষ্মকালে এদের দেখা পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন
চওড়ায় বা ব্যাসের দিক থেকে জাপানের নোমুরাস জেলিফিশ এগিয়ে আছে। নোমুরাস জেলিফিশের ছাতার ব্যাস প্রায় ৬.৬ ফুট হতে পারে। লায়নস মেনের ছাতার ব্যাস ৩.৩ ফুটের মতো।

হ্যাঁ, গ্রীষ্মকাল ঠিকই পড়েছেন। আসলে যুক্তরাজ্যের গ্রীষ্মকালে আমাদের দেশের মতো এত গরম নয়, বরং বেশ ঠান্ডা। আর সেই ঠান্ডা পানিই এদের পছন্দ। এদের চেনার উপায় খুব সহজ। আকার তো আছেই, পাশাপাশি এদের শরীরের রং সাধারণত হালকা বাদামী থেকে গাঢ় লাল রঙের হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের র গাঢ় লাল বা বেগুনি হতে থাকে।

লায়নস মেন জেলিফিশ
ছবি: শাটারস্টোক ডটকম

এত বড় জেলিফিশ, এর বিষাক্ত হুল কি তাহলে ভয়ঙ্কর? ভালো খবর হলো, এদের হুলের আঘাতে সাধারণত মানুষের মৃত্যু হয় না, তবে মারাত্মক যন্ত্রণা হয়! ভুল করে যদি কেউ এর টেন্টাকলে জড়িয়ে যায়, তবে অসহ্য ব্যথার পাশাপাশি বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত ঘাম, মাংসপেশিতে টান বা তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন