কৃত্রিম অঙ্গ লাগালে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ কী তা টের পায়

যখন কেউ রোবোটিক পা ব্যবহার করা শেখে, তখন তার মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলে!ছবি: ভ্লাদিস্লাভ তোবোলেনকো

ধরুন, আপনি নতুন কোনো নাচের স্টেপ শিখছেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, হুবহু মাইকেল জ্যাকসনের মতোই মুনওয়াক করছেন! কিন্তু কেউ যদি তখন আপনার ভিডিও করে তোমাকে দেখায়, দেখবেন আপনার হাত-পা আসলে অদ্ভুতভাবে নড়ছে। আমাদের মস্তিষ্ক নিজের শরীর নিয়ে একটা ধারণা করে। আমরা কীভাবে হাঁটি, কীভাবে হাত নাড়ি তা একটা অদৃশ্য মানচিত্রের মতো মস্তিষ্কে আঁকা থাকে। সাধারণত প্র্যাকটিস করতে করতে এই মানচিত্র ও বাস্তবের নড়াচড়া এক হয়ে যায়।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি অবাক করা এক তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন, কোনো মানুষ যখন রোবোটিক পা ব্যবহার করা শেখে, তখন তাদের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলে!

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক হেলেন হুয়াং এবং তাঁর দল একটি গবেষণা করেছেন। তাঁরা দেখতে চেয়েছিলেন, মানুষ যখন কৃত্রিম পা ব্যবহার করে, তখন তাদের বডি ইমেজ বা নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা কেমন হয়।

অধ্যাপক হেলেন হুয়াং
ছবি: এনসি স্টেট

গবেষণার জন্য তাঁরা ৯ জন পুরোপুরি সুস্থ মানুষকে বেছে নেন। তাঁদের পা কিন্তু কাটা ছিল না। বরং তাঁদের একটি হাঁটুকে ৯০ ডিগ্রি ভাঁজ করে সেখানে একটি রোবোটিক পা লাগিয়ে দেওয়া হয়। অনেকটা জলদস্যুদের কাঠের পায়ের গল্পের মতো। তবে এটা ছিল হাই-টেক রোবটিক পা! এরপর তাঁদের বলা হলো ট্রেডমিলে হাঁটতে। শর্ত হলো, রেলিং ধরা যাবে না এবং বেশ দ্রুত হাঁটতে হবে।

আরও পড়ুন
আমরা কীভাবে হাঁটি, কীভাবে হাত নাড়ি তা একটা অদৃশ্য মানচিত্রের মতো মস্তিষ্কে আঁকা থাকে। সাধারণত প্র্যাকটিস করতে করতে এই মানচিত্র ও বাস্তবের নড়াচড়া এক হয়ে যায়।

টানা চার দিন ধরে চলল এই হাঁটার প্র্যাকটিস। প্রতিদিন প্র্যাকটিস শেষে গবেষকেরা তাঁদের কিছু কম্পিউটার অ্যানিমেশন বা ভিডিও দেখাতেন। সেখানে বিভিন্নভাবে হাঁটার ভঙ্গি ছিল। অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞেস করা হতো, ‘বলো তো, আজ তুমি ঠিক কোন ভিডিওটার মতো করে হেঁটেছ?’

এখানেই আসল চমকটা পাওয়া গেল!

গবেষণার শুরুতে, অর্থাৎ প্রথম দিকে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের খুব ছোট করে দেখছিল। তারা ভাবছিল, তাঁরা নিশ্চয়ই খুব বাজেভাবে হাঁটছে, হয়তো খুব নড়বড়ে দেখাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা যতটা খারাপ ভাবছিল, ততটা খারাপ তারা হাঁটছিল না। মানে, শুরুতে তারা আত্মবিশ্বাসী ছিল না।

কিন্তু চার দিন প্র্যাকটিস করার পর পুরো উল্টো ঘটনা ঘটল! তাদের হাঁটার উন্নতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁরা নিজেদের অতি-মূল্যায়ন করতে শুরু করল। তারা ভিডিও দেখে বলল, ‘আমি তো একদম স্বাভাবিক মানুষের মতোই স্বচ্ছন্দে হাঁটছি!’ অথচ বাস্তবে তাদের হাঁটা ততটা নিখুঁত ছিল না। মানে, শুরুতে তারা নিজেদের যতটা কাঁচা ভাবছিল, শেষে এসে নিজেদের তার চেয়ে অনেক বেশি পাকা ভাবতে শুরু করল।

হেলেন হুয়াং বলছেন, এই অতি-আত্মবিশ্বাস আসলে ভালো লক্ষণ নয়। কেন? কারণ, আপনি যদি মনে করেন, আপনি পারফেক্ট হয়ে গেছেন, তখন আর নিজেকে শুধরানোর চেষ্টা করবেন না।

আরও পড়ুন
অংশগ্রহণকারীরা তাদের হাঁটার ভিডিও দেখে বলল, ‘আমি তো একদম স্বাভাবিক মানুষের মতোই স্বচ্ছন্দে হাঁটছি!’ অথচ বাস্তবে তাদের হাঁটা ততটা নিখুঁত ছিল না।

কিন্তু মস্তিষ্ক কেন এমন ধোঁকা খায়? গবেষকেরা দেখেছেন, মানুষ যখন রোবটিক পা লাগিয়ে হাঁটে, তখন তারা পায়ের দিকে খুব একটা নজর দেয় না। তারা খেয়াল করে তাদের শরীরের ওপরের অংশ সোজা আছে কি না। যেহেতু রোবটিক পা থেকে তারা কোনো অনুভূতি পায় না, তাই তারা মনে করে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হাঁটছে!

অধ্যাপক হুয়াং মনে করেন, এই সমস্যা সমাধানের উপায় হলো মানুষকে ভিজুয়্যাল ফিডব্যাক দেওয়া। অর্থাৎ, রোগীরা যখন রোবটিক পা দিয়ে হাঁটার প্র্যাকটিস করবেন, তখন যদি আয়না বা ভিডিওর মাধ্যমে তাঁদের আসল হাঁটাটা দেখানো যায়, তবে তাঁদের মস্তিষ্কের ভুল ধারণাটা ভেঙে যাবে।

গবেষকেরা দেখেছেন, মানুষ যখন রোবটিক পা লাগিয়ে হাঁটে, তখন তারা পায়ের দিকে খুব একটা নজর দেয় না
ছবি: ব্রেন্ডা আহার্ন / মিশিগান ইঞ্জিনিয়ারিং

এই গবেষণাটি শুধু বিজ্ঞানের জগতেই নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রেও নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে যারা কৃত্রিম পা ব্যবহার করবেন, তাঁদের হয়তো এমন স্ক্রিন দেওয়া হবে, যেখানে তাঁরা নিজেদের হাঁটা দেখতে পাবেন। ফলে তাঁরা আর মস্তিষ্কের এই ফাঁদে পড়বেন না। নিজের ভুল শুধরে তাঁরা হয়তো একদিন সত্যিই একদম স্বাভাবিক মানুষের মতো দৌড়াতে পারবেন!

বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন, কীভাবে মানুষকে তাঁর নিজের নড়াচড়া সম্পর্কে আরও নিখুঁত ধারণা দেওয়া যায়। কারণ, নিজের ভুলটা জানা থাকলেই কেবল মানুষ আরও নিখুঁত হতে পারে।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: এনসি স্টেট ইউনিভার্সিটি নিউজ এবং পিএনএএস নেক্সাস জার্নাল

আরও পড়ুন