পুরুষেরা কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচে
একটা ব্যাপার কি কখনো খেয়াল করেছেন? আমাদের আশপাশে তাকালে দেখবেন, বয়স্ক দাদুদের চেয়ে দিদিমারা বা নানিমারা যেন একটু বেশিই দিন বাঁচেন। পরিসংখ্যানও কিন্তু একই কথা বলে। সারা বিশ্বেই নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের চেয়ে বেশি। ইউএনএফপিএ-এর মতে বাংলাদেশে নারীদের গড় আয়ু ৭৭ বছর, পুরুষের ৭৪ বছর। কিন্তু কেন?
অনেকে বলবেন, পুরুষেরা বেশি রিস্ক নেয়, ধূমপান বেশি করে কিংবা বাইরের ধকল বেশি সামলায়। এ কারণে হয়তো তাদের আয়ু কম। তবে এসব কারণ ভুল নয়। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এর পেছনে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ানক জেনেটিক বিশ্বাসঘাতকতার খোঁজ পেয়েছেন। আর সেই ভিলেন হলো ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম!
আমরা জানি, মানুষের শরীরে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। এর মধ্যে এক জোড়া হলো সেক্স ক্রোমোজোম। নারীদের থাকে দুটো XX, আর পুরুষদের একটা X ও একটা Y ক্রমোজোম। এই Y ক্রোমোজোমটাই মূলত ঠিক করে দেয় শিশুটি ছেলে হবে, নাকি মেয়ে।
এতদিন বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, Y ক্রোমোজোমের কাজ শুধু একটাই—লিঙ্গ নির্ধারণ করা এবং শুক্রাণু তৈরিতে সাহায্য করা। এর বাইরে এর তেমন কোনো কাজ নেই। কারণ আকারে এটি খুবই ছোট এবং এতে জিনের সংখ্যাও খুব কম। অন্য ক্রোমোজোমে যেখানে হাজার হাজার জিন থাকে, Y ক্রমোজমে থাকে মাত্র পঞ্চাশটির মতো। তাই বিজ্ঞানীরা একে অপ্রয়োজনীয় ক্রোমোজোম ভাবতেন।
কিন্তু সম্প্রতি সেই ধারণা পাল্টে গেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের শরীর থেকে এই Y ক্রোমোজোম গায়েব হতে শুরু করে! একে বলা হয় মোজাইক লস অব ওয়াই বা mLOY। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ বছর বয়সী প্রায় ৪০ শতাংশ পুরুষের রক্তকোষ থেকে Y ক্রোমোজোম হারিয়ে গেছে। আর বয়স যখন ৯০ এর ঘরে পৌঁছায়, তখন ৫৭ শতাংশ পুরুষের শরীরেই এই ক্রোমোজোমের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে যারা ধূমপান করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই গায়েব হওয়ার হার অনেক বেশি।
এতদিন বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, Y ক্রোমোজোমের কাজ শুধু একটাই—লিঙ্গ নির্ধারণ করা এবং শুক্রাণু তৈরিতে সাহায্য করা। এর বাইরে এর তেমন কোনো কাজ নেই। কারণ আকারে এটি খুবই ছোট।
Y ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলে কী ক্ষতি
আগে ভাবা হতো, Y ক্রোমোজোম শুধু ছেলে সন্তান বানানোর কাজ করে, তাই বুড়ো বয়সে এটা হারিয়ে গেলে আর কীই-বা ক্ষতি হবে? কিন্তু গত কয়েক বছরের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা শিউরে ওঠার মতো তথ্য পেয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ জেনি গ্রেভস এবং তাঁর দল বলছেন, রক্তকোষ থেকে Y ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়া মানেই শরীরের সর্বনাশ ডেকে আনা। এর ফলে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে মারাত্মক সব রোগ। যেমন ক্যানসারহতে পারে।ওয়াই ক্রোমোজোমবিহীন কোষগুলো ল্যাবরেটরিতে সাধারণ কোষের চেয়ে দ্রুত বাড়ে।
শরীরের ভেতরেও এরা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে টিউমার বা ক্যানসার তৈরি করতে পারে। জার্মানির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বয়স্ক পুরুষের Y ক্রোমোজোম বেশি হারে হারিয়েছে, তাদের হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। আলঝেইমার রোগীদের মস্তিষ্কে ওয়াই ক্রোমোজোম হারানো কোষের সংখ্যা সাধারণ মানুষের চেয়ে ১০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। আবার করোনায় নারীদের চেয়ে পুরুষদের মৃত্যুর হার বেশি ছিল। এর পেছনেও এই ওয়াই ক্রোমোজোম হারানোর হাত থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
জার্মানির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বয়স্ক পুরুষের Y ক্রোমোজোম বেশি হারে হারিয়েছে, তাদের হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা ও প্রমাণ
এখন প্রশ্ন হলো, Y ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার কারণেই কি অসুখ হচ্ছে, নাকি অসুখ হওয়ার কারণে ক্রোমোজোম হারিয়ে যাচ্ছে?
এই ধাঁধার সমাধানে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের ওপর একটি পরীক্ষা চালান। তাঁরা কিছু ইঁদুরের শরীরে এমন রক্তকোষ ঢুকিয়ে দেন, যেগুলোতে ওয়াই ক্রোমোজোম নেই। ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো! দেখা গেল, ওই ইঁদুরগুলোর হৃৎপিণ্ড দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং নানা ধরনের বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ, Y ক্রোমোজোম হারানোই সরাসরি অসুস্থতার কারণ।
অর্থাৎ, যে Y ক্রোমোজোমকে বিজ্ঞানীরা দুর্বল ভাবতেন, সেটি আসলে শরীরের এক বিশাল বডিগার্ড। যদিও এতে খুব কম জিন থাকে, কিন্তু এই জিনগুলোই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
ওয়াই ক্রোমোজোমে কিছু জিন আছে, যেগুলো ক্যানসার দমনকারী হিসেবে কাজ করে। যখনই এই ক্রোমোজোমটি কোষ থেকে হারিয়ে যায়, তখন শরীরের পাহারাদার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ফলে ক্যানসার কোষ বা হৃদরোগ সহজেই শরীরে জাঁকিয়ে বসে।
যদিও Y ক্রোমোজোমে খুব কম জিন থাকে, কিন্তু এই জিনগুলোই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
নারীদের শরীরে দুটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে। তাই কোনো কারণে একটিতে সমস্যা হলেও ব্যাকআপ হিসেবে আরেকটি থাকে। কিন্তু পুরুষদের ওয়াই ক্রোমোজোম একটাই। তাই এটি হারিয়ে গেলে ব্যাকআপ দেওয়ার কেউ থাকে না।
বিজ্ঞানীরা মাত্র কয়েক বছর আগে মানুষের ওয়াই ক্রোমোজোমের ডিএনএ পুরোপুরি ম্যাপ করতে পেরেছেন। এখন তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন, ঠিক কোন জিনের অভাবে হার্ট ফেইলিওর বা ক্যানসার হচ্ছে। এটা যদি বের করা যায়, তবে ভবিষ্যতে হয়তো পুরুষদের আয়ু বাড়ানোর কোনো ওষুধ আবিষ্কার হবে।
কিন্তু ততদিন পর্যন্ত কী করবেন? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ধূমপান ছাড়ুন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন। কারণ পরিবেশ দূষণ ও ধূমপান এই ক্রোমোজোম হারানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।