কুকুরের আগে মানুষের সঙ্গে বাস করত নেকড়ে
অনেক আগেকার কথা। মানুষ ও নেকড়ে তখন একসঙ্গে বাস করত। এটা কোনো গালগপ্প নয়, নতুন এক গবেষণায় এমনই প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা বাল্টিক সাগরের একটি ছোট দ্বীপে নেকড়ের হাড় খুঁজে পেয়েছেন। জায়গাটি এমন, যেখানে নেকড়েদের নিজ থেকে পৌঁছানো একরকম অসম্ভব। গবেষকদের ধারণা, সেখানে নৌকায় করে মানুষই নেকড়েদের নিয়ে গিয়েছিল। মানুষ তাদের খাবার দিত এবং যত্ন নিত।
দ্বীপটির নাম স্টোরা কার্লসো। সুইডেনের গটল্যান্ড উপকূলের কাছে অবস্থিত ছোট এক চুনাপাথরের দ্বীপ। এখানে প্রাকৃতিকভাবে কখনো কোনো স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী বাস করেনি। তবে হাজার হাজার বছর ধরে সেখানে মানুষের যাতায়াত ছিল। তারা মূলত সিল শিকার ও মাছ ধরার জন্য সেখানে যেত।
পরে একটি গুহার আশপাশে পশুপালনও শুরু করে। ঠিক ওই গুহার ভেতরেই পাওয়া গেছে নেকড়ের হাড়। হাড়গুলোর বয়স প্রায় তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার বছর। দ্বীপটির চারদিক সমুদ্রে ঘেরা, তাই এত দূর সাঁতার কেটে আসা নেকড়ের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার বরফের ওপর দিয়ে হেঁটেও সেখানে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই গবেষকেরা বলছেন, মানুষের নৌকাই ছিল তাদের একমাত্র বাহন।
গবেষকেরা কুকুরজাতীয় প্রাণীর দুটি হাড় থেকে প্রাচীন ডিএনএ পরীক্ষা করেন। এতে স্পষ্ট হয়, এগুলো ধূসর বা বন্য নেকড়ের। প্রাচীন কুকুরের সঙ্গে এদের বড় কোনো জেনেটিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। কুকুরের জিনের সামান্য ইঙ্গিত থাকলেও তা বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
তবে পরীক্ষায় একটি নেকড়ের জেনেটিক বৈচিত্র্য ছিল খুব কম। সাধারণত ছোট বা মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা পশুদের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়। আধুনিক যুগেও বিচ্ছিন্ন এলাকায় থাকা নেকড়েদের মধ্যে পাওয়া যায় এই বৈশিষ্ট্য। তবু এই ফলাফল নেকড়ের ওপর মানুষের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
দ্বীপটির নাম স্টোরা কার্লসো। সুইডেনের গটল্যান্ড উপকূলের কাছে অবস্থিত ছোট এক চুনাপাথরের দ্বীপ। এখানে প্রাকৃতিকভাবে কখনো কোনো স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী বাস করেনি।
হাড়ের রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেকড়েগুলোর খাদ্যতালিকায় ছিল প্রচুর সামুদ্রিক খাবার। বিশেষ করে সিলের মাংস ও মাছ। অথচ নেকড়ে সাধারণত হরিণ বা স্থলচর প্রাণী শিকার করে। তাই কোনো যন্ত্র ছাড়া তাদের পক্ষে সাগরে মাছ ধরা খুব কঠিন। সুতরাং নিয়মিত মাছ খাওয়ার অর্থ মানুষই তাদের খাবার দিত। তাদের এই খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘ সময় ধরে ছিল। মানুষের সহায়তা ছাড়া এত দীর্ঘ সময় একা টিকে থাকা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
একটি নেকড়ে আকারে অন্যদের তুলনায় ছোট ছিল। গবেষকেরা বলছেন, এমন পরিবর্তন সাধারণত গৃহপালনের সময় বা দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে হয়। আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, একটি নেকড়ের পায়ের হাড় গুরুতর জখম ছিল। এ ধরনের আঘাত পাওয়ার পর বন্য পরিবেশে যেকোনো প্রাণীর জন্য চলাফেরা ও শিকার করা প্রায় অসম্ভব।
তবুও সেই নেকড়েটি বেঁচে ছিল। অর্থাৎ শিকার ছাড়াই সে নিয়মিত খাবার পাচ্ছিল। গবেষকদের দাবি, এতে মানুষের সঙ্গে থাকার বিষয়টি আরও জোরালো হয়।
মানুষের সঙ্গে কুকুরের বসবাসের শুরু অন্তত ১৫ হাজার বছর আগে। এটি কীভাবে শুরু হয়েছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো মতভেদ আছে। তবে একটি ধারণা বলছে, নেকড়েরা মানুষের খাবারের উচ্ছিষ্ট খেতে খেতে কাছে আসে। আরেকটি ধারণা অনুযায়ী, মানুষ শখ করে নেকড়ের বাচ্চা লালন-পালন করত।
নেকড়ে সাধারণত হরিণ বা স্থলচর প্রাণী শিকার করে। তাই কোনো যন্ত্র ছাড়া তাদের পক্ষে সাগরে মাছ ধরা খুব কঠিন। সুতরাং নিয়মিত মাছ খাওয়ার অর্থ মানুষই তাদের খাবার দিত।
স্টোরা কার্লসোর প্রমাণগুলো দেখায়, নেকড়ের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। নৌকায় আনা, দীর্ঘদিন খাওয়ানো, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ও আঘাতপ্রাপ্ত নেকড়ের বেঁচে থাকা তারই ইঙ্গিত দেয়। গবেষণার প্রধান লেখক পন্টাস স্কোগলুন্ড বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম এগুলো কুকুরের। কিন্তু দেখা গেল নেকড়ে। এটা জানার পর আমরা বিস্মিত হয়েছি।’
মানুষের বসবাসস্থলে নেকড়ের হাড় থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে খুবই বিরল। কেবল চামড়ার জন্য নেকড়ে মারা হলে এমন বড় হাড় গুহায় পড়ে থাকার কথা নয়। এই গবেষণা দেখায়, প্রাচীন মানুষ বন্য প্রাণীর সঙ্গে নানাভাবে সহাবস্থানের চেষ্টা করেছিল। সেই চেষ্টা থেকে কুকুর মানুষের কাছে এসেছে। আবার সময়ের সঙ্গে কিছু প্রাণী হারিয়ে গেছে।
এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে।