দৈনিক আট ঘণ্টা ঘুমের নিয়ম কি সত্যিই সেকেলে হয়ে গেছে

আপনি যদি আট ঘণ্টার চেয়ে একটু কম ঘুমান, তাহলেই কি আপনার স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে?ছবি: বেটারহুড

ছোটবেলা থেকে আমরা শুনছি, সুস্থ থাকতে হলে দিনে অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। ডাক্তার থেকে শুরু করে মা-বাবা, সবাই এই আট ঘণ্টার নিয়মের কথা বলেন। কিন্তু আপনি যদি আট ঘণ্টার চেয়ে একটু কম ঘুমান, তাহলেই কি আপনার স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে? বিজ্ঞান কিন্তু এখন অন্য কথা বলছে। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার গবেষকদের নতুন এক গবেষণা বলছে, প্রতিদিন আট ঘণ্টা ঘুমের এই বাঁধাধরা নিয়মটি আসলে বেশ সেকেলে। আপনার আট ঘণ্টা ঘুম দরকার নাকি সাড়ে ছয় ঘণ্টা, তা নির্ভর করে আপনি পৃথিবীর কোথায় বাস করছেন তার ওপর!

গবেষকেরা বলছেন, মানুষের ঘুমের চাহিদা কোনো বৈশ্বিক নিয়মে বাঁধা নেই। বরং এটি বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে আলাদা হওয়া উচিত। ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়ার স্কুল অব নার্সিংয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ক্রিস্টিন জানান, ‘ঘুম শুধু আমাদের জীববিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করে না। এটি আমাদের সংস্কৃতি, কাজের সময়সূচি, আবহাওয়া, আলোর উপস্থিতি এবং সামাজিক রীতিনীতির ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। এক দেশে যে ঘুমটাকে পর্যাপ্ত মনে করা হয়, অন্য দেশে তা খুব বেশি বা খুব কম মনে হতে পারে।’

ক্রিস্টিনের গবেষক দল উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার ২০টি দেশের প্রায় ৫ হাজার মানুষের ঘুমের অভ্যাস ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এর সঙ্গে আগের আরও ১৪টি গবেষণার তথ্য মিলিয়ে তাঁরা দেখার চেষ্টা করেন, মানুষের আয়ুষ্কাল, হৃদ্‌রোগ, স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে দৈনন্দিন ঘুমের সময়ের কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা বলছেন, মানুষের ঘুমের চাহিদা কোনো বৈশ্বিক নিয়মে বাঁধা নেই। বরং এটি বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে আলাদা হওয়া উচিত।

গবেষণার ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। দেখা গেল, একেক দেশের মানুষের ঘুমের পরিমাণ একেক রকম। বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় ঘুমের সময় ৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। তবে সবচেয়ে বেশি ঘুমান ফ্রান্সের মানুষ। জরিপে অংশ নেওয়ার আগের রাতে তাঁরা গড়ে ৭ ঘণ্টা ৫২ মিনিট ঘুমিয়েছিলেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ঘুমান জাপানের মানুষ, গড়ে মাত্র ৬ ঘণ্টা ১৮ মিনিট! এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের মানুষ ৭ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ৭ ঘণ্টা ২ মিনিট ঘুমান।

গবেষকেরা অবাক হয়ে দেখেন, সব দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য কোনো আদর্শ ঘুমের সময় নেই। অর্থাৎ, যেসব দেশে মানুষের গড় ঘুম কম, তাদের স্বাস্থ্য যে বেশি ঘুমানো দেশের মানুষের চেয়ে খারাপ, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে একটা জায়গায় সবার মিল পাওয়া গেছে। সব দেশের মানুষই মনে করে, সুস্বাস্থ্যের জন্য তাদের আরও একটু বেশি ঘুমানো দরকার। যেমন, কোস্টারিকায় আদর্শ ঘুম ধরা হয় ৮ ঘণ্টা ৩ মিনিট, অথচ দক্ষিণ কোরিয়ায় তা ৭ ঘণ্টা ১৬ মিনিট। কিন্তু সব দেশের মানুষই মনে করেন, তাঁরা তাঁদের লক্ষ্যের চেয়ে ১ ঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট কম ঘুমাচ্ছেন।

আরও পড়ুন
সবচেয়ে কম ঘুমান জাপানের মানুষ, গড়ে মাত্র ৬ ঘণ্টা ১৮ মিনিট! এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের মানুষ ৭ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ৭ ঘণ্টা ২ মিনিট ঘুমান।

তাহলে আসল রহস্য কোথায়? ক্রিস্টিন বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ তখনই বেশি সুস্থ থাকে, যখন তার ঘুমের সময়টা তার নিজস্ব সংস্কৃতির গড় ঘুমের সময়ের কাছাকাছি থাকে। তাই কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার পেছনে না ছুটে, নিজের দেশের বা সংস্কৃতির রীতিনীতি মেনে ঘুমালে স্বাস্থ্য ভালো থাকে।’

অর্থাৎ, আপনি যদি আপনার দেশের সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বা অনেক কম ঘুমান, তবেই আপনার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনকি অতিরিক্ত ঘুমানোর ক্ষতিকর প্রভাবও একেক দেশে একেক রকম। যুক্তরাজ্যে কেউ ১০ ঘণ্টা ২৬ মিনিটের বেশি ঘুমালে তার স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয়, অথচ যুক্তরাষ্ট্রে সেই সীমা মাত্র ৮ ঘণ্টা ১৩ মিনিট!

যুক্তরাজ্যের কিলে ইউনিভার্সিটির স্লিপ সাইকোলজিস্ট ডালজিন্দার চ্যালমারস বলেন, ‘ঘুম ব্যাপারটা অনেক জটিল। সবারই দিনে আট ঘণ্টা ঘুমানো উচিত, এমন কথার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যেসব দেশে মানুষ রাতে কম ঘুমায়, তারা হয়তো দিনে সেই ঘুম পুষিয়ে নেয়। যেমন, জাপানে অনেকেই দুপুরের দিকে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন, যাকে তাঁরা হিরুনে বলেন।’

অবশ্য গবেষকেরা এই জরিপে পুষ্টি, সম্পদ, বৈষম্য এবং ভূগোলের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলেও, এটি ছিল মূলত একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। তাই ঘুম সরাসরি স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন
অতিরিক্ত ঘুমানোর ক্ষতিকর প্রভাবও একেক দেশে একেক রকম। যুক্তরাজ্যে কেউ ১০ ঘণ্টা ২৬ মিনিটের বেশি ঘুমালে তার স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয়, অথচ যুক্তরাষ্ট্রে সেই সীমা মাত্র ৮ ঘণ্টা ১৩ মিনিট!

একনজরে বিভিন্ন দেশের মানুষের গড় ঘুমের সময়

বিশ্বজুড়ে গড় ঘুম: ৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট

ফ্রান্স: ৭ ঘণ্টা ৫২ মিনিট

নেদারল্যান্ডস: ৭ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট

বেলজিয়াম: ৭ ঘণ্টা ৪১ মিনিট

নিউজিল্যান্ড: ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট

যুক্তরাজ্য: ৭ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট

দক্ষিণ আফ্রিকা: ৭ ঘণ্টা ৩১ মিনিট

অস্ট্রেলিয়া: ৭ ঘণ্টা ২৯ মিনিট

কানাডা: ৭ ঘণ্টা ২৭ মিনিট

চীন: ৭ ঘণ্টা ১৮ মিনিট

ভারত: ৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট

আর্জেন্টিনা: ৭ ঘণ্টা ১৪ মিনিট

কোস্টারিকা: ৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট

স্পেন: ৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট

কলম্বিয়া: ৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট

মেক্সিকো: ৭ ঘণ্টা ৪ মিনিট

যুক্তরাষ্ট্র: ৭ ঘণ্টা ২ মিনিট

সিঙ্গাপুর: ৬ ঘণ্টা ৫৯ মিনিট

দক্ষিণ কোরিয়া: ৬ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট

তাইওয়ান: ৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিট

জাপান: ৬ ঘণ্টা ১৮ মিনিট

সুতরাং, আট ঘণ্টার হিসাব মেলানোর দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে, আপনার শরীর যতটুকুতে সতেজ অনুভব করে, ততটুকু ঘুমানোই বোধ হয় সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ!

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস

আরও পড়ুন