মানুষের মতো মাছও সুযোগ পেলে ঘুমায়, নতুন গবেষণা

জেব্রাফিশের চোখের পাতা থাকে না। তাই আলো এদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়ছবি: ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজি

মাছের ঘুমের ধরণ শনাক্ত করতে গবেষকেরা বেছে নিয়েছিলেন জেব্রাফিশকে। এই মাছের চোখের নড়াচড়া অনুসরণ করে মাছের ঘুমের চারটি ভিন্ন ধরন শনাক্ত করেছেন তাঁরা। এই ধরণগুলো মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জটিল ঘুমের ধাপগুলোর সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে গেছে।

মাছ সাগরের তলদেশে ভেসে থাকে। কখনো প্রবালের ভেতরে আশ্রয় নেয়। পানির নিচের গুহার অন্ধকারেও কিছু মাছ লুকিয়ে থাকে। যেখানেই থাকুক, সুযোগ পেলেই মাছ আমাদের মতো বিশ্রাম নেয়। ঘুমিয়ে বা ঝিমিয়ে নেয়। ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করে।

মানুষের মতো বেশির ভাগ মাছও দিবাচর। মানে প্রধানত রাতে ঘুমায়, দিনে জেগে থাকে। মাছের চোখের পাতা নেই। তাই মাছ আমাদের মতো চোখ বন্ধ করে অন্ধকার তৈরি করতে পারে না। আলো এদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমের সময় মাছ আমাদের মতোই প্রায় স্থির হয়ে থাকে। আশপাশের উদ্দীপনায় আমাদের মতো ধীরে সাড়া দেয়। যদি এদের ঘুম থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে পরের রাতে এরা একটু বেশি ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে।

মানুষের মতো বেশির ভাগ মাছও দিবাচর। মানে প্রধানত রাতে ঘুমায়, দিনে জেগে থাকে
ছবি: ব্রিটানিকা

জুন মাসে নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মাছের ঘুম আসলে অনেকটা মানুষের ঘুমের মতো। জেব্রাফিশের চোখের নড়াচড়া অনুসরণ করে গবেষকেরা ঘুমের চারটি ভিন্ন উপধাপ শনাক্ত করতে পেরেছেন। যা মানুষের ঘুমের বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

গবেষণার সহলেখক এবং জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইন্সটিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল সাইবারনেটিকসের স্নায়ুবিজ্ঞানী মেংবো লি জানিয়েছেন, এদের ঘুমের গঠনেও জটিলতা রয়েছে।

আরও পড়ুন
মানুষের মতো বেশির ভাগ মাছও দিবাচর। মানে প্রধানত রাতে ঘুমায়, দিনে জেগে থাকে। মাছের চোখের পাতা নেই। তাই মাছ আমাদের মতো চোখ বন্ধ করে অন্ধকার তৈরি করতে পারে না।

মাছের ঘুমের চারটি উপধাপের মধ্যে তিনটি ঘটে রাতে। তিনটি ধাপ পার হতে সব মিলিয়ে সময় লাগে প্রায় ১০ ঘণ্টা। প্রথম ধাপে সবচেয়ে গভীর ঘুম হয়। এ সময় মাছের চোখ একদৃষ্টে স্থির থাকে। জেগে ওঠার সময় হয়ে এলে দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়। এটি অপেক্ষাকৃত হালকা ঘুমের ধাপ। এ সময় জেব্রাফিশের চোখ এক দিকে হালকা কেঁপে ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে চোখ আবার মাঝখানে ফিরে আসে।

তৃতীয় ধাপে ঘটে সকাল হওয়ার ঠিক আগে। এ সময় মাছের দুটি চোখ একই দিকে ঘুরে যায় এবং এভাবেই স্থির থাকে।

চতুর্থ ও শেষ ধাপটি দিনের বেলায় অল্প সময়ের জন্য ঘটে। এ সময় জেব্রাফিশের চোখ এদিক-সেদিক নড়াচড়া করে। মাছটিকে এই অবস্থায় দেখলে মনে হবে, আশপাশের সম্ভাব্য বিপদ খুঁজে দেখছে। তবে চোখ দেখে আমাদের ভুল ধারণাও হতে পারে। পাঁচ থেকে দশ মিনিটের এই ঝিমুনি এত গভীর, এ সময় মাছের মস্তিষ্কের অনেক কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মাছকে জাগানোও কঠিন।

গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা এমন একটি স্বয়ংক্রিয় মাইক্রোস্কোপ ও ক্যামেরা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছেন, যেটা অনেকটা নিজে নিজে চলে। এই গবেষণার আরেক সহলেখক ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের স্নায়ুবিজ্ঞানী ড্রু রবসন এই যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। এটি ১০৫টি মাছকে অনুসরণ করতে সক্ষম। যখন মাছগুলো সাঁতার কাটে, খাবার শিকার করে বা ঘুমায়, তখন এই যন্ত্র নিজে নিজে এই মাছদের অনুসরণ করে।

আরও পড়ুন
দিনের বেলায় অল্প সময়ের জন্য জেব্রাফিশের চোখ এদিক-সেদিক নড়াচড়া করে। মাছটিকে এই অবস্থায় দেখলে মনে হবে, আশপাশের সম্ভাব্য বিপদ খুঁজে দেখছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পিএইচডি শিক্ষার্থী ভিকাশ চৌধুরী। তিনি নিউইয়র্ক টাইমস-কে বলেছেন, ‘ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা কোনো প্রাণীর পুরো মস্তিষ্কের কার্যকলাপ আমরা রেকর্ড করতে পেরেছি।’

জেব্রাফিশের শরীর জীবনের প্রথম তিন সপ্তাহ স্বচ্ছ থাকে। ফলে বিজ্ঞানীরা ক্যালসিয়াম ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরাসরি এদের মস্তিষ্কের ভেতর দেখতে পারেন। এর মাধ্যমে ঘুমের বিভিন্ন ধাপে কোন কোন স্নায়ুকোষ সক্রিয় হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। ফলে পুরো শরীর ও চোখের নড়াচড়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কের কার্যকলাপও দেখা যায়।

জেব্রাফিশের শরীর জীবনের প্রথম তিন সপ্তাহ স্বচ্ছ থাকে। ফলে বিজ্ঞানীরা ক্যালসিয়াম ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরাসরি এদের মস্তিষ্কের ভেতর দেখতে পারেন
ছবি: ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল সাইবারনেটিক্স

জেব্রাফিশের মস্তিষ্ক মানুষের মস্তিষ্কের তুলনায় ছোট ও সরল হলেও ঘুমের সবচেয়ে মৌলিক প্রক্রিয়াগুলো বোঝার জন্য মাছটি বেশ কার্যকর। মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী অনেক জিন, স্নায়ুকোষ এবং ওষুধ মাছের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব ফেলে।

প্রায় সব প্রাণীই জীবনের বড় একটি অংশ ঘুমিয়ে কাটায়। কিন্তু কেন প্রাণীরা ঘুমায় এবং কোন প্রক্রিয়ায় ঘুম নিয়ন্ত্রিত হয়, সে সম্পর্কে এখনো গবেষকদের অনেক কিছু অজানা। এই গবেষণা হয়ত প্রাণীর ঘুম নিয়ে আরও জানতে সহায়তা করবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন