গামি ভিটামিন কী, বেশি খেলে কী হয়

এই নরম ও সুস্বাদু গামি ভিটামিনের কি কোনো অন্ধকার দিক আছে?ছবি: গেটি ইমেজ

রঙিন, নরম ও দারুণ স্বাদের জেলির টুকরো। মুখে দিলে অবিকল ক্যান্ডির মতো লাগে। প্যাকেটের গায়ে যদি আবার লেখা থাকে ভিটামিন, তবে তো সোনায় সোহাগা! স্বাদ ও স্বাস্থ্য উভয়ই যখন একসঙ্গে মিলছে, তখন এই গামি ভিটামিন খাওয়ার লোভ সামলানো সত্যিই কঠিন।

এই লোভ পুঁজি করেই বিশ্বজুড়ে গামি ভিটামিনের বাজার ফুলেফেঁপে উঠেছে। ২০২৫ সালে এসে এই বাজারের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে এই সংখ্যা একেবারে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এই বিশাল বাজারের প্রায় চার ভাগের এক ভাগই এখন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে।

চকচকে বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে আমরা অনেকেই ভাবি, এই চিবিয়ে খাওয়ার মিষ্টি ভিটামিনগুলো বুঝি সুস্বাস্থ্যের জাদুকরী শর্টকাট। কিন্তু এই নরম ও সুস্বাদু ভিটামিনের কি কোনো অন্ধকার দিক আছে? শুনলে হয়তো চমকে উঠবেন, আমেরিকার পয়জন সেন্টারের জাতীয় হেল্পলাইনে প্রতি বছর শুধু ভিটামিনের বিষক্রিয়া নিয়ে ৬০ হাজারেরও বেশি কল আসে! বেশির ভাগই আসে এমন আতঙ্কিত বাবা-মায়েদের কাছ থেকে, যাদের শিশুরা ক্যান্ডি ভেবে মুঠো মুঠো গামি ভিটামিন খেয়ে ফেলেছে।

তাহলে কি ভয় পাওয়া যৌক্তিক? আমেরিকার পয়জন সেন্টারগুলোর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর কেইট ব্রাউন অবশ্য অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘শিশুরা মাল্টিভিটামিন খেয়ে ফেলার পর পয়জন সেন্টারে কল এলেও, তাদের শরীরে বিষক্রিয়ার বড় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কারণ প্রতিটি ভিটামিনেই একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নিরাপদ সীমা থাকে।’

আরও পড়ুন
২০২৫ সালে এসে বিশ্বজুড়ে গামি ভিটামিনের বাজারের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে এই সংখ্যা একেবারে দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

তবে এই নিরাপদ সীমার একটি বড় ব্যতিক্রম আছে। তা হলো আয়রন বা লৌহ। লৌহ আমাদের রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে এবং শরীরে অক্সিজেন সরবরাহে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় এটি পাকস্থলীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে বমি বমি ভাব, বমি হওয়া এবং ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ডা. ব্রাউন সতর্ক করে বলেন, লৌহযুক্ত কোনো গামি ভিটামিন খাওয়ার পর শিশুদের মধ্যে এমন লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে’।

সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে এটি মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস নামে ভয়াবহ বিষক্রিয়ার রূপ নিতে পারে। এতে আপনার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে এবং চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুও হতে পারে।

একসঙ্গে অনেকগুলো গামি ভিটামিন খেয়ে ফেললে কী হবে?
ছবি: সিংগেল কেয়ার

আশার কথা হলো, আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে আয়রন পয়জনিংয়ে মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। কারণ এখন আয়রন বা লৌহযুক্ত পণ্যের ব্যবহার কমেছে। অনেক মাল্টিভিটামিন কোম্পানি এখন তাদের প্রোডাক্ট থেকে আয়রন একেবারেই বাদ দিয়ে দিচ্ছে।

তাহলে একসঙ্গে অনেকগুলো গামি ভিটামিন খেয়ে ফেললে কী হবে? এমন অবস্থায় পড়লেও তাৎক্ষণিক বিপদের ঝুঁকি হয়তো কম, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ঝুঁকি কিন্তু থেকেই যায়। কারণ মাল্টিভিটামিন নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া।

আরও পড়ুন
ভিটামিন ডি হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সাহায্য করে। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর প্রাথমিক লক্ষণ হলো শারীরিক দুর্বলতা ও বমি।

ভিটামিন মূলত দুই ধরনের—চর্বিদ্রাব্য বা ফ্যাট-সলিউবল এবং পানিদ্রাব্য বা ওয়াটার-সলিউবল। চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে হলো ফ্যাট-সলিউবল ভিটামিন। আর ওয়াটার-সলিউবল হলো পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন বি এবং সি। আপনি যদি অতিরিক্ত পানিদ্রাব্য ভিটামিন খান, তবে খুব একটা সমস্যা নেই। কারণ তা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু বিপত্তি বাধে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন নিয়ে। এগুলো আমাদের টিস্যু এবং হাড়ে জমা হয়। তাই অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে এগুলো শরীরে জমতে জমতে একসময় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে ভিটামিন ডি-এর কথা বলা যায়। এটি হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সাহায্য করে। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন এ খেলে লিভারের ক্ষতি, হাড়ে ব্যথা এবং চুল পড়ার মতো সমস্যা হতে পারে
ছবি: সংগৃহীত

এর প্রাথমিক লক্ষণ হলো শারীরিক দুর্বলতা ও বমি। চরম পর্যায়ে এটি হৃৎপিণ্ড এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাতেও ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে।

একই কথা ভিটামিন এ-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন এ খেলে লিভারের ক্ষতি, হাড়ে ব্যথা এবং চুল পড়ার মতো সমস্যা হতে পারে। তবে এটি কেবল তখনই ঘটবে, যখন আপনি টানা অনেক দিন ধরে প্রতিদিন অসংখ্য গামি ভিটামিন খেতে থাকবেন।

আরও পড়ুন
একটি মাল্টিভিটামিনে হয়তো ৫ থেকে ৩০ ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। কিন্তু প্রকৃত খাবারে প্রায় ২৬ হাজার ধরনের বায়োকেমিক্যাল থাকে, যা শরীরের হাজারো উপকারে আসে।

আর গামি ভিটামিন নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্বাস্থ্যকর ডায়েটের পরিপূরক হিসেবে এটি বেশ উপকারী হতে পারে। তবে আপনার বয়সের জন্য প্রতিদিন ঠিক কতটুকু ভিটামিন প্রয়োজন, তা প্যাকেটের গায়ে দেখে নেওয়া জরুরি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বোতলগুলো শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা ক্যান্ডি ও ওষুধের পার্থক্য মোটেও বোঝে না। মজার স্বাদ পেয়ে তারা বাবা-মায়ের অগোচরে গোটা বোতলই সাবাড় করে ফেলতে পারে!

মাল্টিভিটামিনের বড় কোনো বিপদ না থাকলেও, এগুলোর ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করাই ভালো। যাদের সাধারণ খাবার থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিতে সমস্যা হয়, তাদের জন্য মাল্টিভিটামিন দরকার হতে পারে। কিন্তু একে স্বাস্থ্যকর জীবনের সহজ শর্টকাট ভাবাটা বড় বোকামি। অনেক গামি ভিটামিনেই প্রচুর চিনি থাকে, যা অতিরিক্ত খেলে পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে।

গামি ভিটামিন নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্বাস্থ্যকর ডায়েটের পরিপূরক হিসেবে এটি বেশ উপকারী হতে পারে
ছবি: হেলথলাইন

একটি মাল্টিভিটামিনে হয়তো ৫ থেকে ৩০ ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। কিন্তু প্রকৃত খাবারে প্রায় ২৬ হাজার ধরনের বায়োকেমিক্যাল থাকে, যা শরীরের হাজারো উপকারে আসে। তাই আসল খাবারের বদলে শুধু বড়ি বা গামি খেয়ে সুস্থ থাকার আশা করাটা অবাস্তব।

আবার খরচের হিসাবটাও তো করতে হবে। বাজারে কিছু প্রিমিয়াম গামি ভিটামিনের বোতলের দাম প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে! লোভনীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে দামি ভিটামিনের পেছনে টাকা না ঢেলে, সেই টাকা দিয়ে তাজা ও স্বাস্থ্যকর খাবার কিনে খান। আপনার শরীর ক্যান্ডির চেয়ে আসল খাবারই বেশি ভালোবাসে!

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন