প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম: যে বিরল রোগে আক্রান্ত হলে কখনো পেটের ক্ষুধা মেটে না

অনেকেরই কিছু সময় পরপর ক্ষুধা লাগে। একটু খাবার খেলেই সেই ক্ষুধা মিটে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার ক্ষুধা লাগে। কিন্তু এভাবে যদি সারাজীবন আপনার পেট কখনো না ভরে? যদি আপনি সব সময় ক্ষুধার্ত থাকেন। এটি একটি বিরল রোগ। নাম প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম (Prader-Willi syndrome)। এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের পেটের ক্ষুধা কখনো মেটে না।

এটি বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০-৩০ হাজার মানুষের মধ্যে একজনের হয়। রোগটি সাধারণত বংশগত না। অর্থাৎ এটি বাবা-মায়ের জিন থেকে আসে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুর বেড়ে ওঠার সময় ক্রোমোজোমে পরিবর্তনের কারণে এই সিন্ড্রোম দেখা যায়। এই সিন্ড্রোমে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমানভাবে আক্রান্ত হন। এর প্রভাব সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০ থেকে ২০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।

আমাদের শরীরের গঠন ও কাজ করার জন্য মোট ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। এগুলো অনেকটা নির্দেশনার বইয়ের মতো। এখানে আমাদের শরীরের সব তথ্য জমা থাকে।

প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম হওয়ার মূল কারণ ক্রোমোজোম ১৫-এর কিছু নির্দিষ্ট জিনের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। যখন এই জিনগুলো অনুপস্থিত থাকে বা এরা কাজ করা বন্ধ করে দেয় তখনই এই রোগটি দেখা যায়। ক্রোমোজোম ১৫-এর যে অংশটি প্রভাবিত হয় তার বৈজ্ঞানিক নাম 15q11.2-q13। এই অঞ্চলটি প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম ও অ্যাঞ্জেলম্যান সিন্ড্রোম (PWS/AS) অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত। কারণ দুটি ভিন্ন রোগের জন্য একই স্থানে জেনেটিক ত্রুটি ঘটে।

আরও পড়ুন

আমাদের শরীরের গঠন ও কাজ করার জন্য মোট ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। এগুলো অনেকটা নির্দেশনার বইয়ের মতো। এখানে আমাদের শরীরের সব তথ্য জমা থাকে। এই বইয়ের অর্ধেক আসে মায়ের কাছ থেকে, আর বাকি অর্ধেক বাবার। তবে একটা মজার ব্যাপার হলো, একটি বিশেষ নিয়মের কারণে মা বা বাবার কাছ থেকে পাওয়া কিছু ডিএনএর নির্দেশনা সব সময় কাজ করে না। অর্থাৎ সেগুলো নিষ্ক্রিয় থাকে।

বাবার থেকে আসা ক্রোমোজোম ১৫-এর মধ্যে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনে সমস্যা থাকার কারণে প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম দেখা যায়। প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ক্রোমোজোমের একটি অংশ ভুল করে মুছে যায়। যেহেতু মায়ের থেকে আসা একই অংশের নির্দেশনা এমনিতেই নিষ্ক্রিয় থাকে। তাই শিশুর দেহে সেই জরুরি নির্দেশনাগুলো কাজ করতে পারে না। এছাড়া আরও কিছু বিরল ক্ষেত্রে এই রোগ হয়। প্রায় ৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে, তারা বাবার ক্রোমোজোম না পেয়ে মায়ের থেকে আসা দুটি ক্রোমোজোম ১৫ পায়। খুব কম ক্ষেত্রে, বাবার ক্রোমোজোম থাকলেও তাতে থাকা জিনগুলো ঠিকমতো কাজ করে না।

প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম হওয়ার মূল কারণ ক্রোমোজোম ১৫-এর কিছু নির্দিষ্ট জিনের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। যখন এই জিনগুলো অনুপস্থিত থাকে বা এরা কাজ করা বন্ধ করে দেয় তখনই এই রোগটি দেখা যায়।

প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম শরীরের অনেক অংশকে প্রভাবিত করে। আর লক্ষণগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। মস্তিষ্কের যে অংশটি ক্ষুধা, শরীরের তাপমাত্রা ও ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে, সেই হাইপোথ্যালামাস এই জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করা হয়। এই রোগে আক্রান্ত প্রায় সব শিশুর মধ্যেই জন্মগতভাবে পেশির হাইপোটোনিয়া দেখা যায়। ফলে শিশুকে কোলে নিলে তাদের শরীর খুব নরম ও দুর্বল মনে হয়। জন্মের পর এই পেশি দুর্বলতার কারণে শিশু ভালোভাবে খাবার খেতে পারে না। ফলে ওজন বৃদ্ধিতে সমস্যা হয়। স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ হয় না।

আরও পড়ুন

প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের অন্যান্য লক্ষণও দেখা যায়। চোখ কিছুটা কাঠবাদামের মতো দেখতে হয়। ওপরের ঠোঁট পাতলা হয় এবং মাথা লম্বা ও সরু হতে পারে। অনেক রোগীই স্বাভাবিকের চেয়ে কম উচ্চতার হয়। এর একটি প্রধান কারণ হলো গ্রোথ হরমোনের অভাব। এছাড়াও, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে OCA2 নামে একটি জিন অনুপস্থিত থাকার কারণে ত্বক ও চুলের রং খুব ফর্সা ও হালকা হয়।

সাধারণত ২-৮ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষুধা অনেক বেড়ে যায়। খাওয়ার পরেও কখনো পেট ভরা অনুভব করে না। এই অস্বাভাবিক ক্ষুধা বা হাইপারফ্যাজিয়ার কারণে তারা অতিরিক্ত খায়। ফলে স্থূলতা ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগ দেখা দেয়। মস্তিষ্কের যে অংশটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে হরমোন ও সংকেত আদান-প্রদানে সমস্যার কারণেই এমনটা হয় বলে মনে করা হয়।

মস্তিষ্কের যে অংশটি ক্ষুধা, শরীরের তাপমাত্রা ও ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে, সেই হাইপোথ্যালামাস এই জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করা হয়। এই রোগে আক্রান্ত প্রায় সব শিশুর মধ্যেই জন্মগতভাবে পেশির হাইপোটোনিয়া দেখা যায়।

প্রেডা-উইলি সিন্ড্রোমের কোনো প্রতিকার নেই এখনো। তবে এর লক্ষণগুলো অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। ছোট শিশুদের ডাক্তাররা অধিক ক্যালোরির বিশেষ ফর্মুলা বা টিউব ফিডিংয়ের পরামর্শ দেন। এছাড়াও, শরীরে যেসব হরমোন কম থাকে সেগুলোর অভাব পূরণের জন্য হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়। গ্রোথ হরমোন থেরাপি বিশেষত পেশির শক্তি ও শারীরিক বৃদ্ধি বাড়াতে ও শরীরের মেদ কমাতে সাহায্য করে। যথাযথ চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ৭০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারেন।

হাইপারফ্যাজিয়ার চিকিৎসার জন্য চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) প্রথম একটি ওষুধের অনুমোদন দিয়েছে। ৪ বছর বা এর বেশি বয়সী রোগীদের অতিরিক্ত ক্ষুধার সংকেত কমাতে সাহায্য করবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন