খুনের শিকার নারীর দেহে মিলল পুরুষের ডিএনএ, বিজ্ঞানের অদ্ভুত রহস্য

খুনের তদন্তে বেরিয়ে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভিকটিমের শরীরে মিলছে দুই ধরনের ডিএনএ! রক্তের নমুনায় দেখা যাচ্ছে তিনি পুরুষ, অথচ বাস্তবে তিনি নারী। চিকিৎসাবিজ্ঞান একে বলছে কাইমেরিজম। কিন্তু কীভাবে সম্ভব এমন অদ্ভুত ঘটনা?

ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনায় পাওয়া গেল ওয়াই ক্রোমোজোমছবি: শাটারস্টক/পিপলইমেজ

চীনে এক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এমন এক গোলকধাঁধায় পড়লেন, যা হার মানাবে যেকোনো থ্রিলার সিনেমাকেও। পুলিশ খুঁজে পেপেন এক নারীর লাশ, যাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। নিয়ম মেনে লাশের ফরেনসিক পরীক্ষা শুরু হলো। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনায় পাওয়া গেল ওয়াই ক্রোমোজোম। এই ক্রোমোজোম সাধারণত পুরুষদের থাকে। তাহলে ওই মৃত নারীর দেহে ওয়াই ক্রোমোজোম এল কীভাবে?

বিষয়টা বুঝতে একটু জীববিজ্ঞানের সাধারণ পাঠ জানা দরকার। নারীদের থাকে দুটি এক্স (XX) ক্রোমোজোম, আর পুরুষদের একটি এক্স ও একটি ওয়াই (XY) ক্রোমোজোম। সাধারণত নারীদের Y ক্রোমোজোম থাকে না। তাই রক্তে ওয়াই ক্রোমোজোম দেখে তদন্তকারীরা ভেবেছিলেন, ঘটনাস্থলে হয়তো কোনো পুরুষ উপস্থিত ছিল। খুনি নিজেও পুরুষ হতে পারে। হয়তো তার সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় রক্ত সেখানে পড়েছে। কিন্তু আরও গভীর পরীক্ষার পর তাদের চোখ কপালে উঠল। ওই রক্ত অন্য কোনো পুরুষের নয়, বরং খোদ ওই নারী ভিকটিমের নিজের! একজন স্বাভাবিক নারীর শরীরে পুরুষের ক্রোমোজোম এল কোত্থেকে?

নারীদের থাকে দুটি এক্স (XX) ক্রোমোজোম, আর পুরুষদের একটি এক্স ও একটি ওয়াই (XY) ক্রোমোজোম
ছবি: হেলথ ইন কোড

আরও বিস্তারিত তদন্তে জানা গেল, ওই নারী কাইমেরিজম নামে এক বিরল শারীরিক রোগে ভুগছিলেন। মানে, তাঁর শরীরে এমন সব কোষ ছিল যা জিনগতভাবে একে অপরের চেয়ে আলাদা। যেন এক মানুষের দেহে দুটি ভিন্ন স্বত্বা! 

গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, কাইমেরা হলো এমন এক অদ্ভুত দানব যার মাথা সিংহের, শরীর ছাগলের ও লেজ সাপের। অর্থাৎ এক শরীরে ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর অস্তিত্ব। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই নামটা সেখান থেকেই নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন
নারীদের থাকে দুটি এক্স (XX) ক্রোমোজোম, আর পুরুষদের একটি এক্স ও একটি ওয়াই (XY) ক্রোমোজোম। সাধারণত নারীদের Y ক্রোমোজোম থাকে না।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ওই নারীর শরীরে একেক অঙ্গে কোষের অনুপাত ছিল একেক রকম। ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা যায়, তাঁর চুলের নমুনায় থাকা কোষগুলোর বেশিরভাগই ছিল পুরুষের (XY)! আবার তাঁর কিডনিতে নারী ও পুরুষ কোষের অনুপাত ছিল প্রায় সমান সমান। শরীরের আরও ১৬টি টিস্যু পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে আবার নারী কোষের (XX) আধিপত্য বেশি।

অথচ তিনি দেখতে ছিলেন পুরোপুরি একজন স্বাভাবিক নারী। তাঁর শারীরিক গঠনে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না, এমনকি তিনি একটি পুত্রসন্তানও জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না যে, তাঁর নিজের শরীরেই আজীবন লুকিয়ে ছিল ওয়াই ক্রোমোজোম!

জীববিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সম্ভবত মায়ের পেটে থাকার সময় একটি ডিম্বাণু দুটি ভিন্ন শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত হয়েছিল, যার একটি বহন করছিল এক্স ক্রোমোজোম এবং অন্যটি ওয়াই ক্রোমোজোম। সাধারণত কাইমেরিজমের ক্ষেত্রে ভাবা হয়, দুটি আলাদা ডিম্বাণু দুটি আলাদা শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত হয়ে দুটি ভ্রুণ তৈরি করেছিল। কিন্তু পরে তারা মায়ের পেটে একীভূত হয়ে গেছে।

এই নারীর ক্ষেত্রে সেই তত্ত্ব খাটছে না। কারণ, তাঁর শরীরের পুরুষ (XY) কোষ এবং নারী (XX) কোষের ক্রোমোজোম ছিল হুবহু এক। শুধু একই ডিম্বাণু থেকে আসলে এই বিষয়টা সম্ভব। দুটি আলাদা ডিম্বাণু হলে তাদের এক্স ক্রোমোজোমও আলাদা হতো। তাই যমজ ভ্রুণ এক হয়ে যাওয়ার তত্ত্ব এখানে খাটে না।

আরও পড়ুন
জীববিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সম্ভবত মায়ের পেটে থাকার সময় একটি ডিম্বাণু দুটি ভিন্ন শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত হয়েছিল, যার একটি বহন করছিল এক্স ক্রোমোজোম এবং অন্যটি ওয়াই ক্রোমোজোম।

তাহলে ঘটনাটা ঘটল কীভাবে? কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক মাইকেল গ্যাবেট এর চমৎকার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘এখানে ট্রাইগ্যামেটিক কাইমেরিজম ঘটেছে। বিষয়টি একটু সহজ করে বলি। একটি ডিম্বাণুকে দুটি শুক্রাণু একসঙ্গে নিষিক্ত করেছিল। ফলে এমন একটি ভ্রুণ তৈরি হয় যার কাছে ক্রোমোজোমের তিনটি সেট ছিল। একটি মায়ের, দুটি বাবার। এরপর কোষ বিভাজনের সময় এটি তিনটি ভিন্ন ধরনের কোষে ভাগ হয়ে যায়। এর মধ্যে যে কোষটিতে শুধু বাবার দুটি শুক্রাণুর সেট ছিল, সেটি অস্বাভাবিক হওয়ায় মারা যায়। কিন্তু বাকি দুটি কোষ দিব্যি বেঁচে থাকে এবং বিভাজিত হয়ে এই নারীর শরীর গঠন করে।

এমন ঘটনা আগেও ঘটেছিল কিনা, তা বলা মুশকিল। কাইমেরিজমের কিছু কিছু কেসে শরীরের চামড়ায় দুই রঙের ছোপ দেখা যায়। যেমন মার্কিন  গায়িকা টেলর মুল তাঁর কাইমেরিজমের বিষয়টি জনসচেতনতা বাড়াতে সামনে এনেছিলেন।

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ধরা পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্রে লিডিয়া ফেয়ারচাইল্ড নামে এক নারীর এমনটি ঘটেছিল। ডিএনএ টেস্টে দেখা গিয়েছিল তিনি তাঁর নিজের সন্তানদের মা নন! পরে জানা যায়, তাঁর জরায়ুর কোষ আর লালার কোষের ডিএনএ আলাদা। অর্থাৎ তাঁর শরীরই ছিল তাঁর যমজ বোনের কোষ দিয়ে গঠিত। এই ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল।

আরও পড়ুন
একটি ডিম্বাণুকে দুটি শুক্রাণু একসঙ্গে নিষিক্ত করেছিল। ফলে এমন একটি ভ্রুণ তৈরি হয় যার কাছে ক্রোমোজোমের তিনটি সেট ছিল। একটি মায়ের, দুটি বাবার।

চীনের এই ঘটনাটি বিজ্ঞানের জন্য এক নতুন মাইলফলক। কারণ, এর আগে কোনো কাইমেরা রোগীর শরীরের এতগুলো অঙ্গ ও টিস্যু আলাদাভাবে পরীক্ষা করে এমন বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মাইকেল গ্যাবেট এবং ডেভিড হেইগের মতো বিশেষজ্ঞরা একমত যে, প্রকৃতির এই খেয়ালিপনা আমাদের ডিএনএ এবং মানুষের জন্মরহস্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে।

একই মানুষের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন ডিএনএ থাকতে পারে
ফাইল ছবি

আমরা ভাবি প্রতিটি মানুষের একটিই ডিএনএ প্রোফাইল থাকবে, কিন্তু একই মানুষের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন ডিএনএ থাকার এই ঘটনা ফরেনসিক সায়েন্সের জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ। খুনের শিকার না হলে হয়তো এই নারীর শরীরের এই গোপন রহস্য আজীবন অজানাই থেকে যেত।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

আরও পড়ুন