কম প্রোটিন খেলে কি বয়স ধীরে বাড়ে

আমরা কি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রোটিন খেয়ে অজান্তেই নিজেদের ক্ষতি করছি?

আজকাল সুপারশপে বা মুদি দোকানে গেলেই চোখে পড়ে প্রোটিন-সমৃদ্ধ নানা খাবারের ছড়াছড়ি। প্রোটিন বার, প্রোটিন শেক থেকে শুরু করে প্রোটিনসমৃদ্ধ কফিও পাওয়া যায়। আমাদের সবার মনেই সাধারণ একটি ধারণা গেঁথে আছে, প্রোটিন মানেই খুব দারুণ কিছু। যেন শরীর সুস্থ রাখতে ও পেশি মজবুত করতে এর কোনো বিকল্প নেই। প্রোটিন যত বেশি খাওয়া যাবে, ততই যেন লাভ। ফিটনেস সচেতন মানুষদের কাছে প্রোটিন যেন এক জাদুকরী উপাদান। কিন্তু বিজ্ঞানের হিসাব-নিকাশ কি সত্যিই এত সোজা? সাম্প্রতিক কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে একেবারেই ভিন্ন কথা। অন্যান্য প্রাণীর ওপর করা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন খাবারে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিলে তা উল্টো বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে এবং আয়ু অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে! তার মানে কি আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রোটিন খেয়ে অজান্তেই নিজেদের ক্ষতি করছি?

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটির গবেষক ডাডলি ল্যামিংয়ের মতে, ‘আমাদের মনে প্রোটিন নিয়ে একধরনের মোহ কাজ করে।’ কিন্তু তার সর্বশেষ গবেষণার তথ্য বলছে, যারা সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করেন বা কায়িক শ্রম একেবারে কম করেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত প্রোটিন উপকারের বদলে বিপাকীয় নানা সমস্যা ডেকে আনতে পারে। এমনকি এর ফলে তাদের আয়ুও কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন খাবারে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিলে তা উল্টো বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে এবং আয়ু অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে!

ল্যামিং এবং তার গবেষক দল ইঁদুরের ওপর করা প্রায় ৩০০টি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণাপত্র গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এই ইঁদুরগুলো মূলত অলস জীবনযাপন করত, অর্থাৎ ওগুলোর শারীরিক পরিশ্রম ছিল শূন্যের কোঠায়। গবেষণায় দেখা হয়েছে, শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি এড়ানোর জন্য ঠিক যতটুকু প্রোটিন দরকার, কেবল ততটুকু দিলে প্রাণীর বয়স এবং আয়ুর ওপর কেমন প্রভাব পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন মানুষের সুস্থ থাকার জন্য প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের বিপরীতে গড়ে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন দরকার। অনেক গবেষণায় ইঁদুরগুলোকে ঠিক এই ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রোটিন দেওয়া হয়েছিল। আবার কিছু ইঁদুরকে দেওয়া হয়েছিল এর ঠিক দ্বিগুণ প্রোটিন।

পরীক্ষার ফলাফল ছিল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। যে ইঁদুরগুলো একেবারে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় প্রোটিন খেয়ে বেঁচে ছিল, সেগুলো অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়া ইঁদুরের চেয়ে প্রায় ১২০ দিন বেশি বেঁচে ছিল! ইঁদুরের জীবনের মাপে এই ১২০ দিন মানে তাদের সাধারণ আয়ুর ৫০ শতাংশেরও বেশি সময়।

আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন মানুষের সুস্থ থাকার জন্য প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের বিপরীতে গড়ে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন দরকার।

কিন্তু প্রোটিন কম খেলে আয়ু বাড়ে কীভাবে? এর পেছনের বিজ্ঞানটা বেশ চমকপ্রদ। ল্যামিং জানাচ্ছেন, প্রোটিন কম খেলে শরীরে ‘FGF21’ নামের একটি বিশেষ হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। ইঁদুরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই হরমোনটি সরাসরি মস্তিষ্ক, চর্বি এবং লিভারে কাজ করে রক্তের শর্করার মাত্রা একদম ঠিক রাখে। পাশাপাশি এটি বুড়িয়ে যাওয়া কোষের সংখ্যা জাদুকরীভাবে কমিয়ে দেয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরে এই ধরনের অকেজো কোষ জমতে থাকে, যেগুলো আর নতুন করে বিভাজিত হতে পারে না। উল্টো এগুলো শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি করে। প্রোটিন কম খেলে এই ক্ষতিকর কোষগুলোর দাপট কমে যায়।

প্রোটিন কম খাওয়ার আরেকটি দারুণ দিক হলো, এটি ‘mTORC1’ নামে একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। শরীরের ভেতরে এই প্রোটিনটির মূল কাজ হলো কোষের সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করা। কিন্তু প্রোটিন কম খাওয়ার কারণে এর কার্যকারিতা যখন কমে যায়, তখন কোষগুলো নিজেদের সংখ্যা বাড়ানোর বদলে মেরামতের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।

প্রোটিন কম খাওয়ার আরেকটি দারুণ দিক হলো, এটি mTORC1 নামে একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়
ছবি: উইকিপিডিয়া

ল্যামিংয়ের ভাষায়, ‘কোষগুলো তখন দ্রুত বিভাজিত হওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের মেরামতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বয়সজনিত নানা রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায় এবং প্রাণীর আয়ু বাড়ে।’

তাহলে কি কাল থেকেই আমাদের সবার প্রোটিন খাওয়া ছেড়ে দেওয়া উচিত? মোটেও তা নয়। আপনি যদি নিয়মিত ভারী ব্যায়াম, দৌড়ঝাঁপ বা কঠোর কায়িক শ্রম করেন, তবে পেশির ক্ষয় পূরণের জন্য আপনার অতিরিক্ত প্রোটিন লাগবেই। কিন্তু আপনি যদি দিনের বেশির ভাগ সময় চেয়ারে বসে কাটান, তবে এই বাড়তি প্রোটিন আপনার উপকারের চেয়ে উল্টো ক্ষতিই বেশি করবে।

আরও পড়ুন
ল্যামিংয়ের ভাষায়, ‘কোষগুলো তখন দ্রুত বিভাজিত হওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের মেরামতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বয়সজনিত নানা রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।'

তবে বিজ্ঞান মানেই তো বিতর্ক আর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষক ডোনাল্ড লেম্যান অবশ্য এই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছেন—মানুষ আর ইঁদুরের প্রোটিন হজম বা বিপাক প্রক্রিয়া একেবারেই আলাদা। মানুষ সাধারণত দিনে তিন বা চারবার বড় আকারের খাবার খায়, কিন্তু ইঁদুর সারাদিন ধরেই টুকটাক করে খেতে থাকে। 'mTORC1' প্রোটিনটি মূলত খাবার খাওয়ার মাধ্যমেই সক্রিয় হয়। তাই খাবার খাওয়ার ভিন্ন অভ্যাসের কারণে প্রোটিন কমানোর প্রভাব মানুষ ও ইঁদুরের ওপর সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া ল্যাবরেটরির ইঁদুরের তুলনায় মানুষকে অনেক বেশি প্রতিকূল পরিবেশে বাস করতে হয়। যেমন সংক্রমণ বা অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে মানুষকে লড়াই করতে হয়, যা বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

লেম্যান আরও যুক্তি দেখান, ল্যামিংয়ের এই মেগা-রিভিউতে মানুষের ওপর করা সেই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো বাদ পড়েছে, যেখানে দেখা গেছে বয়স্কদের ক্ষেত্রে একটু বেশি প্রোটিন খেলে তাদের পেশি দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে যায়।

অবশ্য ল্যামিং এর জবাবে বলেছেন, তারা কোনো গবেষণাপত্রই ইচ্ছে করে বাদ দেননি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কেবল প্রোটিন কমানোর প্রভাবটি দেখা, বেশি খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা নয়। পেশি গঠন বা বয়স্কদের শারীরিক দুর্বলতা রোধ করা ছাড়া, বেশি প্রোটিন খেলে তা বয়স ধরে রাখতে আর কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না, তার প্রমাণ বিজ্ঞানের কাছে এখনো বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ।

আরও পড়ুন
ল্যাবরেটরির ইঁদুরের তুলনায় মানুষকে অনেক বেশি প্রতিকূল পরিবেশে বাস করতে হয়। যেমন সংক্রমণ বা অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে মানুষকে লড়াই করতে হয়, যা বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

যেমন, যুক্তরাজ্যে বয়স্ক যমজদের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, বেশি প্রোটিন পেশি ক্ষয়ের ঝুঁকি কমায়। কিন্তু শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক এলিজাবেথ উইলিয়ামসের মতে, ওই গবেষণায় পেশি ক্ষয়ের হার এতই কম ছিল যে, এই সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য বলা যায় না।

তবে যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটির গবেষক ফিলিপ আথারটন এই বিতর্কের মাঝে একটি মধ্যবর্তী আশার কথা শুনিয়েছেন। মাংস, মাছ বা দুগ্ধজাত খাবারে আইসোলিউসিন এবং ভ্যালিনের মতো বেশ কিছু নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, খাবার থেকে পুরো প্রোটিন না কমিয়ে যদি শুধু এই নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো কমিয়ে দেওয়া যায়, তাহলেও আয়ু বাড়ার ক্ষেত্রে ঠিক একই রকম ভালো ফল পাওয়া যায়।

মাংস, মাছ বা দুগ্ধজাত খাবারে আইসোলিউসিন এবং ভ্যালিনের মতো বেশ কিছু নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে
ছবি: আইস্টক

আথারটন শিগগিরই মানুষের ওপর এমন একটি গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছেন। তিনি দেখতে চান, মানুষের শরীর থেকে নির্দিষ্ট কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড কমিয়ে দিলে তা রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কতটা জাদুকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো এই গবেষণার ফলাফল আমাদের হাতে আসবে। তখনই হয়তো আমরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারব, দীর্ঘায়ু পাওয়ার আসল চাবিকাঠি কি সত্যিই আমাদের প্রতিদিনের প্রোটিনের প্লেটে লুকিয়ে আছে, নাকি এই রহস্য লুকিয়ে আছে অন্য কোথায়!

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

আরও পড়ুন