বয়স বাড়ার সঙ্গে খাবারের পুষ্টিগুণ যেভাবে বদলে যায়

খাবার থেকে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ভিটামিন সংগ্রহ করেছবি: সেরেনিটি স্ট্রাল / বিবিসি

বেঁচে থাকার জন্য আমরা প্রতিদিন নানা ধরনের খাবার খাই। এসব খাবার থেকেই শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ভিটামিন সংগ্রহ করে। ফলে আমাদের বিপাক কার্যক্রম সচল থাকে। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাস যে জরুরি, তা এখন সবাই মানেন। তবে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে কোন খাবার কতটা দরকার, তা কিন্তু এক নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝা যাক। সে সময় ব্রিটিশ সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছিল। এর আওতায় প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার দেওয়া হতো। চিনিও ছিল এর অন্তর্ভুক্ত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সপ্তাহে প্রায় ৮ আউন্স বা ২২৭ গ্রাম চিনি পেতেন, কিন্তু দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো চিনি বরাদ্দ ছিল না। ১৯৫৩ সালে যখন এই নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়, তখন প্রাপ্তবয়স্কদের চিনি খাওয়ার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

২০২৫ সালের এক গবেষণায় আন্তর্জাতিক গবেষক দল যুক্তরাজ্যে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রায় ৬৩ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, যেসব শিশু মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় এবং জন্মের পর প্রথম এক হাজার দিনে চিনি কম পেয়েছিল, পরবর্তী জীবনে তাদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি প্রায় ২০ শতাংশ, হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৩১ শতাংশ কম ছিল।

অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার যেকোনো বয়সের জন্যই ক্ষতিকর
ছবি: লয়োলা মেডিসিন

সহজ কথায়, অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার যেকোনো বয়সেই ক্ষতিকর। তবে সব খাবারের হিসাব এমন নয়। বয়সভেদে খাবারের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা বদলে যায়। চলুন দেখা যাক, জীবনের কোন পর্যায়ে কেমন খাবার প্রয়োজন।

আরও পড়ুন
গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় এবং জন্মের পর প্রথম এক হাজার দিনে চিনি কম পেয়েছিল, পরবর্তী জীবনে তাদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি প্রায় ২০ শতাংশ কম ছিল।

শৈশবকাল

ছোট শিশু ও নবজাতকদের দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য প্রচুর শক্তি দরকার। তাই তাদের জন্য দুধ ও পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারের ফ্যাট খুবই প্রয়োজনীয়। অথচ এই একই খাবার ২০-৩০ বছর বয়সী কারও জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। শিশুদের যেহেতু শক্তির চাহিদা বেশি, তাই তাদের এমন খাবার দরকার যা অল্প পরিমাণে খেলেও প্রচুর পুষ্টি জোগায়।

শৈশবের খাবার শুধু শক্তির উৎস নয়, এটি শরীর ও মস্তিষ্ক গঠনের মূল ভিত্তি। তাই শিশুদের কেবল ক্যালরি পেলেই চলে না, প্রয়োজন সঠিক ও পুষ্টিকর ক্যালরি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং পেশির বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তাদের খাদ্যতালিকায় আয়রন, আয়োডিন এবং বিভিন্ন ভিটামিন থাকা জরুরি।

শিশুদের যেহেতু শক্তির চাহিদা বেশি, তাই তাদের এমন খাবার দরকার যা অল্প পরিমাণে খেলেও প্রচুর পুষ্টি জোগায়
ছবি: সেরেনিটি স্ট্রাল / বিবিসি

শিশুদের খাবারে পর্যাপ্ত ফল, সবজি, পূর্ণশস্যজাত খাবার, শিম, মসুর ডাল এবং বাদামের মতো ভালো মানের চর্বি রাখা দরকার। এড়িয়ে চলতে হবে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর জন্মের পর প্রথম এক হাজার দিন এবং স্কুলজীবন পর্যন্ত হাড়ের গঠন ও ঘনত্ব বৃদ্ধির প্রধান সময়। তাই এ সময় ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এগুলো হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শক্ত হাড় গঠনের জন্য অপরিহার্য। পরবর্তী জীবনে হাড়ক্ষয় রোধে এর ভূমিকা অপরিসীম। তাই শিশুদের খাবারে দুধ, দই, পনিরের মতো ক্যালসিয়ামের উৎস এবং মাছ ও ডিমের মতো ভিটামিন ডি-এর উৎস রাখা জরুরি।

আরও পড়ুন
শৈশবের খাবার শুধু শক্তির উৎস নয়, এটি শরীর ও মস্তিষ্ক গঠনের মূল ভিত্তি। তাই শিশুদের কেবল ক্যালরি পেলেই চলে না, প্রয়োজন সঠিক ও পুষ্টিকর ক্যালরি।

কৈশোরকাল

শৈশবের মতো কৈশোরও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময়েই মানবদেহের হাড় ও পেশির গঠন প্রায় চূড়ান্ত রূপ পায়। পড়াশোনা, কাজ, সামাজিক মেলামেশার আক্রণে এ বয়সে পুষ্টির চাহিদাও বেড়ে যায়। কিশোর বয়স ও যৌবনের শুরুর দিকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শরীরের বৃদ্ধি কিছুটা কমে এলেও, এ সময়ে গড়ে ওঠা খাদ্যাভ্যাসই পরবর্তী জীবনে হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

গবেষকদের মতে, কৈশোরে খাবারের বড় অংশ হওয়া উচিত উদ্ভিদভিত্তিক
ছবি: সেরেনিটি স্ট্রাল / বিবিসি

অনেক হৃদ্‌রোগের ভিত্তি এই বয়সেই তৈরি হয়, যা পরে প্রকাশ পায়। কৈশোরে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও আয়রনের চাহিদা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি থাকে। বিশেষ করে কিশোরীদের পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর আয়রনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া প্রোটিন ও ভিটামিন-বি শরীরের শক্তি ও বৃদ্ধির জন্য জরুরি। গবেষকদের মতে, এ বয়সে খাবারের বড় অংশ হওয়া উচিত উদ্ভিদভিত্তিক। প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। প্রচুর ফল, সবজি, পূর্ণশস্য, ডাল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার খাওয়া ভালো। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি এবং উদ্ভিদজাত খাবার কম খেলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগের হার বাড়ে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও সঠিক খাদ্যাভ্যাস জরুরি।

আরও পড়ুন
গবেষকদের মতে, কৈশোরে খাবারের বড় অংশ হওয়া উচিত উদ্ভিদভিত্তিক। প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। প্রচুর ফল, সবজি, পূর্ণশস্য, ডাল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার খাওয়া ভালো।

মধ্যবয়স

যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব পুষ্টিবিদ্যার অধ্যাপক এলিজাবেথ উইলিয়ামসের মতে, ‘মধ্যবয়সে খাদ্যাভ্যাস এমন হওয়া উচিত যা বার্ধক্যের সুস্থতা নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে নারীদের মেনোপজের সময় সঠিক পুষ্টি উপাদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় হাড়ের ঘনত্ব কমে, পেশিক্ষয় দেখা দেয় এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। মেনোপজ কেবল হাড়ক্ষয় নয়, স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। প্রজননক্ষম বয়সে ইস্ট্রোজেন হরমোন ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়। কিন্তু মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ায় পেটের ভেতরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে।

যারা নিয়মিত ফল, সবজি, পূর্ণশস্য, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার খান, তাদের স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি
ছবি: হিরো মেডিকেশন ডিসপেনসার

তবে সুখবর হলো, সঠিক খাদ্যাভ্যাসে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ৩৯ বছর বা তার বেশি বয়সী এক লাখের বেশি মানুষের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ফল, সবজি, পূর্ণশস্য, অসম্পৃক্ত চর্বি, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার খান, তাদের স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য বলতে ৭০ বছর পর্যন্ত বড় কোনো রোগ ছাড়া বেঁচে থাকা এবং মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখাকে বোঝানো হয়েছে। চল্লিশ ও পঞ্চাশের কোঠায় হৃদ্‌স্বাস্থ্য এবং হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি ও শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া পেশির ক্ষয় রোধে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো প্রয়োজন। সব মিলিয়ে উদ্ভিদসমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসই এ বয়সে শরীরকে সুস্থ রাখে।

আরও পড়ুন
মেনোপজ কেবল হাড়ক্ষয় নয়, স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। প্রজননক্ষম বয়সে ইস্ট্রোজেন হরমোন ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।

বার্ধক্যকাল

বয়স বাড়লে শরীরের শক্তির চাহিদা কমে, তাই ক্যালরি কম লাগে। কিন্তু পুষ্টির চাহিদা কমে না। হাড় ও পেশি ঠিক রাখতে এ বয়সেও পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান দরকার। গবেষকদের মতে, বার্ধক্যে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া উচিত। এগুলোর ঘাটতি হলে হাড়ভঙ্গুরতার ঝুঁকি বাড়ে। ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় দুধ, চিজ ও পালংশাকের মতো খাবারে; আর ভিটামিন ডি-এর উৎস হলো তৈলাক্ত মাছ ও ডিম। পাশাপাশি পেশিক্ষয় বা সারকোপেনিয়া ঠেকাতে পর্যাপ্ত প্রোটিন খেতে হবে। তবে শুধু প্রোটিন নয়, এর সঙ্গে কার্বোহাইড্রেট ও ভালো মানের চর্বি থাকতে হবে।

গবেষকদের মতে, বার্ধক্যে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত
ছবি: প্রিমিয়ার অর্থোপিডিকস

এদিকে ১০০ বছরের বেশি বেঁচে থাকা মানুষদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁদের অন্ত্রের অণুজীব বা মাইক্রোবায়োম বেশ বৈচিত্র্যময় হয়। বয়স বাড়লে অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া কমে যায় এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাড়ে। এই ভারসাম্যহীনতা আলঝেইমার ও হৃদ্‌রোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। গবেষণায় Faecalibacterium prausnitzii নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পাওয়া গেছে, যা সুস্থ বার্ধক্যের জন্য সহায়ক। আঁশজাতীয় খাবার ও রঙিন ফলমূল খেলে এই উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়ে। এছাড়া সুস্থ অন্ত্র বয়সজনিত ভিটামিন শোষণ কমে যাওয়ার সমস্যা মেটাতেও সাহায্য করে। কারণ উপকারী ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন বি-১২ ও ফলিক অ্যাসিড তৈরি করতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন