মুখে ঘা হয় কেন, কী করলে ভালো হবে
দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন। মুখে খাবার নিতেই শুরু হলো তীব্র জ্বালা! খেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। অথচ সকালেও তো মুখ একদম ঠিক ছিল। হঠাৎ এমন কী হলো? এই পরিস্থিতির সঙ্গে কমবেশি সবাই পরিচিত। মূলত মুখের ভেতরের নরম অংশে যখন ছোট ছোট সাদা বা লালচে ক্ষত তৈরি হয়, তখনই এই যন্ত্রণা শুরু হয়। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে ক্যানকার সোর।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এটি কেন হয়? আমাদের কোনো অভ্যাস কি এর জন্য দায়ী? নাকি শরীরের ভেতরে কোনো কিছুর অভাব থেকে এই ক্ষত হচ্ছে? তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। এই ছোট ঘায়ের পেছনে যেমন নানা কারণ আছে, তেমনি আছে তা দ্রুত সারিয়ে তোলার সহজ কিছু উপায়ও।
কাদের বেশি হয়
ক্যানকার সোর বা অ্যাফথাস আলসার হলো মুখের ভেতরের ছোট ছোট ঘা। যেকোনো বয়সের নারী-পুরুষের এটি হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। ক্যানকার সোর সাধারণত বেশ যন্ত্রণাদায়ক হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই ধরনের ঘায়ের শিকার হন।
মুখের ভেতরের নরম অংশে যখন ছোট ছোট সাদা বা লালচে ক্ষত তৈরি হয়, তখনই মুখে খাবার নিতেই যন্ত্রণা শুরু হয়। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে ক্যানকার সোর।
লক্ষণ ও জ্বরঠোসার সঙ্গে পার্থক্য
মুখে ঘা হওয়ার আগে আক্রান্ত স্থানে কিছুটা ঝিনঝিন বা সুড়সুড়ি অনুভূত হতে পারে। এ ছাড়া অনেক সময় জ্বর, ক্লান্তি কিংবা লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দেয়। ঘাগুলো সাধারণত মুখের ভেতরের দুপাশের নরম অংশে, ঠোঁটের নিচের অংশে, মাড়ি বা জিহ্বায় ছোট ও সাদা ক্ষত হিসেবে দেখা যায়।
তবে অনেকে একে জ্বরঠোসার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য হলো, এদের অবস্থান। ক্যানকার সোর সব সময় মুখের ভেতরে হয়। অন্যদিকে কোল্ড সোর সাধারণত মুখের বাইরে বা ঠোঁটের চারপাশে ছোট ফোস্কার মতো দেখা দেয়। কোল্ড সোরও সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়।
মুখের ঘায়ের ধরন
মুখের ঘা সাধারণত তিন ধরনের হয়। মাইনর, মেজর এবং হার্পেটিফর্ম।
১. মাইনর
এটিই সবচেয়ে সাধারণ। এই ঘাগুলো দেখতে ডিম্বাকৃতির এবং আকারে আধা ইঞ্চির চেয়েও ছোট হয়। এর ব্যথা সাধারণত কয়েক দিন থাকে এবং কোনো ওষুধ ছাড়াই এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ঘা পুরোপুরি সেরে যায়।
২. মেজর
এই ঘাগুলো আকারে আধা ইঞ্চির চেয়ে বড় হয় এবং এর চারপাশটা অমসৃণ থাকে। এগুলো সারতে প্রায় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং সেরে যাওয়ার পর মুখে দাগ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. হার্পেটিফর্ম
এটি খুব একটা দেখা যায় না। সাধারণত বয়স্কদের ক্ষেত্রে এমনটি হয়। এতে একসঙ্গে ১০ থেকে ১০০টি ছোট ছোট ঘায়ের গুচ্ছ দেখা দিতে পারে। তবে সংখ্যায় বেশি হলেও এগুলো খুব দ্রুত, অর্থাৎ এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেরে যায়।
ক্যানকার সোর সব সময় মুখের ভেতরে হয়। অন্যদিকে কোল্ড সোর সাধারণত মুখের বাইরে বা ঠোঁটের চারপাশে ছোট ফোস্কার মতো দেখা দেয়। কোল্ড সোরও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়।
মুখে ঘা হওয়ার কারণ
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে, মুখের ঘায়ের কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। অনেক সময় মুখের ভেতরে ছোটখাটো আঘাতের কারণে এমনটা হয়। ভুলবশত জিহ্বা বা গালে কামড় লাগা, দাঁতের চিকিৎসার সময় আঘাত পাওয়া, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত বা অ্যাসিডিক খাবার খাওয়া, এমনকি খুব জোরে দাঁত ব্রাশ করার কারণেও এই ঘা হতে পারে।
চিকিৎসকেরা মনে করেন, হরমোনের পরিবর্তন, খাবারের অ্যালার্জি, ভাইরাসের সংক্রমণ কিংবা বংশগতির কারণেও এই সমস্যা হতে পারে। ১৯৭৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের পরিবারে আগে থেকেই মুখের ঘায়ের ইতিহাস আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যমজ সন্তান ও নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এই জিনগত সংযোগের প্রমাণ পেয়েছেন।
মানসিক চাপের সঙ্গেও এই ঘায়ের সম্পর্ক আছে। অতিরিক্ত উদ্বেগের সময় এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া নারীদের মাসিক চক্রের সময় শরীরে যে পরিবর্তন ঘটে, তার কারণেও নারীদের মধ্যে এই ক্যানকার সোর হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহৃত টুথপেস্ট বা মাউথওয়াশে যদি সোডিয়াম লরিল সালফেট বেশি থাকে, তবে সেটিও ঘায়ের কারণ হতে পারে। এ ছাড়াও পেটের আলসার সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া কিংবা অন্ত্রের বিভিন্ন রোগের কারণেও বারবার মুখে ঘা হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, খাবারে ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি-১ ও বি-১২, জিংক বা আয়রনের অভাব থাকলে বারবার মুখে ঘা হতে পারে। এমনকি ভিটামিন বি-৩ বা নিয়াসিনের সামান্য অভাবও এর কারণ হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে ডাক্তার আপনাকে এই পুষ্টি উপাদানের সাপ্লিমেন্ট নিতে বলতে পারেন।
১৯৭৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের পরিবারে আগে থেকেই মুখের ঘায়ের ইতিহাস আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
চিকিৎসা ও করণীয়
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুখের ঘা নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবে ব্যথা কমাতে কার্বামাইড পারক্সাইড, মেন্থল বা ইউক্যালিপটাসযুক্ত মলম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নেবেন।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
সাধারণত ঘরোয়া উপায়েই এই ঘা সেরে যায়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
১. যদি খুব বেশি জ্বর হলে
২. ঘা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বা আকারে অস্বাভাবিক বড় হলে।
৩. তিন সপ্তাহের বেশি সময় ঘা স্থায়ী হলে।
৪. সাধারণ ওষুধে ব্যথা না কমলে বা ব্যথার কারণে পর্যাপ্ত পানি পান করতে না পারলে।
সমপরিমাণ পানি ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড মিশিয়ে ঘায়ের ওপর লাগানোর পর সামান্য মিল্ক অব ম্যাগনেসিয়া ব্যবহার করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। বেশি জ্বালা করলে অল্প ঘি লাগানো যেতে পারে।
ঘরোয়া প্রতিকার
ওষুধের পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া উপায় ক্যানকার সোরের যন্ত্রণা কমাতে বেশ কার্যকর। ক্যানকার সোর হলে লবণ-পানি দিয়ে দিনে কয়েকবার কুলকুচি বা গার্গল করলে ব্যথা কমে। সমপরিমাণ পানি ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড মিশিয়ে ঘায়ের ওপর লাগানোর পর সামান্য মিল্ক অব ম্যাগনেসিয়া ব্যবহার করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া বেনাড্রিল ও মিল্ক অব ম্যাগনেসিয়ার মিশ্রণ দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেললেও বেশ আরাম পাওয়া যায়। বেশি জ্বালা করলে অল্প ঘি লাগানো যেতে পারে।
মুখের ঘা বা ক্যানকার সোর পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো নিশ্চিত উপায় নেই। তবে কিছু সতর্কতা মেনে চললে এই যন্ত্রণাদায়ক ঘা থেকে দূরে থাকা সম্ভব। ঘা হলে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মুচমুচে, টক বা অনেক বেশি মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চললে মুখের জ্বালাপোড়া কম হয়।
এ ছাড়া নিয়মিত দাঁত ও মুখ পরিষ্কার রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুব জরুরি। আর খাবার খাওয়ার সময় কথা না বলা ভালো। এতে ভুলবশত গাল বা জিহ্বায় কামড় লাগার সম্ভাবনা থাকে। এর থেকেও অনেক সময় ঘা হতে পারে।