২০২৫ সালে মস্তিষ্ক নিয়ে ১০টি চমকপ্রদ আবিষ্কার

মানুষের মস্তিষ্ক মহাবিশ্বের অন্যতম জটিল বস্তুছবি: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

মানুষের মস্তিষ্ক এক বিস্ময়কর জগত। ৮৬ বিলিয়ন নিউরন আর ১০০ ট্রিলিয়ন সিন্যাপস দিয়ে তৈরি এই অঙ্গটি মহাবিশ্বের অন্যতম জটিল বস্তু। প্রতি বছরই বিজ্ঞানীরা একে বোঝার চেষ্টা করেন, আর প্রতিবারই নতুন নতুন সব তথ্য আমাদের অবাক করে দেয়। ২০২৫ সালও এর ব্যতিক্রম ছিল না। চলুন দেখে নেওয়া যাক, এই বছর মস্তিষ্ক নিয়ে বিজ্ঞানীদের সেরা ১০টি আবিষ্কার, যা আপনার নিজের মস্তিষ্ককেও ভাবিয়ে তুলবে!

১. মস্তিষ্কের ৫টি যুগ

বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখেছেন, আমাদের মস্তিষ্কের জীবনচক্রেও ৫টি আলাদা যুগ আছে। মানুষের বয়সের ৯, ৩২, ৬৬ এবং ৮৩ বছরে মস্তিষ্কের গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। মজার ব্যাপার হলো, ৯ থেকে ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টাকে মস্তিষ্কের জন্য কৈশোরকাল ধরা হচ্ছে!

২. শৈশবের হারানো স্মৃতি

ছোটবেলার কথা, বিশেষ করে ১-২ বছর বয়সের স্মৃতি আমাদের মনে থাকে না। আমরা ভাবতাম, হয়তো তখনো মস্তিষ্ক স্মৃতি জমাতে শেখে না।

ছবি: ফ্লিন্ট রিহ্যাব

কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। ১ বছর বয়সেই শিশুদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস দিব্যি স্মৃতি তৈরি করতে পারে। তার মানে স্মৃতিগুলো ঠিকই জমা হয়, কিন্তু বড় হওয়ার পর আমরা সেই স্মৃতিগুলো আর খুঁজে পাই না। কেন পাই না, সেটাই এখন রহস্য।

আরও পড়ুন
মানুষের বয়সের ৯, ৩২, ৬৬ এবং ৮৩ বছরে মস্তিষ্কের গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। মজার ব্যাপার হলো, ৯ থেকে ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টাকে মস্তিষ্কের জন্য কৈশোরকাল ধরা হচ্ছে!

৩. অ্যালঝেইমার্সের নতুন সূত্র

বড়দের অ্যালঝেইমার্স রোগের জন্য টাউ নামের একধরনের প্রোটিন দায়ী। এই প্রোটিন মস্তিষ্কের কোষে জট পাকিয়ে ফেলে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, নবজাতক শিশুদের মস্তিষ্কেও এই প্রোটিন প্রচুর পরিমাণে থাকে, অথচ তাদের কোনো ক্ষতি হয় না! অর্থাৎ, বড়দের ক্ষেত্রে এই ক্ষতিকর পরিবর্তন হয়তো ঠেকানো বা নিরাময় করা সম্ভব।

৪. বৃদ্ধ বয়সেও জন্মায় নিউরন

এত দিন ধারণা ছিল, আমরা নির্দিষ্ট সংখ্যক নিউরন নিয়ে জন্মাই এবং বড় হওয়ার পর আর নতুন নিউরন তৈরি হয় না। কিন্তু এই বছর বিজ্ঞানীরা ৭৮ বছর বয়সী মানুষের মস্তিষ্কেও সদ্যজাত নিউরন খুঁজে পেয়েছেন! অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কেও নতুন কোষের জন্ম প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটাল।

মস্তিষ্কে একটি মাইক্রোস্কোপিক নিউরাল নেটওয়ার্কের একটি চিত্র।
ছবি: গেটি ইমেজ

৫. কল্পনা বনাম বাস্তব

আপনি যখন একটা আপেলের কথা কল্পনা করেন এবং সত্যি সত্যি আপেল দেখেন, তখন মস্তিষ্কের কাজকর্মে খুব একটা তফাত থাকে না। তাহলে মস্তিষ্ক বোঝে কীভাবে, কোনটা সত্যি আর কোনটা কল্পনা? বিজ্ঞানীরা ফিউজিফর্ম জাইরাস নামে মস্তিষ্কের একটি অংশে বিশেষ এক বাস্তবতা সংকেত খুঁজে পেয়েছেন। এই সংকেতই বলে দেয় কোনটা আসল। এই ব্যবস্থায় গণ্ডগোল হলেই মানুষ হ্যালুসিনেশন দেখতে শুরু করে।

৬. হান্টিংটন রোগের আশা

হান্টিংটন রোগের চিকিৎসায় এক বিশাল সাফল্য এসেছে। AMT-130 নামের একটি ওষুধ এই রোগের গতি ধীর করে দিচ্ছে। এটিই প্রথম ওষুধ, যা শুধু লক্ষণ নয়, সরাসরি রোগের বিরুদ্ধেই কাজ করে। তবে এটি প্রয়োগ করতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার এক জটিল ব্রেইন সার্জারির প্রয়োজন হয়।

আরও পড়ুন
এই বছর বিজ্ঞানীরা ৭৮ বছর বয়সী মানুষের মস্তিষ্কেও সদ্যজাত নিউরন খুঁজে পেয়েছেন! অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কেও নতুন কোষের জন্ম প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

৭. প্রাইমেটদের বুদ্ধিমত্তা

মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের খুব বিশেষ মনে করি। কিন্তু শিম্পাঞ্জিরাও যে কম বিশেষ নয়, তা এই বছর প্রমাণ হলো। যেমন, শিম্পাঞ্জিরা প্রমাণ বিচার করতে পারে। নতুন কোনো তথ্য পেলে তারা আগের ধারণা বদলাতে পারে। অর্থাৎ, ভুল প্রমাণিত হলে যুক্তি দিয়ে তাদের বিশ্বাস শুধরে নিতে পারে। আবার বোনোবোরা বুঝতে পারে, একজন মানুষ নির্দিষ্ট কোনো বিষুয়ে কিছু জানে কি না। এই ক্ষমতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে থিওরি অব মাইন্ড। অর্থাৎ, অন্যের মনে কী আছে, তা আন্দাজ করার ক্ষমতা।

শিম্পাঞ্জিরা প্রমাণ বিচার করতে পারে
ছবি: মার্টিন রুয়েগনার/গেটি ইমেজ

৮. রংধনুর বাইরের রং

আমাদের চোখ লাল, নীল ও সবুজ আলো দিয়েই সব রং তৈরি করে। জীববিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, পৃথিবীতে এমন কোনো আলো নেই যা শুধু চোখের সবুজ রং শনাক্তকারী কোষ উদ্দীপিত করতে পারে। কিন্তু গবেষকেরা এই অসম্ভব কাজটাই করে দেখিয়েছেন। পাঁচজন অংশগ্রহণকারীর চোখে বিশেষভাবে লেজার ব্যবহার করে তাঁরা শুধু সেই কোষগুলোকে সক্রিয় করেন। ফলে অংশগ্রহণকারীরা একেবারে নতুন একটি রং দেখেন, যে রং সাধারণত মানুষের চোখে দেখা যায় না। বিজ্ঞানীরা এই রঙের নাম দিয়েছেন ওলো। এটি অতি তীব্র এক ধরনের নীলাভ সবুজ রং।

আরও পড়ুন
শিম্পাঞ্জিরা প্রমাণ বিচার করতে পারে। নতুন কোনো তথ্য পেলে তারা আগের ধারণা বদলাতে পারে। অর্থাৎ, ভুল প্রমাণিত হলে যুক্তি দিয়ে তাদের বিশ্বাস শুধরে নিতে পারে।

৯. জ্বলজ্বলে মস্তিষ্ক

আমাদের মস্তিষ্কও আলো ছড়ায়! যেকোনো জীবন্ত টিস্যু শক্তি খরচ করার সময় উপজাত হিসেবে বায়োফোটন নামে আলো নিঃসরণ করে। যেহেতু মস্তিষ্ক প্রচুর শক্তি খরচ করে, তাই এটিও জ্বলজ্বল করে। বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো খুলির বাইরে থেকে এই আলো শনাক্ত করেছেন। এমনকি আমরা যখন ভিন্ন ভিন্ন কাজ করি, তখন এই আলোর ধরনও বদলে যায়।

যেহেতু মস্তিষ্ক প্রচুর শক্তি খরচ করে, তাই এটিও জ্বলজ্বল করে
ছবি: সায়েন্স ডেইলি ডটকম

১০. সবচেয়ে বড় রহস্য ‘চেতনা’

মস্তিষ্ক নিয়ে সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, মস্তিষ্ক কীভাবে চেতনাবোধ তৈরি করে? কোটি কোটি নিউরনের সক্রিয়তা কীভাবে মিলেমিশে আপনার চারপাশের জগতকে অনুভব করার অভিজ্ঞতা বানায়? চেতনা কী, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক তত্ত্ব আছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে দুটি তত্ত্বের মধ্যে লড়াই হয়েছিল। এই বৈজ্ঞানিক মোকাবিলার ফল খুব একটা স্পষ্ট নয়। কিছু ধারণা মিলেছে, আবার অনেক মৌলিক দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এতে বোঝা যায়, আমাদের মন ও চেতনা কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে বিজ্ঞান এখনও হয়তো অন্ধকারেই হাঁটছে। চেতনার রহস্যভেদ করতে আমাদের যে আরও বহুদূর যেতে হবে, তা আবারও প্রমাণিত হলো।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন