টেরি প্র্যাচেটের উপন্যাসে লুকিয়ে থাকা রোগের সংকেত খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা

ব্রিটেনের অন্যতম সেরা লেখক টেরি প্র্যাচেটছবি: বেন স্ট্যানসাল / এএফপি / গেটি ইমেজ

টেরি প্র্যাচেট ব্রিটেনের অন্যতম সেরা লেখক। তাঁর কল্পনার জাদুতে মানুষ যেমন হেসেছে, তেমনি চিন্তাভাবনা করতেও বাধ্য হয়েছে। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল শাণিত রসবোধ ও নিখুঁত বর্ণনা। কিন্তু তাঁর মধ্যেই যে বাসা বাঁধছিল এক ভয়ানক অসুখ, তা কেউ জানত না। অসুখটার নাম পোস্টেরিওর কর্টিক্যাল অ্যাট্রোফি। এটি আলঝেইমারের একটি বিরল রূপ।

এখন এই রোগটা ডাক্তারদের কাছে পরিচিত হলেও কিছু বছর আগেও অপরিচিত ছিল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ডাক্তাররা এই রোগ ধরার বহু বছর আগেই টেরি প্র্যাচেটের তাঁর একটি উপন্যাসে এই রোগের ব্যাপারে লিখেছিলেন।

ডিমেনশিয়ার প্রথম ধাক্কাটা স্মৃতিশক্তিতে লাগে না, লাগে ভাষায়
ছবি: নর্টনআরএসএক্স / ক্যানভা

ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ শুনলেই আমরা ভাবি মানুষটা বোধ হয় নাম ভুলে যাচ্ছে, কিংবা চাবি কোথায় রেখেছে তা মনে করতে পারছে না। কিন্তু রোগের শুরু তো এত নাটকীয়ভাবে হয় না। গবেষকেরা বলছেন, ডিমেনশিয়ার প্রথম ধাক্কাটা স্মৃতিশক্তিতে লাগে না, লাগে ভাষায়। শব্দভাণ্ডার একটু ছোট হয়ে আসে, বর্ণনার ধরণটা একটু একঘেয়ে হয়ে যায়। সমস্যা হলো, এই পরিবর্তনগুলো এতই সূক্ষ্ম যে, সাধারণ চোখে তা ধরা পড়ে না। মনে হয় হয়তো বয়সের দোষ বা কাজের চাপে এমন হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের লফবোরো ইউনিভার্সিটি এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা এবার গোয়েন্দার ভূমিকায় নামলেন। তাঁরা টেরি প্র্যাচেটের মেডিকেল রিপোর্ট ঘাঁটলেন না, ঘাঁটলেন তাঁর লেখা বইগুলো। তাঁরা দেখলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্র্যাচেটের লেখার স্টাইল কীভাবে বদলেছে। বিশেষ করে তাঁরা নজর দিলেন প্র্যাচেটের লেখার বিশেষণের দিকে।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা বলছেন, ডিমেনশিয়ার প্রথম ধাক্কাটা স্মৃতিশক্তিতে লাগে না, লাগে ভাষায়। শব্দভাণ্ডার একটু ছোট হয়ে আসে, বর্ণনার ধরণটা একটু একঘেয়ে হয়ে যায়।

ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো! প্র্যাচেটের শেষের দিকের উপন্যাসগুলোতে বিশেষণের ব্যবহার পরিসংখ্যানগতভাবে কমে গিয়েছিল। তার মানে এই নয় যে লেখার মান খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আপনি হয়তো ধরতেই পারবেন না। কিন্তু কম্পিউটারের চোখে ধরা পড়ল, লেখকের বর্ণনার সেই আগের ‘রঙিন’ ভাবটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।

সবচেয়ে বড় চমকটা ছিল তাঁর দ্য লাস্ট কন্টিনেন্ট বইয়ে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ডাক্তাররা তাঁকে ডিমেনশিয়া রোগী হিসেবে ঘোষণা করার প্রায় ১০ বছর আগে। অথচ এই বইটিতেই প্রথমবারের মতো তাঁর শব্দভাণ্ডারের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

টেরি প্র্যাচেটের লেখা বই দ্য লাস্ট কন্টিনেন্ট
ছবি: আমাজন ইউকে

এর মানে কী? এর মানে হলো, রোগের লক্ষণ বাইরে প্রকাশ পাওয়ার বহু বছর আগেই মস্তিষ্কের ভেতরে এর কাজ শুরু হয়ে গেছে। একে বলা হয় প্রাক-লক্ষণ পর্যায়। টেরি প্র্যাচেট জানতেনই না তিনি অসুস্থ, কিন্তু তাঁর মস্তিষ্ক অবচেতনভাবে সেই সংকেত দিয়ে যাচ্ছিল তাঁর লেখার মাধ্যমে।

কিন্তু এই গবেষণা জেনে আমাদের লাভ কী? লাভটা বিশাল। ডিমেনশিয়ার চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রোগটা ধরা পড়তে অনেক দেরি হয়ে যায়। তত দিনে অনেক ক্ষতি হয়ে যায় মস্তিষ্কের। বর্তমানে লিকানেমাব বা ডোনাডিমাবের মতো নতুন কিছু ওষুধ এসেছে। এগুলো রোগের গতি কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এগুলো রোগের একদম শুরুতে প্রয়োগ করলেই শুধু ভালো কাজ করে।

আরও পড়ুন
সবচেয়ে বড় চমকটা ছিল টেরি প্র্যাচেটের দ্য লাস্ট কন্টিনেন্ট বইয়ে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ডাক্তাররা তাঁকে ডিমেনশিয়া রোগী হিসেবে ঘোষণা করার প্রায় ১০ বছর আগে।

ভাষা বিশ্লেষণের এই পদ্ধতি আমাদের সেই সুযোগটা করে দিতে পারে। ভবিষ্যতে হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আপনার ইমেইল, মেসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট বিশ্লেষণ করে আপনাকে সতর্ক করে দেবে। কিন্তু কোনো রক্ত পরীক্ষা বা ব্রেইন স্ক্যান ছাড়া শুধু ভাষার পরিবর্তন দেখে যদি রোগ ধরা যায়, তবে হাজার হাজার মানুষকে হয়তো ভয়াবহ পরিণতির হাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করা যাবে।

টেরি প্র্যাচেট
ছবি: ব্যাং মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল / অ্যালামি

টেরি প্র্যাচেট আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অনেক বছর হলো। কিন্তু তাঁর লেখা বইগুলো কেবল বিনোদন দিয়েই শেষ হয়ে যায়নি; সেগুলো আজ হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানের এক অমূল্য দলিল। তিনি আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেলেন শব্দেরাও কথা বলে, এমনকি অসুখের কথাও!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও পড়ুন