স্বাদের নাম উমামি

আমাদের জিবে স্বাদের জন্য আলাদা রিসেপ্টর বা সংবেদনশীল কোষ রয়েছেছবি: সংগৃহীত

খাবারের স্বাদ নিয়ে কথা বললেই আমাদের মাথায় ঝটপট চারটি নাম চলে আসে—মিষ্টি, নোনতা, টক আর তিতা। রসনাবিলাসীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই চার স্বাদের ভেতরেই সব খাবারের রহস্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা যখন ধোঁয়া ওঠা এক বাটি গরম স্যুপে চুমুক দিই, কিংবা চিজ মাখানো পিৎজায় কামড় দিই, তখন জিবে এমন এক অতুলনীয় তৃপ্তি আসে, যাকে ঠিক মিষ্টি, টক বা নোনতা কোনো ক্যাটাগরিতেই ফেলা যায় না। এই রহস্যময়, ভরাট আর মুখভরা তৃপ্তিদায়ক স্বাদটির নামই হলো উমামি—যা আজ বিশ্বজুড়ে শেফ এবং খাদ্যবিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

উমামি কী? কেন একে বোঝানো এত কঠিন?

উমামি একটি জাপানি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো মনোরম সুস্বাদু স্বাদ। সহজ ভাষায় একে বলা যায় ‘ডিপ সেভরি টেস্ট’ বা গভীর মুখরোচক স্বাদ। ১৯০৮ সালে জাপানি রসায়নবিদ কিকুনায়ে ইকেদা প্রথম এই স্বাদটি আবিষ্কার করেন। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেন যে, আমাদের জিবে এই স্বাদের জন্য আলাদা রিসেপ্টর বা সংবেদনশীল কোষ রয়েছে। সেই কোষগুলোই একে মিষ্টি বা টকের মতোই একটি মৌলিক স্বাদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ছবি: লেপিসিয়ের

উমামিকে এককথায় বোঝানো কঠিন, কারণ এটি কোনো একক তীব্র স্বাদ নয়। এটি মূলত এমন এক অনুভূতি, যা খাবারকে কেবল মজাদারই করে না, বরং মুখের ভেতর একধরনের ভরাট, গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী তৃপ্তি দেয়। খাবারটা খাওয়ার পর যখন মনে হয়—বাহ্, দারুণ রিচ এবং স্যাটিসফায়িং!—তখন বুঝবেন আপনি আসলে উমামি স্বাদের জাদু উপভোগ করছেন।

আরও পড়ুন
উমামি একটি জাপানি শব্দ। এর মানে ডিপ সেভরি টেস্ট। বিংশ শতাব্দীতে এই স্বাদকে বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে মৌলিক স্বাদ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। উমামিকে এককথায় বোঝানো একটু কঠিন।

বিজ্ঞানের চোখে উমামি: এই স্বাদ কেন হয়?

উমামি স্বাদের পেছনে রয়েছে খাঁটি বিজ্ঞান। আমাদের শরীরে প্রোটিন তৈরির জন্য যে অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রয়োজন হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো গ্লুটামেট। কোনো খাবারে এই গ্লুটামেট উপাদানটি উচ্চমাত্রায় থাকলে আমাদের জিবের উমামি রিসেপ্টরগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মস্তিষ্কে তৃপ্তির সংকেত পাঠায়।

মজার ব্যাপার হলো, খাবার যখন রান্না করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে পচানো বা গাঁজানো হয়, কিংবা প্রাকৃতিকভাবে রোদে পেকে যায়—তখন তার ভেতরের প্রোটিন ভেঙে প্রচুর পরিমাণে মুক্ত গ্লুটামেট তৈরি হয়। আর তখনই খাবারে উমামি স্বাদের বিস্ফোরণ ঘটে।

কোন খাবারে উমামি স্বাদ বেশি থাকে?

যেহেতু এটি প্রোটিনের সাথে যুক্ত, তাই প্রাকৃতিকভাবেই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারে উমামি বেশি পাওয়া যায়। যেমন: মাংস ও মাছ: গরুর মাংসের ব্রুথ (স্টক), মুরগির স্যুপ এবং চর্বিযুক্ত মাছ। সবজি: মাশরুম (বিশেষ করে ড্রাইড বা শুকনো মাশরুম) এবং পাকা টমেটো। টমেটো যত পাকে, তার উমামি স্বাদ তত বাড়ে। দুগ্ধজাত পণ্য: পারমিসান বা চেডার চিজের মতো ওল্ড বা এজেড চিজ।

ছবি: রিডার্স ডাইজেস্ট

পাস্টুরাইজড ও ফারমেন্টেড খাবার: সয়া সস, ফিশ সস এবং টেস্টিং সল্ট (মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট)। আমরা রান্নায় যে টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করি, তা মূলত উমামি স্বাদেরই একটি ঘনীভূত রূপ।

আরও পড়ুন
কোনো খাবারে গ্লুটামেট উপাদানটি উচ্চমাত্রায় থাকলে আমাদের জিবের উমামি রিসেপ্টরগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মস্তিষ্কে তৃপ্তির সংকেত পাঠায়।

বিশ্বব্যাপী মিসো কেন এত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে

সম্প্রতি ফুড ভ্লগার ও ফুড রাইটারদের সবচেয়ে প্রিয় সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্ট হয়ে উঠেছে মিসো পেস্ট। এটি মূলত গাঁজানো সয়াবিনের পেস্ট, যা জাপানি রান্নায় বহুল ব্যবহৃত। বিশেষজ্ঞদের মতে, টমেটোর গ্লুটামেট ও মিসোর গ্লুটামেট একসঙ্গে মিশে ফ্লেভারকে আরও গভীর করে। তাই বিশ্বব্যাপী টমেটোর সসকে আরও মুখরোচক করতে ব্যবহৃত হচ্ছে মিসো। বিশেষ করে হোয়াইট মিসো তুলনামূলক হালকা হওয়ায় টমেটো সসে দারুণ মানিয়ে যায়। বাংলাদেশেও সুপারশপগুলোতে ঢুঁ দিলেই মিলে যাবে মিসো পেস্ট। এর বাইরে সয়া সস, ফিশ সস, মাশরুমের গুঁড়া ও পারমিসান চিজ রিন্ডও টমেটোর সস ও অন্যান্য খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে। কেননা, এগুলো খাবারের উমামি স্বাদ বাড়াতে দারুণ কাজ করে।

সূত্র: পারফেক্ট ডেইলি গ্রিন্ড

আরও পড়ুন