মহাকাশে কি সত্যিই সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব
ইলন মাস্কের মতো স্বপ্নদ্রষ্টারা প্রতিনিয়ত আমাদের এক নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, যেখানে মানুষ পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের অন্য কোনো গ্রহে নিজেদের স্থায়ী বসতি গড়বে। ঠিক যেমন লাখ লাখ বছর আগে আমাদের আদিপুরুষেরা আফ্রিকার কোল থেকে বেরিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তেমনি আমরাও একদিন ছড়িয়ে পড়ব সৌরজগতের নানা প্রান্তে।
কল্পনা করতে দারুণ লাগলেও, মহাকাশে রকেট পাঠানো এবং সেখানে মানবজাতির বংশবৃদ্ধি করা কি একই কথা? সায়েন্স ফিকশন মুভিগুলোতে মহাকাশযানের ভেতরে মানুষের জন্ম নেওয়ার দৃশ্য আমরা হরহামেশাই দেখি। কিন্তু মহাকাশে কি মানুষের পক্ষে প্রাকৃতিকভাবে সন্তান জন্ম দেওয়া আসলেই সম্ভব? বাস্তব বিজ্ঞান কিন্তু এখানে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে!
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি এই বিষয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, মহাকাশের মাইক্রোগ্র্যাভিটির মধ্যে মানুষের শুক্রাণু ডিম্বাণুর দিকে ঠিকমতো সাঁতার কাটতেই পারে না! বহু কষ্টে যদি তারা মিলিত হয়ে ভ্রূণ তৈরিও করে, তবু পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণের তুলনায় মহাকাশে সেই ভ্রূণের বিকাশ হয় অত্যন্ত নাজুক এবং দুর্বল।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির প্রজনন জীববিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান নিকোল ম্যাকফারসন এই ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি মহাকাশে দীর্ঘস্থায়ী বসতি গড়তে চাই, তবে বারবার পৃথিবী থেকে রকেটে করে মানুষ পাঠানোর বদলে সেখানেই আমাদের প্রজনন বা বংশবৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। মহাকাশ বসতির স্বপ্ন এখন আর শুধু ভবিষ্যতের গল্প নয়, এটি এখনই ঘটছে!’
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের মতে, মহাকাশের মাইক্রোগ্র্যাভিটির মধ্যে মানুষের শুক্রাণু ডিম্বাণুর দিকে ঠিকমতো সাঁতার কাটতেই পারে না!
কীভাবে এল এই গবেষণার ধারণা
নিকোল ম্যাকফারসন আগে ডায়েট এবং স্থূলতা কীভাবে প্রজননে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে কাজ করতেন। একদিন ব্রিটিশ পদার্থবিদ ব্রায়ান কক্সের একটি স্পেস ডকুমেন্টারি দেখার পর তাঁর মাথায় মহাকাশে প্রজননের এই অদ্ভুত আইডিয়াটি আসে। এরপর ফায়ারফ্লাই বায়োটেক নামে একটি স্পেস মেডিসিন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে তিনি তাঁর ল্যাবের জন্য একটি থ্রিডি ক্লিনোস্ট্যাট যন্ত্র জোগাড় করে ফেলেন।
এটি কোনো সাধারণ যন্ত্র নয়! এটি একটি অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ, যা নমুনাগুলোকে দুটি অক্ষের চারপাশে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক মহাকাশের মতো মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এর ভেতরের কোষগুলো বুঝতেই পারে না তারা মহাশূন্যে ভাসছে, নাকি পৃথিবীতে আছে!
এই যন্ত্রের ভেতরে নিকোল এবং তাঁর দল মানুষের, ইঁদুরের এবং শুকরের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু নিয়ে একটি কৃত্রিম স্ত্রী-প্রজনন নালি তৈরি করেন। ফলাফল ছিল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো! তাঁরা দেখলেন, পৃথিবীর স্বাভাবিক অভিকর্ষের তুলনায় কৃত্রিম মহাকাশ-পরিবেশে প্রায় ৩০ শতাংশ কম শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে পেরেছে।
থ্রিডি ক্লিনোস্ট্যাট যন্ত্রটি একটি অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ, যা নমুনাগুলোকে দুটি অক্ষের চারপাশে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক মহাকাশের মতো মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
কিন্তু এমনটা কেন হলো? বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, শুক্রাণু সাধারণত কিছু রাসায়নিক সংকেতের ওপর নির্ভর করে ডিম্বাণুর পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু নিকোল ম্যাকফারসন জানালেন, এই পথ চেনার জন্য অভিকর্ষও সমানভাবে জরুরি!
শুক্রাণুরা সাধারণত যেকোনো পৃষ্ঠের কাছাকাছি সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। পৃথিবীতে অভিকর্ষের কারণে তারা সহজেই বুঝতে পারে পৃষ্ঠতলটি কোন দিকে আছে। কিন্তু মহাকাশে যেহেতু অভিকর্ষ নেই, তাই শুক্রাণুগুলো মহাশূন্যে ভাসমান নভোচারীদের মতোই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সেগুলো বুঝতেই পারে না তারা কোথায় আছে বা কোন দিকে তাদের গন্তব্য! ফলে তারা পথ হারিয়ে ফেলে।
শুক্রাণুর এই পথ হারানোই গল্পের শেষ নয়। যেসব শুক্রাণু সব বাধা পেরিয়ে বহু কষ্টে ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছে, তাদের তৈরি করা প্রাথমিক ভ্রূণ শুরুতে বেশ শক্তিশালীই মনে হয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন সেই ভ্রূণগুলোকে আরও বেশিসময় ধরে মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরিবেশে রেখে দিলেন, তখন দেখা গেল এক অশনিসংকেত! সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে তৈরি হওয়া সেই ভ্রূণগুলোর গুণগত মান দ্রুত কমতে থাকে এবং পৃথিবীর স্বাভাবিক পরিবেশে তৈরি হওয়া ভ্রূণগুলোর তুলনায় তাদের বিকাশ অনেক বেশি পিছিয়ে পড়ে।
পৃথিবীতে অভিকর্ষের কারণে শুক্রাণুরা সহজেই বুঝতে পারে পৃষ্ঠতলটি কোন দিকে আছে। কিন্তু মহাকাশে যেহেতু অভিকর্ষ নেই, তাই শুক্রাণুগুলো মহাশূন্যে ভাসমান নভোচারীদের মতোই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
ভবিষ্যতের মহাকাশযাত্রা
এই গবেষণা থেকে একটি ব্যাপার একদম পরিষ্কার, মহাকাশে মানুষের বসতি গড়া শুধু রকেট বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর নির্ভর করছে না, বরং আমাদের নিজেদের শরীর এবং জীববিজ্ঞানও এখানে এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন মহাকাশে অত্যন্ত জটিল, এমনকি অসম্ভবও হতে পারে!