মহাকাশে প্রথম মানুষ ইউরি গ্যাগারিন নয়! তাহলে কে?

আলবার্ট ডব্লিউ স্টিভেন্স এবং অরভিল এ অ্যান্ডারসন কি প্রথম মহাকাশে পৌঁছানো মানুষ?ছবি: হেরিটেজ ইমেজ পার্টনারশিপ লিমিটেড / আলামি

পরিষ্কার দিনে পৃথিবী থেকে মহাকাশের দিকে যাত্রা করলে চোখের সামনেই আকাশের রং বদলাতে দেখবেন। জানালার বাইরের পরিচিত উজ্জ্বল নীল রংটা ওপরের দিকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় হতে থাকবে। একসময় নীল রং পুরোপুরি গায়েব হয়ে যাবে, আপনার চারপাশ ঘিরে ধরবে মহাকাশের নিকষ কালো অন্ধকার।

বর্তমান সময়ে এই কথাগুলো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। আমরা সবাই জানি, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সূর্যের আলোর বিক্রিয়ার কারণেই আকাশ নীল দেখায়। নভোচারীরা নিজের চোখে সেই অন্ধকার মহাকাশ দেখে এসেছেন। কিন্তু ইতিহাস সব সময় এমন ছিল না।

এই যে নীল আকাশ পেরিয়ে কালো মহাকাশে প্রবেশের অভিজ্ঞতা, এটি প্রথম কার হয়েছিল? আপনি হয়তো একবাক্যে বলে উঠবেন, ইউরি গ্যাগারিন! মহাকাশে যাওয়া প্রথম মানুষ হিসেবে তো আমরা তাঁর নামই জেনে এসেছি। কিন্তু তিনি কি সত্যিই প্রথম ছিলেন?

ইউরি গ্যাগারিন
ছবি: সভফটো / ইউনিভার্সাল ইমেজ / গেটি ইমেজ

প্রথমেই আমাদের ঠিক করতে হবে, মহাকাশ আসলে শুরু হয় কোথা থেকে। আর এর উত্তর নির্ভর করে আপনি মহাকাশ বলতে কী বোঝাচ্ছেন, তার ওপর। আন্তর্জাতিক সংস্থা ফেডারেশন অ্যারোনটিক ইন্টারন্যাশনালের মতে, পৃথিবী থেকে ১০০ কিলোমিটার ওপরে মহাকাশের সীমানা। একে বলা হয় কারমান লাইন। আবার যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও সামরিক বাহিনীর মতে, এই সীমানা প্রায় ৮০ কিলোমিটার ওপরে। এই নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলোর পেছনে অনেক জটিল হিসাবনিকাশ আছে। তবে মূল ধারণাটি হলো, যেখানে গিয়ে বায়ুমণ্ডল এতই পাতলা হয়ে যায় যে সাধারণ উড়োজাহাজ আর উড়তে পারে না, সেখান থেকেই মহাকাশের শুরু।

আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক সংস্থা ফেডারেশন অ্যারোনটিক ইন্টারন্যাশনালের মতে, পৃথিবী থেকে ১০০ কিলোমিটার ওপরে মহাকাশের সীমানা। একে বলা হয় কারমান লাইন।

তবে এই সংজ্ঞাগুলো মূলত প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক বিবেচনা করে দেওয়া হয়েছে। আপনি যদি অক্সফোর্ড ডিকশনারি খোঁজেন, তবে দেখবেন লেখা আছে, ‘পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরের ভৌত জগৎই হলো মহাকাশ।’ শুনতে খুব সহজ মনে হলেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ঠিক কোথায় শেষ হয়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণাও যুগে যুগে বদলেছে। আধুনিক গবেষণা বলছে, বায়ুমণ্ডলের বিস্তৃতি আমাদের আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। পৃথিবী থেকে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার কিলোমিটার দূরে যাওয়ার পর বায়ুমণ্ডলের আর কোনো অণু অবশিষ্ট থাকে না। মজার ব্যাপার হলো, কোনো মানুষ আজ পর্যন্ত এত দূর পৌঁছাতেই পারেনি! নাসার আসন্ন আর্টেমিস ২ মিশনে নভোচারীরা চাঁদ ছাড়িয়ে আরও ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে যাবেন। এটি আগের সব রেকর্ড ভাঙলেও ডিকশনারির সংজ্ঞার সেই মহাকাশ থেকে তারা আরও ২ লাখ কিলোমিটার পিছিয়ে থাকবেন!

নাসার আসন্ন আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা
ছবি: নাসা

এর মানে এই নয় যে অ্যাপোলোর নভোচারীরা মহাকাশে যাননি। কিন্তু বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে আমরা যদি ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক মাপকাঠিতে মহাকাশকে সংজ্ঞায়িত করি, তবে কেমন হয়?

এই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সীমানাই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে—সেই বিন্দু, যেখানে পৌঁছালে বায়ুমণ্ডল এতই পাতলা হয়ে যায় যে তা আর সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করতে পারে না। আমাদের পরিচিত নীল আকাশ মিলিয়ে যায় এক অসীম কালো শূন্যতায়। কয়েক শ বছর ধরে ইউরোপের মানুষ বিশ্বাস করত, পুরো মহাকাশটাই বুঝি উজ্জ্বল নীল! তারা ভাবত, রাতের অন্ধকার হলো কেবল পৃথিবীর নিজের ছায়া, যা সাময়িকভাবে মহাকাশের নীল রংকে ঢেকে দেয়। মাত্র ১৭ শতকে এসে বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেন, মহাকাশ আসলে নিকষ কালো। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে সেই নীল মহাকাশের ধারণা রয়ে গিয়েছিল মহাকাশ যুগের একদম আগমুহূর্ত পর্যন্ত।

আরও পড়ুন
কয়েক শ বছর ধরে ইউরোপের মানুষ বিশ্বাস করত, পুরো মহাকাশটাই বুঝি উজ্জ্বল নীল! তারা ভাবত, রাতের অন্ধকার হলো কেবল পৃথিবীর নিজের ছায়া, যা সাময়িকভাবে মহাকাশের নীল রংকে ঢেকে দেয়।

তাই ঐতিহাসিকের চোখে সেই মানুষটিকেই প্রথম নভোচারী বলা যেতে পারে, যিনি প্রথম এত উঁচুতে উড়েছিলেন; যেখান থেকে আকাশকে কালো হতে দেখেছিলেন। যিনি নিজের চোখে প্রাচীন সেই ভুল ধারণা ভেঙে সত্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

১৯৩০-এর দশকে বেশি উচ্চতায় ওড়া বেলুনযাত্রীরা এই সীমানার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপ্লোরার ২ বেলুনে চড়ে আলবার্ট স্টিভেন্স এবং অরভিল অ্যান্ডারসন ২২.১ কিলোমিটার উঁচুতে পৌঁছে একটি রেকর্ড গড়েন। পৃথিবীর প্রায় সব বায়ুমণ্ডল তখন তাদের নিচে। তাঁরা রেডিওতে জানান, ‘ওপরের আকাশটা ভীষণ অন্ধকার, কিন্তু একে এখনো নীলই বলা যায়, খুব গাঢ় নীল।’

এরপর ১৯৫৬ সালে ম্যালকম রস এবং লি লুইস স্ট্র্যাটো-ল্যাব ১ বেলুনে করে ২৩.২ কিলোমিটার ওপরে ওঠেন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিচে নেমে আসার আগে তাঁরা সেখানে কয়েক মিনিট ছিলেন।

১৯৩৫ সালে এক্সপ্লোরার ২ বেলুনে চড়ে স্টিভেন্স ও অ্যান্ডারসনের ২২.১ কিমি উচ্চতার বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন
ছবি: আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি / সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি

ইউএস নেভির এক নিউজলেটারে লেখা হয়েছিল, ‘এটাই ছিল প্রথমবার, যখন মাথার ওপরের আকাশকে কালো দেখা গিয়েছিল।’ ঠিক এক বছর পর ডেভিড সাইমন্স ম্যানহাই ২ বেলুনে চড়ে ২২.৯ কিলোমিটার উঁচুতে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকার এক আকাশের কথা জানান।

এর মধ্যেই রকেট-চালিত বিমানগুলো এমন উচ্চতায় পৌঁছাতে শুরু করেছিল। তবে তাদের পাইলটরা হয়তো সেই কালো আকাশ দেখার সুযোগ পাননি। ১৯৫১ সালে উইলিয়াম ব্রিজম্যান একটি রকেট প্লেনে ২৪.২ কিলোমিটার উঁচুতে ওঠেন। কিন্তু আকাশ কেমন ছিল, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই আকাশের রং কেমন ছিল। হয়তো অন্ধকার ছিল, কিন্তু আমি প্লেন চালাতে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে বাইরে তাকানোর সুযোগ পাইনি।’

আরও পড়ুন
১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপ্লোরার ২ বেলুনে চড়ে আলবার্ট স্টিভেন্স এবং অরভিল অ্যান্ডারসন ২২.১ কিলোমিটার উঁচুতে পৌঁছে একটি রেকর্ড গড়েন। পৃথিবীর প্রায় সব বায়ুমণ্ডল তখন তাদের নিচে।

রস ও লুইসের বেলুনযাত্রার মাত্র এক মাস আগে, আইভেন কিঞ্চেলো নামে এক পাইলট বেল এক্স-২ বিমানে করে ৩৮.৫ কিলোমিটার উঁচুতে ওঠেন। এটিও খুব অল্প সময়ের একটি ফ্লাইট ছিল। কালো আকাশ দেখেছিলেন কি না, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি সরাসরি সূর্যের দিকে মুখ করে ওড়ায় আকাশটাকে নীলচে-কালো মনে হচ্ছিল। কিন্তু যখনই তিনি সূর্যের উল্টো দিকে তাকান, আকাশটা পরিষ্কার কালির মতো কালো হয়ে যায়। তিনিই প্রথম মানুষ, যিনি ১ লাখ ফুটের বেশি উঁচুতে উঠেছিলেন। তাঁর জীবনীকার তাঁকে ‘প্রথম মহাকাশচারী’ উপাধিও দিয়েছিলেন।

কিন্তু ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক ১ কৃত্রিম উপগ্রহ এবং ১৯৬১ সালে গ্যাগারিনের যাত্রার পর মহাকাশে যাওয়ার এই সাংস্কৃতিক সংজ্ঞাটা বদলে গিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছানোর সমার্থক হয়ে যায়।

ডেভিড সাইমন্স স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন
ছবি: ইউএস এয়ার ফোর্স / সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি

টেস্ট পাইলটরা হয়তো যান্ত্রিকভাবে আগে ওই উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, কিন্তু বেলুনযাত্রীরা মহাকাশের ওই রূপ অনেক ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। ডেভিড সাইমন্স স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। মাটি থেকে ৩০.৯ কিলোমিটার ওপরে বসে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলেন, কীভাবে আমাদের বায়ুমণ্ডল মহাকাশের বর্ণহীন অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যায়। তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন, নক্ষত্ররা সেখানে পৃথিবীর মতো মিটিমিটি করে জ্বলে না; বরং মহাকাশের বিশালতায় স্থির হয়ে থাকে।

১৯৬০ সালে জোসেফ কিটিংগার এক্সেলসিয়র ৩ মিশন থেকে আরেকটি অভাবনীয় কাজ করেন। তিনি মাটি থেকে ৩১.৩ কিলোমিটার ওপর থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফ দেন! ক্যামেরার লেন্স ছিল নিচের দিকে, কিন্তু কিটিংগার তাকিয়েছিলেন ওপরের দিকে। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘আমার মাথার ওপর এক বৈরী আকাশ। এক বিশাল শূন্যতা, ঘুটঘুটে কালো এবং ভীষণ বৈরী।’ এই যাত্রার পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষ মহাকাশে হয়তো বাস করতে পারবে, কিন্তু একে কখনোই জয় করতে পারবে না।

আরও পড়ুন
১৯৬০ সালে জোসেফ কিটিংগার এক্সেলসিয়র ৩ মিশন থেকে আরেকটি অভাবনীয় কাজ করেন। তিনি মাটি থেকে ৩১.৩ কিলোমিটার ওপর থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফ দেন!

আধুনিক নভোচারীদের কাছেও পরিচিত নীল আকাশ পেরিয়ে এই কালো শূন্যতায় প্রবেশের অনুভূতিটা সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২১ সালে ব্লু অরিজিন ফ্লাইটে ১০৭ কিলোমিটার ওপরে যাওয়া প্রখ্যাত অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনার ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘চোখের সামনে নীল রংটা মিলিয়ে গিয়ে নিকষ কালো অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়াটাই হলো আসল ব্যাপার!’

২০২১ সালে ব্লু অরিজিন ফ্লাইটে ১০৭ কিলোমিটার ওপরে যাওয়া প্রখ্যাত অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনার
ছবি: কার্টেসী অফ অ্যামাজন

কারমান লাইন কেবলই একটা সংখ্যা, একটা গাণিতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক হিসাব। কিন্তু নীল আকাশটা চোখের সামনে গায়েব হয়ে কালো অন্ধকারে রূপ নেওয়াটা হলো মানুষের একেবারে ভেতরের একটা অনুভূতি। যারা প্রথম এই দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো এই অভিজ্ঞতার ঐতিহাসিক তাৎপর্য পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। কিন্তু তাঁদের চোখেই প্রথমবারের মতো প্রাচীন সেই উজ্জ্বল মহাকাশের ধারণা চিরতরে মুছে গিয়েছিল।

তাহলে তাঁরা কি মহাকাশে যাওয়া প্রথম মানুষ ছিলেন? ইতিহাস ও অনুভূতির বিচারে, মহাকাশচারী হিসেবে তাঁদের দাবিটাও কিন্তু ইউরি গ্যাগারিনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

আরও পড়ুন