রাতের অন্ধকারে বিড়ালের চোখ জ্বলে কেন
১৯৩৩ সাল। কুয়াশাচ্ছন্ন এক রাতে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন পার্সি শ। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, সামনের রাস্তা প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। একটু এদিক-ওদিক হলেই মারাত্মক বিপদ! হঠাৎ রাস্তার পাশ থেকে দুটি উজ্জ্বল বিন্দু তাঁর দিকে জাদুকরী আলোর মতো জ্বলে উঠল। পার্সি চমকে গিয়ে সজোরে গাড়ির ব্রেক কষলেন।
আপনি কি জানেন সেই উজ্জ্বল বিন্দু দুটি কিসের ছিল? সেটি ছিল একটি বিড়ালের জ্বলজ্বলে চোখ! আর ওই চোখ দুটিই সে রাতে পার্সির জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছিল। ঠিক সময়ে ব্রেক না কষলে তিনি হয়তো গাড়ি নিয়ে সোজা রাস্তা থেকে ছিটকে খাদে পড়ে যেতেন।
সেই রাতেই পার্সির মাথায় এক যুগান্তকারী আইডিয়া খেলে গেল। আচ্ছা, রাস্তার পাশে যদি এমন কিছু বসানো যায়, যা বিড়ালের চোখের মতোই গাড়ির আলোকে উল্টো চালকের দিকে প্রতিফলিত করবে? ব্যস, এই এক ভাবনা থেকেই মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন ক্যাটসআই রিফ্লেক্টর! আজ প্রায় এক শ বছর পরও আপনারা রাতের বেলা হাইওয়েতে বা রাস্তায় যে ছোট ছোট চকচকে স্টাড দেখতে পান, সেগুলো এই পার্সি শ-এরই আবিষ্কার। এগুলো আপনার গাড়ির হেডলাইটের আলো আপনার দিকেই প্রতিফলিত করে রাতের অন্ধকারে নিরাপদ পথ চলতে সাহায্য করে।
আমাদের সবার চোখেই রেটিনা নামে একটি অংশ আছে। এটি চোখের পেছনের দিকের একটি পাতলা পর্দা। এই পর্দা আলোকে ধরে এমন কিছু সংকেতে পরিণত করে, যা আমাদের মস্তিষ্ক বুঝতে পারে।
কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, রাতের অন্ধকারে বিড়ালের চোখ আসলে ওভাবে জ্বলে কেন? প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করত, সূর্যাস্তের পর বিড়ালের চোখ সূর্যের আলোকে নিজের ভেতর আটকে রাখে। সে জন্যই রাতে তাদের চোখ জ্বলজ্বল করে! তবে আসল বৈজ্ঞানিক কারণটি আবিষ্কার হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি, ১৯২৯ সালে।
আমাদের সবার চোখেই রেটিনা নামে একটি অংশ আছে। এটি চোখের পেছনের দিকের একটি পাতলা পর্দা। এই পর্দা আলোকে ধরে এমন কিছু সংকেতে পরিণত করে, যা আমাদের মস্তিষ্ক বুঝতে পারে। রেটিনাকে আপনি একটি স্বচ্ছ, আলো-ধরা পর্দার মতো ভাবতে পারেন। মানুষের চোখে আলো ঢোকার পর রেটিনা যতটুকু আলো শোষণ করতে পারে, আমরা শুধু ততটুকুই দেখতে কাজে লাগাই। যেসব আলো রেটিনা ধরতে পারে না, তা এমনিই নষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু বিড়ালের চোখের রেটিনার ঠিক পেছনেই আয়নার মতো একটি বিশেষ স্তর থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ট্যাপেটাম লুসিডাম। মানুষের চোখে কিন্তু এই জাদুকরী স্তরটি নেই! বিড়ালের চোখে যখন আলো ঢোকে, তখন রেটিনা ভেদ করে চলে যাওয়া অতিরিক্ত আলো হারিয়ে না গিয়ে ওই ট্যাপেটাম লুসিডাম স্তরে ধাক্কা খেয়ে আবার রেটিনায় ফিরে আসে। ফলে রেটিনা দ্বিতীয়বারের মতো ওই আলোকে ব্যবহার করার সুযোগ পায়! আপনি রাতের বেলা বিড়ালের চোখে যে অদ্ভুত আলো জ্বলতে দেখেন, তা আসলে কোনো জাদু নয়; বরং ওই ট্যাপেটাম লুসিডাম থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা আলো।
বিড়ালের চোখের রেটিনার ঠিক পেছনেই আয়নার মতো একটি বিশেষ স্তর থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ট্যাপেটাম লুসিডাম।
চোখের দারুণ গঠনের কারণেই বিড়াল মানুষের চেয়ে অনেক গুণ বেশি আলো সংবেদনশীল। যে অন্ধকারে আপনি বা আমি কিছুই দেখতে পাব না, একদম ঘুটঘুটে কালো মনে হবে, সেই সামান্য আলোতেও বিড়াল দিব্যি চারপাশ পরিষ্কার দেখতে পায়! রাতের বেলা শিকার করার জন্য এটি তাদের এক দারুণ প্রাকৃতিক হাতিয়ার।
তবে এই ট্যাপেটাম লুসিডাম যে শুধু বিড়ালেরই আছে, তা কিন্তু নয়। গরু, ভেড়া, ছাগল এবং ঘোড়ার চোখেও এটি থাকে; সম্ভবত অন্ধকারে শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য। এ ছাড়া মাছ, ডলফিন বা তিমির মতো জলজ প্রাণীরাও ঘোলাটে এবং অন্ধকার পানিতে দেখার জন্য এর ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে, কাঠবিড়ালি, শুকর এবং মানুষের মতো বনমানুষদের চোখে এটি থাকে না। কারণ আমরা দিনের বেলা বেশি কাজ করি, তাই আমাদের ওই বিশেষ নাইট ভিশন দরকার হয় না।
মজার ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ কুকুরের চোখে এটি থাকলেও, নীল চোখের কুকুর এবং কিছু ছোট জাতের পোষা কুকুরের চোখে এটি অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে!
১৯৩০-এর দশকে পার্সি শ যেমন বিড়ালের চোখ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরাও ঠিক একইভাবে বিড়ালের চোখ থেকে দারুণ সব আধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করছেন। কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ইয়ং মিন সং সম্প্রতি বিড়ালের চোখ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি আধুনিক ক্যামেরা তৈরি করেছেন।
মজার ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ কুকুরের চোখে ট্যাপেটাম লুসিডাম থাকলেও, নীল চোখের কুকুর এবং কিছু ছোট জাতের পোষা কুকুরের চোখে এটি অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে!
ড. সং বলেন, ‘বিড়ালের চোখ আমাকে সব সময়ই মুগ্ধ করে। বিশেষ করে কড়া রোদ থেকে শুরু করে ঘুটঘুটে অন্ধকার, সব রকম আলোতেই তাদের পরিষ্কার দেখার ক্ষমতাটি সত্যিই বিস্ময়কর।’
ট্যাপেটাম লুসিডামের ধারণাটি ব্যবহার করেই ড. সং তাঁর ক্যামেরায় একটি প্রতিফলক যোগ করেছেন, যা কম আলোতে ছবি ও ভিডিওর মান অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তিনি জানান, অতিরিক্ত কোনো ব্যাটারি বা শক্তি খরচ না করেই ক্যামেরার আলো ধারণক্ষমতা বাড়ানোর এটি একটি অসাধারণ এবং সহজ কৌশল।
শুধু রিফ্লেক্টর দিয়েই ড. সং থামেননি। তিনি ক্যামেরার লেন্সের খোলার জায়গাটিতে বিড়ালের চোখের মতো লম্বালম্বি বা খাড়া আকৃতির একটি চেরা নকশা যোগ করেন। আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, কড়া রোদে বিড়ালের চোখের মণি সংকুচিত হয়ে খাড়া একটি সরু দাগের মতো হয়ে যায়! কারণ অতিরিক্ত আলো থেকে সংবেদনশীল রেটিনাকে রক্ষা করা। এই খাড়া আকৃতি যেকোনো বস্তুর সীমানা আরও স্পষ্ট করে তোলে। ফলে বিড়াল অবিশ্বাস্য নিখুঁতভাবে দূরত্ব মাপতে পারে। শিকারের ওপর নিঃশব্দে লাফিয়ে পড়ার জন্য এটি খুব জরুরি।
ড. সং জানান, অতিরিক্ত কোনো ব্যাটারি বা শক্তি খরচ না করেই ক্যামেরার আলো ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ট্যাপেটাম লুসিডামের ধারণাটি একটি অসাধারণ এবং সহজ কৌশল।
ড. সং ভেবেছিলেন এই খাড়া নকশা হয়তো শুধু কম আলোতেই সাহায্য করবে। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বিড়ালের এই চোখের নকশাটি ক্যামেরাকে ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ ভেদ করতেও দারুণভাবে সাহায্য করছে! অর্থাৎ, যেসব বস্তু চারপাশের পরিবেশের রঙের সঙ্গে মিশে থাকে এবং সাধারণ ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, এই ক্যামেরা খুব সহজেই সেগুলোকে আলাদা করে চিনতে পারে।
ড. সং মনে করেন, বিড়ালের চোখ ভবিষ্যতে আমাদের আরও অনেক বড় বড় আবিষ্কারের পথ দেখাবে। রোবটের চোখ, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি বা নজরদারির ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। পার্সি শ-এর সেই ছোট্ট ক্যাটসআই স্টাড অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। কে জানে, ভবিষ্যতে বিড়ালের চোখ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিজ্ঞান আর কী কী বিস্ময় আমাদের সামনে নিয়ে আসবে!