স্তন্যপায়ী প্রাণীরা কেন পাখি বা মাছের মতো রঙিন হয় না

কেন স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অন্য প্রাণীদের মতো উজ্জ্বল ও রঙিন হয় না?ছবি: ক্রিস্তফ বারানোভস্কি / গেটি ইমেজ

চোখ বন্ধ করে দারুণ সুন্দর একটি ময়ূর, লাল টুকটুকে টিয়া পাখি কিংবা অ্যাকুয়ারিয়ামের নিয়ন রঙের মাছগুলোর কথা ভাবুন তো! এবার আপনার চারপাশের কুকুর, বিড়াল, গরু কিংবা খোদ মানুষের কথা ভাবুন। আমাদের গায়ের রং সাধারণত কালচে, বাদামি, ধূসর বা সাদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কেন? কেন স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অন্য প্রাণীদের মতো এত উজ্জ্বল ও রঙিন হয় না? চলুন, আজ জীববিজ্ঞানের এই মজার রহস্যটি জেনে নিই।

প্রাণীদের শরীরে রং মূলত দুটি উপায়ে তৈরি হয়—পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থ দিয়ে এবং শরীরের ওপরের বিশেষ কোনো কাঠামোর কারণে। পাখি বা মাছের শরীরে বিভিন্ন ধরনের পিগমেন্ট থাকে। কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে রং তৈরির জন্য পিগমেন্ট আছে মাত্র একটি! সেটি হলো মেলানিন। এই মেলানিনের কমবেশির কারণেই আমাদের গায়ের রং কালো, বাদামি বা সাদা হয়।

পাখির শরীরে বিভিন্ন ধরনের পিগমেন্ট থাকে
ছবি: উইকিপিডিয়া

অন্যদিকে, পাখির পালক বা মাছের আঁশের গঠন এতই জটিল যে এর ওপর আলো পড়লে তা ভেঙে গিয়ে জাদুকরী সব উজ্জ্বল রঙের সৃষ্টি করে। কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের গায়ের লোম বা চুল গঠনগত দিক থেকে খুবই সাধারণ। এতে এমন কোনো জটিল ন্যানোস্কেল প্যাটার্ন নেই, যা থেকে আলোর প্রতিফলনে উজ্জ্বল রং তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন
প্রাণীদের শরীরে রং মূলত দুটি উপায়ে তৈরি হয়—পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থ দিয়ে এবং শরীরের ওপরের বিশেষ কোনো কাঠামোর কারণে। পাখি বা মাছের শরীরে বিভিন্ন ধরনের পিগমেন্ট থাকে।

তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে। যেমন, ম্যান্ড্রিল (Mandrillus sphinx) নামে বানরের মুখের উজ্জ্বল লাল বা নীল রং তাদের লোমহীন ত্বকে তৈরি হয়। আবার স্লথ নামে প্রাণীর গায়ে যে সবুজ ছোপ দেখা যায়, তা আসলে তাদের নিজস্ব রং নয়, বরং তাদের লোমে জন্মানো একধরনের শৈবালের রং!

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের রঙিন না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো তাদের চোখ! বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীই ডাইক্রোম্যাটিক, অর্থাৎ তাদের চোখে রং চেনার জন্য মাত্র দুধরনের কোণ কোষ থাকে। ফলে তারা লাল, কমলা বা বেগুনি রংগুলো ঠিকমতো দেখতেই পায় না।

বাঘের গায়ের রং আমাদের চোখে উজ্জ্বল কমলা মনে হলেও, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর চোখে তা একেবারে সবুজ ঘাসের মতো দেখায়!
ছবি: কেভিন কার্টার / গেটি ইমেজ

এখন ভাবুন, আপনি যদি এমন কোনো রঙিন পোশাক পরেন যার রং আপনার বন্ধুরাই দেখতে পাবে না, তবে কি সেই পোশাক পরার কোনো মানে আছে?

ঠিক এই কারণেই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্য উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার নেই। মজার ব্যাপার হলো, বাঘের গায়ের রং আমাদের চোখে উজ্জ্বল কমলা মনে হলেও, হরিণ বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর চোখে তা একেবারে সবুজ ঘাসের মতো দেখায়! ফলে বাঘ খুব সহজেই ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে শিকার ধরতে পারে।

আরও পড়ুন
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের রঙিন না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো তাদের চোখ! বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীই ডাইক্রোম্যাটিক, অর্থাৎ তাদের চোখে রং চেনার জন্য মাত্র দুধরনের কোণ কোষ থাকে।

উজ্জ্বল রঙের বদলে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা টিকে থাকার জন্য মূলত রঙের প্যাটার্ন ব্যবহার করে। অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীই নিশাচর বা রাতের অন্ধকারে চলাফেরা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অন্ধকারে উজ্জ্বল রং মানেই শিকারির চোখে খুব সহজে ধরা পড়া। তাই গাঢ় বা সাদামাটা রং তাদের লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। যেমন আফ্রিকান বন্য কুকুরেরা তাদের লেজের সাদা অংশ দিয়ে শিকারের সময় নিজেদের দলের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান করে।

অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীই রাতের অন্ধকারে চলাফেরা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে
ছবি: সাদ্দাম হোসেন

তবে বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি কিছু চমৎকার তথ্য আবিষ্কার করেছেন। মানুষের চোখে ধরা না পড়লেও অতিবেগুনি রশ্মির নিচে অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীই অদ্ভুতভাবে জ্বলে ওঠে। অর্থাৎ, আমরা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের যতটা সাদামাটা ভাবি, অতিবেগুনি আলোয় বা একটু তলিয়ে দেখলে তারা হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি রঙিন!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন