কিছু পাখি কেন মানুষের মতো কথা বলে

কিছু পাখি কেন মানুষের মতো হুবহু কথা বলতে পারে?ছবি: উইকিপিডিয়া

পাখির কথা বলা নিশ্চয়ই কখনো শুনেছেন। আপনার নিজেরই হয়তো একটা কথা বলা পাখি আছে। ভাবুন তো, আপনার পোষা ছোট্ট পাখিটি আপনাকে স্পষ্ট ভাষায় বলছে, ‘কেমন আছ!’ ১৯৯৫ সালে পাক নামে একটি ছোট্ট বাজরিগার পাখি ঠিক এমনই এক কাণ্ড ঘটিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছিল! মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে এই বিস্ময়কর পাখিটি গুনে গুনে ১ হাজার ৭২৮টি শব্দ শিখে ফেলেছিল।

শুধু শব্দই নয়, পাক নিজে নিজে দ্যাটস হোয়াট ইটস অল অ্যাবাউট-এর মতো দারুণ সব বাক্যও তৈরি করতে পারত। কিন্তু কখনো কি আপনার মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন কিছু পাখি মানুষের মতো হুবহু কথা বলতে পারে? অন্য পাখিরা কেন শুধু কিচিরমিচির করেই দিন পার করে? চলুন, আজ নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী টিমোথি রাইটের গবেষণার হাত ধরে এই মজার রহস্যটি ভেদ করি!

পাখিরা বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে সঙ্গীকে ডাকে বা বিপদের সংকেত দেয়
ছবি: সংগৃহীত

অধ্যাপক রাইটের মতে, পৃথিবীর প্রায় সব পাখিরই নিজস্ব ভাষা বা যোগাযোগের মাধ্যম আছে। তারা বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে সঙ্গীকে ডাকে বা বিপদের সংকেত দেয়। কিন্তু আমরা যখন বলি পাখি কথা বলছে, তখন আমরা মূলত মানুষের কথার নকল বা মিমিক্রির কথাই বোঝাই। তোতাপাখি, ময়না, স্টার্লিং বা কাকজাতীয় পাখিরা এই নকল করার কাজে দারুণ ওস্তাদ!

আরও পড়ুন
অধ্যাপক রাইটের মতে, পৃথিবীর প্রায় সব পাখিরই নিজস্ব ভাষা বা যোগাযোগের মাধ্যম আছে। তারা বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে সঙ্গীকে ডাকে বা বিপদের সংকেত দেয়।

পাখিরা কেন আমাদের কথা নকল করে

এর পেছনের সবচেয়ে বড় কারণটি হলো সামাজিক বন্ধন। তোতাপাখিরা সাধারণত বন্য পরিবেশে একে অপরের সঙ্গে খুব শক্ত জুটি বেঁধে থাকে। কিন্তু যখন একটি পাখিকে খাঁচায় বা মানুষের বাড়িতে পোষা হয়, তখন সে তার নিজের প্রজাতির অন্য পাখিদের দেখতে পায় না।

তখন সে ভাবে, আশেপাশে তো আমার মতো কেউ নেই, এই মানুষগুলোই তো আমার পরিবার! তাই আপনাকে নিজের দলের অংশ ভেবে আপনার সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করার জন্যই সে আপনার কথাগুলো নকল করতে শুরু করে। আপনি যদি প্রতিদিন সকালে তাকে শুভ সকাল বলেন, তবে সে-ও একসময় এই শব্দটিকে তার প্রতিদিনের ভাষার অংশ বানিয়ে নেবে।

তোতাপাখিরা সাধারণত বন্য পরিবেশে একে অপরের সঙ্গে খুব শক্ত জুটি বেঁধে থাকে
ছবি: এর্নেস্তো এঙ্কার্লিন / অভিস

পাখিদের এই মানুষের মতো কথা বলার পেছনে দারুণ কিছু শারীরিক ও স্নায়বিক কারণ আছে। এই পাখিদের মস্তিষ্কে সং সিস্টেম নামে একটি বিশেষ নেটওয়ার্ক থাকে, যা তাদের জটিল সব শব্দ খুব দ্রুত শিখতে সাহায্য করে।

মানুষের গলার ওপরে যেমন ল্যারিংক্স থাকে, পাখিদের বুকের অনেক গভীরে থাকে সিরিংক্স নামে একটি বিশেষ অঙ্গ। এটি বাতাসের চাপ ব্যবহার করে এত নিখুঁতভাবে শব্দ তৈরি করতে পারে, যা মানুষের গলার চেয়েও অনেক বেশি কর্মক্ষম!

আরও পড়ুন
পাখিদের মস্তিষ্কে সং সিস্টেম নামে একটি বিশেষ নেটওয়ার্ক থাকে, যা তাদের জটিল সব শব্দ খুব দ্রুত শিখতে সাহায্য করে।

পাখিরা কি সত্যিই বোঝে তারা কী বলছে

আপনার পোষা পাখিটি হয়তো আপনাকে পরিষ্কার গলায় ডাকছে, কিন্তু সে কি আসলেই কথাটার মানে বোঝে? বিজ্ঞানী রাইট বলছেন, পাখিরা সাধারণত কোনো কাজের সঙ্গে শব্দকে মেলাতে খুব ওস্তাদ। যেমন, তারা হয়তো ডোরবেলের শব্দ নকল করে, কারণ তারা জানে এই শব্দটা করলেই বাড়ির সবাই হুড়মুড় করে ছুটে আসবে! আবার খাবার বললে যে খেতে দেওয়া হবে, এটাও তারা খুব ভালো বোঝে। তবে তারা মানুষের মতো পুরো বাক্যের ব্যাকরণগত অর্থ বুঝে কথা বলে না; বরং এটি তাদের কাছে একগুচ্ছ শব্দের সমষ্টি মাত্র।

চিক্যাডি নামে একধরনের পাখি বিপদের সংকেত দিতে ডি শব্দ ব্যবহার করে
ছবি: উইকিপিডিয়া

অবশ্য বন্য পরিবেশে পাখিদের নিজস্ব ভাষাতেও দারুণ ব্যাকরণ আছে! যেমন চিক্যাডি নামে একধরনের পাখি বিপদের সংকেত দিতে ডি (D) শব্দটি ব্যবহার করে। বিপদ যত বড়, তাদের ডাকে 'ডি' শব্দের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকে!

আরও পড়ুন
বন্য পরিবেশে মানুষের মতো কথা বলা পাখি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, যদি না কারও খাঁচা থেকে পালানো পাখি অন্য বন্য পাখিকে সেটা শিখিয়ে থাকে।

পাখিদেরও আছে আঞ্চলিক ভাষা!

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, মানুষের মতো পাখিদেরও আলাদা আঞ্চলিক ভাষা আছে! বিজ্ঞানী রাইট কোস্টারিকায় ইয়েলো-ন্যাপড অ্যামাজন প্যারট নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন, এক এলাকার পাখিরা ডাকছে ‘ওয়াহ ওয়াহ’ করে, আর অন্য এলাকার পাখিরা ঠিক একই পরিস্থিতিতে ডাকছে ‘উইপ উইপ’ করে! এটি প্রমাণ করে যে মানুষের ভাষার মতোই পাখিরাও তাদের পরিবেশ থেকে ভাষা শেখে।

কোস্টারিকায় ইয়েলো-ন্যাপড অ্যামাজন প্যারট
ছবি: চার্লস জে শার্প / শার্প ফটোগ্রাফ / উইকিপিডিয়া

বন্য পরিবেশে মানুষের মতো কথা বলা পাখি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, যদি না কারও খাঁচা থেকে পালানো পাখি অন্য বন্য পাখিকে সেটা শিখিয়ে থাকে। তবে একটু কান পাতলেই হয়তো আপনি আমাদের চারপাশের পাখিদের ডাকের মধ্যেই নতুন কোনো আঞ্চলিক ভাষা আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন