পৃথিবীর তাপমাত্রা কমানোর জাদুকরী সমীকরণ

একবিংশ শতাব্দী এখনও চলছে, কিন্তু এই সময়টাই আমাদের ভাবনার ভাষা বদলে দিচ্ছে। আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হতো, সেগুলো এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এই বদলের পেছনে আছে কিছু শক্তিশালী ধারণা। সেগুলো শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত তেমন ২১টি ধারণার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে পরিচিত হব। সেগুলো একবিংশ শতাব্দীর চিন্তাজগৎকে নতুন পথে নিয়ে গেছে।

পঞ্চম পর্বে থাকছে নেট জিরো

নেট জিরোর মূল লক্ষ্য বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ও অপসারণের ভারসাম্য বজায় রাখাছবি: লিফআর

একটা সময় ছিল যখন সবাই মনে করতেন, আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়লেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু সেই ধারণা এখন বদলে গেছে। এখন সামনে এসেছে নেট জিরোর ধারণা। বিষয়টি খুব সহজ, বায়ুমণ্ডলে আমরা ঠিক যতটা গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়ব, ঠিক ততটাই গ্যাস বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে বায়ুমণ্ডল থেকে সরিয়ে নিতে হবে। একেই বলা হয় নেট জিরো। অর্থাৎ নিঃসরণ ও অপসারণে থাকতে হবে ভারসাম্য। এই ভারসাম্য বজায় থাকলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তাপমাত্রা বাড়ানোর ক্ষমতা থাকে না।

২০০৫ সাল। পদার্থবিজ্ঞানী ডেভিড ফ্রেম ও মাইলস অ্যালেন যুক্তরাজ্যের এক্সেটারে একটি বিজ্ঞান সম্মেলনে যাচ্ছিলেন। ট্রেনের যাত্রাপথেই তাঁরা দুজনে একটি জলবায়ু মডেল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলেন। সে সময় বেশিরভাগ গবেষণাই বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব নির্দিষ্ট রাখার ওপর জোর দিত। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল বিপজ্জনক জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানো। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্বে পৃথিবী ঠিক কতটা উষ্ণ হবে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন।

বায়ুমন্ডলে ভারসাম্য বজায় থাকলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তাপমাত্রা বাড়ানোর ক্ষমতা থাকে না
ছবি: রেনুভো

ফ্রেম ও অ্যালেন সমস্যাটিকে উল্টো দিক থেকে ভাবতে শুরু করলেন। বায়ুমণ্ডলের ঘনত্বের দিকে না তাকিয়ে তাঁরা নজর দিলেন নিঃসরণের ওপর। তাঁরা ভাবলেন, যদি মানুষ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? ট্রেনের ওই যাত্রাতেই তাঁরা মডেলটি পরীক্ষা করলেন। ফলাফল যা এল, তা চমকপ্রদ। দেখা গেল, বৈশ্বিক তাপমাত্রা তার নতুন স্তরে স্থির রয়েছে। সংক্ষেপে, মানবজাতি নেট জিরো কার্বন নিঃসরণে পৌঁছালে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়া বন্ধ হয়ে যাবে। প্রথমবার এই সংখ্যাগুলো দেখে তাঁদের মনে হয়েছিল দারুণ ব্যাপার!

আরও পড়ুন
বায়ুমণ্ডলে আমরা ঠিক যতটা গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়ব, ঠিক ততটাই গ্যাস বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে বায়ুমণ্ডল থেকে সরিয়ে নিতে হবে। একেই বলা হয় নেট জিরো।

নেট জিরো অর্জনের অর্থ হলো গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। আর যেসব নিঃসরণ পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না সেগুলোকে বনায়ন, কার্বন ক্যাপচার বা অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে সরিয়ে ফেলা বা শুষে নেওয়া। যেমন বিমান চলাচল বা ভারী শিল্প চাইলেই বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। এখানে নেট শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাস্তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সব ধরনের নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি গ্যাস অপসারণের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

২০০৯ সালে নেচার জার্নালে সেই সম্মেলনের প্রেজেন্টেশন এবং ফলাফল বিস্তারিত প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধ জলবায়ু বিজ্ঞানে চিন্তার এক নতুন ধারার সূচনা করে। আগে ধারণা ছিল, প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নিঃসরণ করেও তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।

গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলে সেগুলোকে বনায়ন বা অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত
ছবি: চ্যাটজিপিটি

কিন্তু নতুন গবেষণায় স্পষ্ট হয়ে গেল, জলবায়ু স্থিতিশীল করতে হলে নিঃসরণকে অবশ্যই নেট জিরোতে নামাতে হবে। অর্থাৎ মানুষের তৈরি যেকোনো নিঃসরণকে বায়ুমণ্ডল থেকে সমপরিমাণ অপসারণের মাধ্যমে ব্যালেন্স করতে হবে।

দ্রুত বিশ্বজুড়ে নেট জিরো কার্বন নিঃসরণে পৌঁছানোর ধারণাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনে বিশ্বনেতারা সিদ্ধান্ত নেন, উষ্ণতাকে যতটা সম্ভব ওই সীমার কাছাকাছি রাখতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ নেট জিরো নিঃসরণ অর্জন করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
জলবায়ু স্থিতিশীল করতে হলে নিঃসরণকে অবশ্যই নেট জিরোতে নামাতে হবে। অর্থাৎ মানুষের তৈরি যেকোনো নিঃসরণকে বায়ুমণ্ডল থেকে সমপরিমাণ অপসারণের মাধ্যমে ব্যালেন্স করতে হবে।

এর পরপরই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের ওপর নেট জিরো লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য তীব্র চাপ তৈরি হয়। শত শত দেশ এতে সাড়া দেয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় হাজার হাজার কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এখন বৈশ্বিক নিঃসরণের চার ভাগের তিন ভাগই নেট জিরো অঙ্গীকারের আওতায় এসেছে। প্যারিস চুক্তির আগে যেখানে এই শতাব্দীতে উষ্ণতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৩.৭ থেকে ৪.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেখানে বর্তমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তা নেমে এসেছে ২.৪ থেকে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

তবে নেট জিরো কার্যকর হতে হলে এটি স্থায়ী হতে হবে। অর্থাৎ যে গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারণ করা হলো, তা যেন ভবিষ্যতে আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে না আসে। যেমন, বন ধ্বংস হলে বা কার্বন সংরক্ষণ ঠিকভাবে না হলে সেই গ্যাস আবার মুক্ত হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান অপরিহার্য। একে বলা হচ্ছে স্থায়ী নেট জিরো।

বন ধ্বংস হলে গ্রিনহাউস গ্যাস আবার বায়ুমন্ডলে ফিরে আসতে পারে
ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এডুকেশন

বর্তমানে কার্বন নিউট্রাল, নেট জিরো বা ক্লাইমেট নিউট্রাল শব্দগুলো বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল লক্ষ্য হলো নেট জিরো। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেল বলছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নেট জিরো অর্জন করা জরুরি।

 

লেখক: ফ্যাক্ট-চেকার, সত্যিফাই

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট, নেটজিরোক্লাইমেট ডটঅর্গ

আরও পড়ুন