বয়স বাড়লে কি শরীরের গন্ধ বদলে যায়

সত্যিই কি বয়স বাড়লে শরীরে আলাদা কোনো গন্ধ তৈরি হয়?ছবি: শাটারস্টক

বয়স বাড়লে শরীরে নাকি বিশেষ একটি গন্ধ তৈরি হয়! কেউ কেউ বয়স্কদের শরীরের এই গন্ধকে দাদা-দাদির পুরোনো বাড়ি, পুরোনো আসবাব বা কাপড় রাখার আলমারির গন্ধের সঙ্গে তুলনা করেন। আবার অনেকে বলেন, তাঁরা নাকি স্যাঁতসেঁতে বা ঘাসের গন্ধ পান। কিন্তু সত্যিই কি বয়স বাড়লে শরীরে আলাদা কোনো গন্ধ তৈরি হয়?

যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সোনাল চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, এই বিশেষ গন্ধের কিছু বিষয় শারীরবৃত্তীয় কারণে ঘটে। তবে গন্ধটি আসলেই ত্বক থেকে আসছে, নাকি চারপাশের পরিবেশ, স্মৃতি বা পুরোনো ব্যবহৃত জিনিসের কারণে এমনটি মনে হচ্ছে, তা আলাদা করে বলা বেশ কঠিন।

বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো, এই গন্ধ অপরিষ্কার থাকার কারণে হয়। কিন্তু বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। সত্যি বলতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে কিছু স্বাভাবিক রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা মানুষের শরীরেও এই গন্ধের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন
অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার এই ২-নোনেনাল তৈরি কমাতে সাহায্য করে। তাই গাঢ় সবুজ শাক ও শিমজাতীয় খাবার খেলে এই রাসায়নিকের পরিমাণ কমে যায়। এতে শরীরের গন্ধও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য প্রভাব

পুরোনো পোশাকের গন্ধ বাদ দিলেও এই বিশেষ গন্ধের পেছনে একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক অণু কাজ করে। এর নাম ২-নোনেনাল। আমাদের ত্বকে জমে থাকা তেল যখন বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে জারিত হয়, তখন এটি তৈরি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের ভেতরের রসায়নে কিছু পরিবর্তন আসে। ফলে এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়ে। ২০০১ সালে জাপানি গবেষকেরা প্রথম আবিষ্কার করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকে ২-নোনেনাল নামে এই যৌগের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা বয়স্কদের শরীরের এই নির্দিষ্ট গন্ধের মূল কারণ।

অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার ২-নোনেনাল তৈরি কমাতে সাহায্য করে
ছবি: গেটি ইমেজ

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই উপাদানটি কিন্তু সারা জীবন একইভাবে বাড়ে না। গবেষণায় দেখা গেছে, চল্লিশোর্ধ্ব বা মধ্যবয়সে এসে এটি বাড়তে শুরু করে। তারপর এক সময় এসে এটি থেমে যায়। আবার মানুষের শারীরিক গঠনভেদে এর পরিমাণ আলাদা হতে পারে।

অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার এই ২-নোনেনাল তৈরি কমাতে সাহায্য করে। তাই গাঢ় সবুজ শাক ও শিমজাতীয় খাবার খেলে এই রাসায়নিকের পরিমাণ কমে যায়। এতে শরীরের গন্ধও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

আরও পড়ুন
২০০১ সালে জাপানি গবেষকেরা প্রথম আবিষ্কার করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকে ২-নোনেনাল নামে এই যৌগের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা বয়স্কদের শরীরের এই নির্দিষ্ট গন্ধের মূল কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় অবস্থিত মোনেল কেমিক্যাল সেন্সেস সেন্টারে একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন বয়সের মানুষের ঘামের গন্ধ অন্যদের শুঁকতে দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, মধ্যবয়সী পুরুষদের ঘামের গন্ধ সবচেয়ে কটু বা খারাপ। তবে বয়স্কদের গন্ধ কিন্তু ততটা খারাপ বলে মনে হয়নি।

এই গবেষণা একটি বিষয় সামনে নিয়ে আসে। বয়স্কদের শরীরের গন্ধের পেছনে কেবল রাসায়নিক উপাদান দায়ী নয়; বরং মানুষের জীবনযাত্রা, পরিচ্ছন্নতা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে আরও কিছু পরিবর্তন ঘটে। ওষুধ খাওয়া, দীর্ঘদিনের রোগ, চলাফেরার কষ্ট, নিজের যত্ন নেওয়ার উপায় বা থাকার জায়গার বদল—এসবই গন্ধ বদলে দিতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বিষণ্নতা ও ডায়াবেটিসের ওষুধ কিংবা ভিটামিনজাতীয় সম্পূরক খাবার ঘামের গন্ধ বদলে দেয়।

এ ছাড়া খাদ্যাভ্যাসের একটি বড় প্রভাব তো আছেই। রসুন, পেঁয়াজ ও বেশি মসলাযুক্ত খাবার যেকোনো মানুষের শরীরের গন্ধ বদলে দেয়। পোশাকের ধরন, কাপড় ধোয়ার নিয়ম ও পরিষ্কার থাকার অভ্যাসও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সহজ কথায়, বয়স হলো এই পুরো বিষয়টির একটি ছোট অংশ মাত্র।

আরও পড়ুন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে আরও কিছু পরিবর্তন ঘটে। ওষুধ খাওয়া, দীর্ঘদিনের রোগ, চলাফেরার কষ্ট, নিজের যত্ন নেওয়ার উপায় বা থাকার জায়গার বদল—এসবই গন্ধ বদলে দিতে ভূমিকা রাখে।

মনস্তাত্ত্বিক দিক ও চিকিৎসকের পরামর্শ

আমরা আগে থেকে যা শুঁকব বলে ভাবি, আমাদের মস্তিষ্ক অনেক সময় আমাদের ঠিক সেটাই অনুভব করায়। এই পুরো বিষয়টিকে মাত্র একটি কারণ দিয়ে বোঝানো কঠিন। শুধু একটি রাসায়নিক উপাদানকে দায়ী করলে বুঝতে সুবিধা হয় ঠিকই, কিন্তু আসল ঘটনাটি বেশ জটিল।

২-নোনেনাল নিয়ে বেশি আলোচনা করা হয়। কারণ, বয়স বাড়লে গন্ধ কেন বদলায়, তা খুঁজতে গিয়ে এই রাসায়নিক যৌগটিই প্রথম বিজ্ঞানীদের হাতে ধরা পড়েছিল। তবে মানুষের শরীরের আসল গন্ধ তৈরি হয় অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে মিলে। ত্বকের তেল, ঘাম, ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ওষুধের প্রভাব, খাবার, রোগব্যাধি এবং চারপাশের পরিবেশ—এসবের সমন্বয়েই শরীরের গন্ধ তৈরি হয়। তাই শুধু একটি রাসায়নিক যৌগের ওপর সব দোষ চাপালে আসল কারণটিই বাদ পড়ে যায়।

আরও পড়ুন
সোনাল চৌধুরী সতর্ক করে দিয়েছেন, গন্ধে যদি হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, তবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। শরীরের গন্ধ হঠাৎ বদলে গেলে তা ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার।

কোন গন্ধ কেমন লাগবে, তা আমাদের মনের ওপরও নির্ভর করে। কোনো গন্ধ পাওয়ার পেছনের অভিজ্ঞতা, আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচিত পরিবেশ এতে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু গন্ধকে আমরা দাদা-দাদি, পুরোনো আসবাব, কোনো বিশেষ সাবান, ন্যাপথলিন বা পুরোনো ঘরের স্মৃতি মনে করে চিনি। মনের এই হিসাবগুলোই ঠিক করে দেয়, গন্ধ আমরা কীভাবে অনুভব করব।

সাধারণত বয়সের সঙ্গে শরীরের গন্ধ ধীরে ধীরে বদলালে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তবে সোনাল চৌধুরী সতর্ক করে দিয়েছেন, গন্ধে যদি হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, তবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। শরীরের গন্ধ হঠাৎ বদলে গেলে তা ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার। বিশেষ করে এর সঙ্গে যদি হঠাৎ ওজন কমে যায়, জ্বর আসে, অতিরিক্ত ঘাম হয়, প্রস্রাবে বদল আসে বা ত্বকে কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তবে সতর্ক হতে হবে। কারণ, হঠাৎ তৈরি হওয়া গন্ধ অনেক সময় শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অসুখ বা ওষুধের প্রতিক্রিয়ার চিহ্ন হতে পারে। এমন হলে শুধু বয়সের কারণে হচ্ছে ভেবে বসে থাকা ঠিক নয়। অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আরও পড়ুন
অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খেলেও সাহায্য পেতে পারেন। তবে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত ক্রিম বা সিরাম ব্যবহার করলে ২-নোনেনাল কমে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো গবেষণা হয়নি।

কীভাবে এই বিশেষ গন্ধ দূর করা যায়

মানুষের স্মৃতি বা ধারণাকে সহজে বদলে ফেলা যায় না। তবে নিজের শরীরের গন্ধ কমানোর কিছু সহজ উপায় আছে বলে জানান সোনাল চৌধুরী। নিয়মিত শরীর পরিষ্কার রাখতে হবে। নিয়মিত জামাকাপড় ধুতে হবে। ত্বকের সুরক্ষা ঠিক রাখতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খেলেও সাহায্য পেতে পারেন। তবে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত ক্রিম বা সিরাম ব্যবহার করলে ২-নোনেনাল কমে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো গবেষণা হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে, ২-নোনেনাল কমানোর কোনো সর্বজনীন চিকিৎসা এখনো নেই। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সাধারণ কিছু নিয়ম মেনেই শরীরের অনাকাঙ্ক্ষিত গন্ধ রোধ করা সম্ভব। সাধারণ সাবান, পানি ও সঠিক যত্নই এ জন্য যথেষ্ট। আর পুরোনো আলমারি বা ন্যাপথলিনের গন্ধের সঙ্গে আপনার শরীরের গন্ধের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন