বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসে বাংলাদেশে নতুন উদ্যোগ

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বহু জায়গায় বন্য প্রাণীর আবাসস্থল অবাধে ধ্বংস হচ্ছেছবি: দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ

বিশ্বজুড়ে ২৮ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস। বন, বন্য প্রাণী, পানি, মাটি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বহু জায়গায় বন্য প্রাণীর আবাসস্থল অবাধে ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ৪৪ হাজারেরও বেশি উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিয়েছে নতুন উদ্যোগ। বিপন্ন বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, সংকটাপন্ন আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত কমাতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে ১০ সদস্যের একটি ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন গঠন করা হয়েছে।

২৩ জুলাই, বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন শাখা-২ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সরকারের এই কমিশন মূলত একটি উপদেষ্টা সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা, আবাসস্থল সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে এই কমিশন।

আরও পড়ুন
২৩ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১০ সদস্যের একটি ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন শাখা-২ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানমকে কমিশনের সভাপতি করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে আছেন বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, দুবাই সাফারি পার্কের সাবেক প্রধান ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আলী রেজা খান। এ ছাড়া আছেন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আশরাফুল হক নোবেল, আইইউসিএনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান এবং বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি কর্মকর্তা হাতেম সাজ্জাদ মোহাম্মদ জুলকারনাইন।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, হাতিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে কমিশন। ধ্বংস হওয়া বন ও অন্যান্য ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা এবং অবৈধভাবে দখল হওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধারের বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেবে এই কমিশন।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলগুলোর একটি
ছবি: ডা. নিয়াজ আব্দুর রহমান

কমিশনে বিশেষ গুরুত্ব পাবে সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এই বন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলগুলোর একটি। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি, বন্য প্রাণীর খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করতে বনাঞ্চলে ফলজ গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগেরও সুপারিশ করবে কমিশন।

এ ছাড়া মানুষ ও বন্য প্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করাও কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে হাতির বিচরণপথে বসতি ও অবকাঠামো গড়ে ওঠায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকট কমাতে বন্য প্রাণীর চলাচলের পথ বা ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

আরও পড়ুন
ধ্বংস হওয়া বন ও অন্যান্য ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা এবং অবৈধভাবে দখল হওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধারের বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেবে এই ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন।

বন, জলাভূমি ও উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থার সমন্বয় সুন্দরবন। বন্য প্রাণী এবং স্থানীয় উদ্ভিদ সংরক্ষণে সুন্দরবনের ভূমিকা ব্যাপক। স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, কার্বন শোষণ, বন্যা প্রশমন এবং মানুষের জীবিকা রক্ষায়ও এই বন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বনভূমি দখল, প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চাপ দেশের এই প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

কমিশনে আইইউসিএনের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ-অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্কসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও এটি সহায়ক হতে পারে।

বন, জলাভূমি ও উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থার সমন্বয় সুন্দরবন
ছবি: প্রথম আলো

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেছেন, ‘হাতি, বাঘ ও অন্যান্য বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, এদের আবাসস্থলের উন্নয়ন এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই সরকার এই কমিশন গঠন করেছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশন গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে সুপারিশগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর। অবৈধ বনভূমি দখল রোধ, পরিবেশগত করিডোর পুনরুদ্ধার, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এই কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ

আরও পড়ুন